যে মানুষটি চলনবিলকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিলেন

Spread the love
[অধ্যক্ষ সরদার মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ টি.কে.-এর স্মৃতিতে]
মো. মাজেম আলী মলিন
কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন খুব সাধারণভাবে, কিন্তু চলে যাওয়ার পর বুঝিয়ে দিয়ে যান—তাঁদের জীবন মোটেও সাধারণ ছিল না। তাঁদের পরিচয় পদ-পদবি কিংবা অর্জনের তালিকায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের কর্মে, চিন্তায়, স্বপ্নে এবং মানুষের ভালোবাসায়। অধ্যক্ষ সরদার মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ টি.কে. ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। চলনবিলের মাটি ও মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর, আত্মিক এবং আজীবনের।
২৪ আগস্ট ২০২৬ তাঁর ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী ছিলো। ২০০৬ সালের এই দিনে তিনি আমাদের ছেড়ে না-ফেরার দেশে চলে গেছেন । কেটে গেছে দুই দশক। বদলে গেছে সময়, বদলে গেছে চলনবিল, মানুষের জীবনযাপন ও যোগাযোগের ধরন। কিন্তু তাঁর স্মৃতি মুছে যায়নি আজও । বরং সময় যত গড়িয়েছে, তাঁর জীবন ও কর্মের গুরুত্ব ততই স্পষ্ট হয়েছে। কিছু মানুষ শারীরিকভাবে চলে গেলেও তাঁদের উপস্থিতি থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে, তাঁদের সৃষ্টি ও আদর্শে। হামিদ স্যারও তেমনই একজন মানুষ ছিলেন।
চলনবিলের ইতিহাস, শিক্ষা-সংস্কৃতি কিংবা পুরোনো দিনের স্মৃতি মনে পড়লে আজও তাঁর মুখটি মনে পড়ে। মনে হয়, ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা সেই স্নেহময় মানুষটি যেন পাশে দাঁড়িয়ে বলছেন—নিজের মানুষকে চেনো, নিজের মাটিকে জানো, চারপাশের কথা লেখো এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরো। ভালো কাজের সঙ্গে থেকো।
তাঁকে যতটা কাছে থেকে দেখেছি, তার চেয়ে অনেক বেশি চিনেছি তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে। কলেজজীবনে তাঁর সঙ্গে পরিচয় ছিল অল্পদিনের। কিন্তু মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের গভীরতা কখনো সময়ের দৈর্ঘ্যে নির্ধারিত হয় না। তাঁর মুখে নিজের জীবন, চলনবিলের ইতিহাস, শিক্ষা, সমাজ ও দেশ-বিদেশের নানা অভিজ্ঞতার কথা শুনতাম মুগ্ধ হয়ে। তাঁর কথায় মনে হতো, তিনি শুধু গল্প করছেন না—একটি অদেখা পৃথিবীর দরজা আমাদের সামনে খুলে দিচ্ছেন। সেই আলোর কিছুটা আজও আমার স্মৃতিতে জ্বলছে।
পেশায় তিনি ছিলেন রসায়নের শিক্ষক। কিন্তু তাঁকে কেবল রসায়নের শিক্ষক হিসেবে দেখলে তাঁর বিশাল ব্যক্তিসত্তাকে ছোট করে দেখা হয়। বিজ্ঞান থেকে ইতিহাস, সাহিত্য থেকে লোকসংস্কৃতি, শিক্ষা থেকে সমাজ উন্নয়ন—বহু বিষয়ে তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ ও বিস্তৃত জ্ঞান। সুযোগ পেলে আমাদেরও ক্লাস নিতেন। তাঁর কথায় যেমন বই ও ইতিহাসের গন্ধ ছিল, তেমনি ছিল মাটির মানুষের প্রতি গভীর মমতা। তাঁর কাছে শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়; শিক্ষা মানে মানুষকে জানা, সমাজকে বোঝা এবং অর্জিত জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো।
তাঁর জীবনের একটি গল্প আজও মনে পড়ে। ম্যাট্রিকুলেশনে তৃতীয় বিভাগে পাস করেও তাঁর এলাকায় সেদিন যেন উৎসব হয়েছিল—গোসল করিয়ে নতুন পোশাক পরানো, চেয়ারে বসানো, মাইক বাজানো; দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাঁকে দেখতে এসেছিল। আজ গল্পটি নিছক স্মৃতি মনে হলেও এর ভেতর রয়েছে গভীর সত্য—সাফল্য কোনো সনদের বিভাগে নয়, মানুষ পরবর্তী জীবনে কত দূর এগিয়ে যেতে পারে, তার মধ্যেই তার প্রকৃত মূল্য। আব্দুল হামিদ টি.কে. তাঁর জীবন দিয়ে সেই সত্যই প্রমাণ করে গেছেন।
