(স্মৃতিচারণমূলক ফিচার)
মো. মাজেম আলী মলিন
সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজ। সাংবাদিক ও কলামিস্ট, মুঠোফোন: ০১৭১৯৭৩৪৫২০ ই-মেইল: md.magem1974@gmail.com
চলনবিলের বিস্তীর্ণ জলরাশি, নদী-খাল আর ঘাটের সঙ্গে একসময় নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিল মানুষের জীবন ও জীবিকা। বর্ষায় থইথই পানিতে ভেসে বেড়াত সারি সারি নৌকা। পণ্য পরিবহনের অন্যতম বাহন ছিল বিশাল আকৃতির বজরা নৌকা। সেই নৌকাগুলোর কথা মনে পড়লেই আজও আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফেলে আসা শৈশবের দিনগুলো। মনে পড়ে কাঠের পাটাতন, নদীর ঢেউ, বন্ধুদের উচ্ছল হাসি আর পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার দুরন্ত আনন্দ। মনে পড়ে বাবার ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যস্ততা, পণ্যবোঝাই নৌকার আনাগোনা, ঘাটের কোলাহল আর দূর থেকে ভেসে আসা মাঝির দরদভরা ভাটিয়ালি। মনে হয়, সময়ের স্রোত বেয়ে আমি যেন আবার ফিরে গেছি সেই দিনগুলোতে—যখন চলনবিলের নদীপথই ছিল যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম, বজরা নৌকা ছিল জীবিকার অবলম্বন, আর নদীর জলে ডুবসাঁতার কাটাই ছিল সবচেয়ে বড় আনন্দ।
“এই বজরা নৌকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার শৈশবের কত স্মৃতি। বাবার ব্যবসার সুবাদে নৌকাটির সঙ্গে আমাদের পরিবারেরও ছিল গভীর সম্পর্ক। তাই নৌকাটি দেখলে আজও বাবার কথা মনে পড়ে, চোখের সামনে ভেসে ওঠে ছেলেবেলার সেই দুরন্ত দিনগুলো।”
আমার দাদার ধারাবাহিকতায় বাবাও ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। লবণ, পেঁয়াজ, রসুন, ধান, পাটসহ নানা কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যবসায় তাঁর জীবন নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিল। সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী ঘাট থেকে পাবনার বেড়া, আতাইকুলা ও ভাঙ্গুড়া হয়ে নাটোরের গুরুদাসপুরের চাচকৈড়, আত্রাই ও নওগাঁ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাঁর ব্যবসায়িক যোগাযোগের পরিধি। নদীপথে পণ্য পরিবহনের সেই দিনগুলোর স্মৃতি আজও আমার শৈশবের সঙ্গে মিশে আছে। তখন নদী শুধু জলপ্রবাহ ছিল না, ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য, মানুষের জীবিকা ও জনপদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভরসা।
বাবার ব্যবসার সুবাদে ছোটবেলা থেকেই নৌকাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহৃত নৌকার পাশাপাশি আমাদের দুটি নৌকাবাইচের নৌকাও ছিল। সেই নৌকাগুলো ঘিরে ছিল কত আয়োজন, কত ব্যস্ততা, কত আনন্দ! তখন বুঝিনি, একটি নৌকার সঙ্গে কত মানুষের জীবিকা, কত পরিবারের অন্নসংস্থান এবং একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্য জড়িয়ে থাকতে পারে। বড় হয়ে বুঝেছি, সেসব নৌকা ছিল আমাদের পরিবারের ব্যবসার অংশ হওয়ার পাশাপাশি নদীনির্ভর বাংলার জীবনসংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।
সেই সময় নদীপথে পণ্য পরিবহনে পালতোলা নৌকার বিশেষ গুরুত্ব ছিল। বাতাসের অনুকূলে পাল তুলে নৌকা এগিয়ে যেত গন্তব্যের দিকে। অনুকূল বাতাস না থাকলে বৈঠা, লগি কিংবা গুন টেনে নৌকাকে এগিয়ে নিতে হতো। নদীর স্রোত, পানির গভীরতা, বাতাসের গতিপথ ও আবহাওয়ার মেজাজ বুঝে চলতে হতো মাঝি-মাল্লাদের। তাঁদের অভিজ্ঞতা, শ্রম ও দক্ষতাই ছিল দীর্ঘ নদীপথের অন্যতম ভরসা।
আজকের মতো সড়ক যোগাযোগের বিস্তার কিংবা দ্রুতগতির পণ্যবাহী যানবাহন তখন ছিল না। নদীপথই ছিল দূরদূরান্তে পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নদীর ঘাটে নৌকা ভিড়ত, পণ্য ওঠানামা করত, ব্যবসায়ীরা দরদাম করতেন, শ্রমিকেরা বোঝা বহন করতেন। মাঝি, মাল্লা, পাইকার, আড়তদার ও শ্রমিকদের ব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠত ঘাট। একেকটি নদীবন্দর ছিল যেন একটি জীবন্ত অর্থনৈতিক জনপদ।চাচকৈড় ও আশপাশের বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর কথা মনে পড়লে উপলব্ধি করি, নদী কীভাবে একটি জনপদের অর্থনীতিকে সচল রাখত। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য পৌঁছে যেত বাজারে, ব্যবসায়ীরা পেতেন বেচাকেনার সুযোগ, আর পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত মানুষ পেতেন জীবিকার সংস্থান। নদী ছিল পথ, নৌকা ছিল বাহন, আর ঘাট ছিল মানুষের কর্মচাঞ্চল্য ও পারস্পরিক যোগাযোগের মিলনস্থল।
