লুৎফর রহমান, তাড়াশ
এবারের বর্ষায় ঐতিহ্যবাহী চলনবিলে দেখা মেলেনি চিরায়ত উথাল-পাতাল ঢেউয়ের। প্রকৃতির বিরূপ আচরণের প্রভাব পড়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই জলপ্রবাহে। একদিকে কাক্সিক্ষত পানির চরম অভাব, অন্যদিকে বিলজুড়ে মাইলের পর মাইল কচুরিপানার ঘন আস্তরণ- এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে চলনবিলের প্লাবনভূমি, নদ-নদী, খাল ও জলাশয়ে দেশীয় মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
ফলে বিলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। ভরা মৌসুমেও কাঁচা মাছের তীব্র সঙ্কট দেখা দেয়ায় চলনবিলকেন্দ্রিক প্রায় ২৭৫টি শুঁটকি চাতালের মালিকেরা লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক মাছও প্রক্রিয়াজাত করতে পারছেন না। ফলে চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছেও পৌঁছানো যাবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। চাতালে চড়া সুদের মূলধন ও দাদনের টাকা বিনিয়োগ করে বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কায় এখন দিশেহারা শুঁটকি প্রস্তুতকারকেরা।
দেশের মৎস্য ভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত চলনবিল মূলত পদ্মা ও যমুনার প্লাবনভূমি নিয়ে গঠিত। তবে এবারের মৌসুমে পুরো বিলেই বর্ষার স্বকীয় রূপ অধরা থেকে গেছে। সাধারণত কার্তিক মাসের শুরুর দিকে বর্ষা শেষে বিল, নদী, খাড়ি ও প্লাবনভূমির পানি কমতে শুরু করে। এই পানি বড়াল ও হুড়াসাগর নদী হয়ে আছড়ে পড়ে যমুনায়। কিন্তু এবার শুরু থেকেই জলাশয়গুলোতে পানি কম থাকায় এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশিত হয়ে যাওয়ায় মাছের প্রজনন ক্ষেত্রগুলো চরমভাবে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। স্থানীয় জেলেদের মতে, পানির ঘাটতি ও জলজ পরিবেশ নষ্ট হওয়ার কারণেই বছর বছর প্লাবনভূমিতে মাছ কমে যাচ্ছে।
দেশী মাছের এমন প্রাচুর্যকে কেন্দ্র করেই চলনবিল অঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। গুরুদাসপুরের সাতগাড়ী গ্রামের ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন তাড়াশের মহিষলুটি এলাকায় গড়ে তুলেছেন শুঁটকির চাতাল। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, গত বছর আমার দু’টি চাতালে প্রায় এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৪০০ মন শুঁটকি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এবার বিলে মাছই ধরা পড়ছে না। তাড়াশের মহিষলুটির প্রধান চাতালগুলোসহ প্রায় সর্বত্রই তাজা মাছের হাহাকার চলছে। এবার চালান ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়বে।
পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোর জেলা মৎস্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে বিলের ২৭৫টি চাতালে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে ৪০০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। আর এই পরিমাণ শুঁটকি তৈরির জন্য কাঁচা মাছের প্রয়োজন ছিল প্রায় এক হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। তবে জেলেরা কাক্সিক্ষত মাছ না পাওয়ায় চাতালগুলো এখন অর্ধেকের বেশি ফাঁকা পড়ে রয়েছে।
চলনবিল থেকে প্রক্রিয়াজাত করা ভালো মানের উচ্চমানের শুঁটকি আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে নিয়মিত রফতানি করা হয়। প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে এই মিঠা পানির শুঁটকির বেশ সুনাম ও কদর রয়েছে। এ ছাড়া মাঝারি মানের শুঁটকি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার- যেমন ঢাকা, চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর, রাজশাহী ও খুলনায় উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। সৈয়দপুরের শুঁটকি ব্যবসায়ী এখলাছ মিয়া জানান, মান ভালো হওয়ায় চলনবিলের শুঁটকির বিশ্বজোড়া চাহিদা রয়েছে, কিন্তু এবার তাজা মাছের অভাবে চাহিদা অনুযায়ী শুঁটকিই প্রস্তুত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিদেশের বাজারে রফতানি চুক্তি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
চলনবিলে প্রতিবছর পানি কমার সাথে সাথেই জেলেরা পুঁটি, খলসে, টেংরা, কই, বাতাসি, টাকি, বাইম ও বোয়ালের মতো রকমারি দেশী মাছ আহরণ করেন। চাতালগুলোতে প্রায় দুই সহস্রাধিক পরিবারের নারী-পুরুষ দৈনিক ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা মজুরিতে প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু এবার বিলে অনিয়ন্ত্রিত কচুরিপানা ছড়িয়ে পড়ায় মাছ আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদন দুটোই স্থবির হয়ে পড়েছে।
বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক নির্মাণের পর তাড়াশের মহিষলুটিতে বিশাল মাছের আড়ত গড়ে ওঠে, যা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে ব্যবসা প্রসারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। তবে এখন মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে মাছের চরম অপর্যাপ্ততা এবং সরকারি সহায়তার অভাব। চাতাল মালিকদের অভিযোগ, ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে ঋণ না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে চড়া সুদে মহাজন ও দাদনদারদের কাছ থেকে পুঁজি নিতে হচ্ছে। মৎস্য বিভাগের উদাসীনতা ও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়া এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পটি এখন অস্তিত্ব সঙ্কটে ভুগছে।
তাড়াশ ইউএনও নুসরাত জাহান বলেন, অতিরিক্ত কচুরিপানা জমে থাকলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সঙ্কুচিত হতে পারে। চলনবিলে দেশীয় মাছের প্রজনন বাড়াতে স্থানীয় জনগণ, জেলা ও সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে উপজেলা প্রমাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।
Weekly Chalonbeel Barta chalonbeelbarta.com