১৯৩০ সালের ১ মার্চ গুরুদাসপুরের খুবজীপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। প্রত্যন্ত জনপদ থেকে উঠে এসে তিনি রসায়নে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ ও বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে পরবর্তীতে আজিজুল হক কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রধান, উপাধ্যক্ষ ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু কোনো পদই তাঁকে সীমাবদ্ধ করতে পারেনি। অবসর গ্রহণের পরও মানুষের কল্যাণে তাঁর কর্মপ্রবাহ থামেনি; আমৃত্যু তিনি সমাজ ও জনপদের জন্য কাজ করে গেছেন।
তাঁর অন্যতম বড় কীর্তি চলনবিলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুসন্ধান। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জনপদকে ভালোবাসার অর্থ তার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনকে সংরক্ষণ করা। সেই দায়বোধ থেকেই তিনি রচনা করেন ‘চলনবিলের ইতিকথা’, যা চলনবিলের আত্মপরিচয় সংরক্ষণের এক মূল্যবান প্রয়াস।
তাঁর লেখালেখির পরিধিও ছিল বিস্ময়কর। ইতিহাস, সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি, শিক্ষা, ধর্ম, ভ্রমণ, জীবনী ও বিজ্ঞান—বিভিন্ন বিষয়ে তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। ‘চলনবিলের ইতিকথা’, ‘চলনবিলের লোকসাহিত্য’, ‘বঙ্গাব্দ সমাচার’, ‘দেখে এলাম অস্ট্রেলিয়া’, ‘পশ্চিম পাকিস্তানের ডায়েরি’, ‘জ্ঞানের মশাল’, ‘আদর্শ শিক্ষক’, ‘হজ্বের সফর’ ও ‘রসায়নের তেলেসমতি’সহ তাঁর গ্রন্থসমূহ তাঁর বহুমাত্রিক মননের পরিচয় বহন করে। একজন রসায়নের শিক্ষক কীভাবে ইতিহাস, লোকসাহিত্য, ভ্রমণ, সমাজ ও মানুষের জীবনকে একই গভীরতায় ধারণ করতে পারেন, তাঁর জীবন তারই অনন্য দৃষ্টান্ত। এছাড়া বাংলা সন সংস্কার নিয়েও তিনি বহু আগে চিন্তা করেছিলেন। বাংলা মাসের দিনসংখ্যা নির্ধারণের বিষয়ে তাঁর প্রস্তাব পরবর্তী সময়ে বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কারের আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। এই দিকটিও তাঁর দূরদর্শী চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়।
তিনি শুধু লিখে যাননি, গড়ে তুলেছেন প্রতিষ্ঠানও। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জনপদের স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন মানুষের উপযোগী প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা বিস্তারে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। গুরুদাসপুর থানা শিক্ষা সংঘ, বিলচলন শহীদ ড. শামসুজ্জোহা কলেজ, খুবজীপুর মোজাম্মেল হক কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, রাস্তা-ঘাট, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নানা উদ্যোগে তাঁর অবদান ছড়িয়ে আছে চলনবিলের বিস্তীর্ণ জনপদে। তাঁর কাছে উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়; মানুষের চিন্তা ও চেতনাকে আলোকিত করাও উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ।
তাঁর দূরদর্শিতার উজ্জ্বল নিদর্শন চলনবিল জাদুঘর। ১৯৭৮ সালে খুবজীপুরে তাঁর উদ্যোগে বেসরকারিভাবে এর যাত্রা শুরু হয়। প্রত্যন্ত গ্রামে তখন জাদুঘর প্রতিষ্ঠার চিন্তা ছিল অসাধারণ দূরদর্শিতার পরিচয়। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একটি জনপদের ইতিহাস শুধু বড় স্থাপনা বা শহরের জাদুঘরে নয়; পুরোনো কৃষি সরঞ্জাম, ব্যবহার্য সামগ্রী ও লোকজ সংস্কৃতির উপাদানেও তার অতীতের স্মৃতি লুকিয়ে থাকে। সেই হারিয়ে যেতে বসা স্মৃতিকে সংরক্ষণ করতেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন চলনবিল জাদুঘর।
চলনবিলের সাংবাদিকতার বিকাশেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৭৮ সালে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় চলনবিল প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি অঞ্চলের কথা সেই অঞ্চলের মানুষকেই তুলে ধরতে হবে। কৃষকের দুঃখ, শিক্ষা-যোগাযোগের সংকট, নদী-বিলের পরিবর্তন, মানুষের সম্ভাবনা ও জনপদের ইতিহাস সংবাদপত্রে তুলে ধরতে তিনি তরুণদের উৎসাহিত করতেন। তাঁর কাছে সাংবাদিকতা ছিল শুধু পেশা নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক সামাজিক দায়িত্ব।