ব্যবসার স্মৃতির চেয়েও নৌকাকে ঘিরে কাটানো শৈশবই আজ বেশি মনে পড়ে। বন্ধুদের সঙ্গে নৌকার পাটাতনে লাফালাফি, খুনসুটি, নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়া, সাঁতারের প্রতিযোগিতা আর মাঝি-মাল্লাদের সঙ্গে বসে খাওয়ার আনন্দ—সব মিলিয়ে নৌকাটি ছিল আমাদের দুরন্ত শৈশবের এক আনন্দময় জগৎ। আজ সময়ের স্রোতে শৈশব হারিয়ে গেছে, কিন্তু সেই নৌকা, নদীর ঢেউ আর বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সোনালি দিনগুলোর স্মৃতি আজও মনের গভীরে অমলিন।আর সেই নদীজীবনের সবচেয়ে মায়াবী অনুষঙ্গ ছিল মাঝি-মাল্লাদের গান। নদীর বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলেছে, আর মাঝির কণ্ঠে ভেসে আসছে ভাটিয়ালির সুর। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি, দূরের ঘাটের টান, প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা আর জীবনের সুখ-দুঃখ যেন মিশে থাকত সেই গানে। কখনো দূরের কোনো নৌকা থেকে সুর ভেসে আসত, কখনো মনে হতো নদীর বুক থেকেই উঠে আসছে সেই মায়াবী ধ্বনি।
ভাটিয়ালির সুর আর নৌকাবাইচের উল্লাস—দুটিই ছিল আমাদের নদীকেন্দ্রিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের দুটি বাইচের নৌকা থাকায় ছোটবেলা থেকেই এ আয়োজনের সঙ্গে ছিল আমার নিবিড় পরিচয়। বাইচের দিন নদীর বুকে বৈঠার ছন্দ, দুই তীরে দর্শকদের ভিড় আর মানুষের উল্লাসে মুখর হয়ে উঠত চারপাশ। আজ সেই দৃশ্য আর নেই, নেই নদীর আগের সেই কোলাহলও। তবু স্মৃতিতে মাঝির ভাটিয়ালি আর বৈঠার ছন্দ যেন আজও ভেসে আসে কানে।সময় বদলেছে, বদলে গেছে নদী ও নদীকেন্দ্রিক জীবন। হারিয়ে গেছে বজরা নৌকার জৌলুশ, নৌকাবাইচের সেই উৎসবমুখর দিন। কিন্তু শৈশবের সেই নদী, নৌকা আর মানুষের কোলাহল আজও আমার স্মৃতিতে জীবন্ত। মনে হয়, চোখ বন্ধ করলেই ফিরে পাব পালতোলা বজরা, নদীর চেনা দৃশ্য আর দুরন্ত কৈশোরের দিনগুলো।সময়ের সঙ্গে সেই চেনা জগৎ অনেকটাই বদলে গেছে। সড়ক যোগাযোগ বেড়েছে, পণ্য পরিবহনের ধরন পাল্টেছে। একসময় নদী ও ঘাট ঘিরে যে ব্যস্ততা ছিল, এখন অনেক জায়গায় তা আর নেই। দখল-দূষণ ও নাব্যতা সংকটে নদী হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক রূপ। সেই সঙ্গে কমে যাচ্ছে নদীকেন্দ্রিক পেশা, ঐতিহ্যবাহী নৌযানের ব্যবহার ও লোকজ সংস্কৃতির চর্চা।
নদী বাঁচানো শুধু পরিবেশের জন্য নয়, আমাদের অর্থনীতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির স্বার্থেও জরুরি। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, দখল-দূষণ বন্ধ করা এবং নৌপথকে পণ্য পরিবহনের উপযোগী করে তোলার পাশাপাশি নৌকাবাইচ ও ভাটিয়ালি গানের মতো ঐতিহ্যও নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। কারণ নদী হারালে হারিয়ে যায় তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা মানুষের জীবন, জীবিকা ও স্মৃতির জগৎ।
সেই বজরা নৌকার দিকে তাকালে আজও মনে হয়, আহা, যদি আরেকবার ফিরে পেতাম সেই দুরন্ত কৈশোর! কিন্তু সময়ের নদী কাউকে ফিরিয়ে নেয় না। বন্ধুদের হাসি, মাঝির গান, নদীর ঢেউ আর বাবার ব্যস্ত ঘাট—সবই আজ স্মৃতি। শুধু সেই নৌকাটি মনের ঘাটে আজও নোঙর করে আছে। শৈশব হারিয়েছে, সময় ফুরিয়েছে, তবু নৌকাটির গায়ে লেগে আছে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলোর স্পর্শ। বাস্তবে আর কোনো দিন সেই কিশোর হয়ে ফেরা হবে না, কিন্তু স্মৃতির নদীতে আমার সেই বজরা নৌকা কোনো দিন হারাবে না।
Weekly Chalonbeel Barta chalonbeelbarta.com