তাঁর জীবনের আরেকটি অধ্যায় তাঁকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। সমাজসেবায় অবদানের জন্য ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁকে (‘তমঘায়ে খেদমত’ সংক্ষেপে টি.কে) খেতাবে ভূষিত করে। কিন্তু ১৯৬৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি সেই খেতাব প্রত্যাখ্যান  করেন। রাষ্ট্রীয় সম্মানের চেয়ে বিবেক ও ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধতাকে তিনি বড় করে দেখেছিলেন। গুরুদাসপুরে বিলচলন শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততাও তাঁর সেই প্রতিবাদী ও মানবিক চেতনারই বহিঃপ্রকাশ।
হামিদ স্যারের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা। তিনি শুধু চলনবিলের অতীত নিয়ে ভাবেননি; এর ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তা করেছেন। বৃহত্তর চলনবিলকে ঘিরে পৃথক প্রশাসনিক কাঠামোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত না হলেও তা তাঁর চিন্তার ব্যাপ্তি ও জনপদের প্রতি গভীর দায়বোধের পরিচয় হয়ে আছে।
এত বড় মাপের মানুষ হয়েও তিনি ছিলেন সহজ, সরল ও নিরহংকারী। মানুষের সঙ্গে আপন করে কথা বলার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। বিশেষ করে তরুণদের তিনি উৎসাহ দিতেন এবং তাঁদের সম্ভাবনাকে চিনে নিতে সাহায্য করতেন। তাঁর স্নেহ ও অনুপ্রেরণায় বেড়ে ওঠা অনেক তরুণ পরবর্তীতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে ও সমাজসেবায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এভাবেই একজন মানুষ নিজের জীবন অতিক্রম করে অন্য মানুষের জীবনের অংশ হয়ে ওঠেন।
আমার নিজের স্মৃতিতে তাঁর স্থানটি তাই একটু আলাদা। পরিচয় দীর্ঘ ছিল না, তাঁর জীবনের সবকিছু জানার সুযোগও হয়নি। কিন্তু যতটুকু দেখেছি, শুনেছি এবং পরে তাঁর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি, তাতেই উপলব্ধি করেছি—মানুষের প্রকৃত উচ্চতা তাঁর পদে নয়, তাঁর রেখে যাওয়া কাজে। তিনি শিখিয়েছেন নিজের মাটিকে ভালোবাসতে, ইতিহাসকে জানতে, মানুষের কথা বলতে এবং একটি ছোট জনপদ থেকেও বড় স্বপ্ন দেখতে। তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল—একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না; তিনি একটি প্রজন্মের চিন্তার পথও বদলে দিতে পারেন।
আজ তাঁর ২০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে মনে হয়, সময় অনেক কিছু বদলে দিয়েছে; কিন্তু তাঁর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। বরং চলনবিলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে যখনই আমরা ভাবি, তখন তাঁর মতো মানুষদের কথা আরও বেশি করে মনে পড়ে। তিনি শুধু তাঁর সময়ের জন্য কাজ করেননি; কাজ করে গেছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও।
আমার চোখে অধ্যক্ষ সরদার মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ টি.কে. স্যার ছিলেন চলনবিলের এক আলোকবর্তিকা—যিনি নিজের জীবন দিয়ে একটি জনপদকে একটু একটু করে আলোকিত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি কলম ধরেছেন ইতিহাসের জন্য, লিখেছেন মানুষের জন্য, প্রতিষ্ঠান গড়েছেন ভবিষ্যতের জন্য এবং তরুণদের শিখিয়েছেন স্বপ্ন দেখতে। আজ তাঁর কবরের মাটিতে হয়তো সময়ের ধুলো জমেছে, কিন্তু তাঁর কর্মে ধুলো জমেনি। বইয়ের পাতায়, গড়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাঙ্গণে, চলনবিলের স্মৃতি ও মানুষের হৃদয়ে তিনি আজও বেঁচে আছেন।
কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের হাতে জ্বালানো আলো নিভে যায় না। অধ্যক্ষ সরদার মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ টি.কে. ছিলেন তেমনই এক আলোকিত মানুষ। তাঁর ২০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় তাঁকে স্মরণ করি। মহান আল্লাহ তাঁর কবর নূরে ভরিয়ে দিন, তাঁর সব নেক আমল কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।#২৯.৮.২৬
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ,রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট। 
Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD