শুধু নদী খনন নয়, নদীর পুনর্জীবন চাই

Spread the love

দীপক কুমার কর (কবিকঙ্কণ)
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। কিন্তু আজ দেশের অসংখ্য নদী তার চিরচেনা রূপ হারিয়ে সরু খাল, মরা জলধারা কিংবা দখল-পলিতে ভরাট জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। নদী রক্ষার নামে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে খনন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। প্রশ্ন হলো—এসব খননে কি নদী সত্যিই ফিরে আসছে, নাকি নদীর অবশিষ্ট শরীরটুকুকেও আরও সংকুচিত করা হচ্ছে?
সিরাজগঞ্জ ও বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের বহু মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গে ফুলজোড়, করতোয়া ও বাঙালি নদীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। একসময় এসব নদী ছিল শুধু পানি বহনের পথ নয়; ছিল কৃষি, মৎস্য, নৌযাত্রা, বাণিজ্য ও জনপদ গঠনের প্রাণশক্তি। আজ কোথাও পলি, কোথাও দখল, দূষণ, কোথাও সংযোগ খাল বন্ধ হয়ে যাওয়া, কোথাও অপরিকল্পিত স্থাপনা এবং কোথাও ভুল পদ্ধতির খনন—সব মিলিয়ে নদীগুলোর স্বাভাবিক চরিত্র বদলে যাচ্ছে।
নদী বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি দীর্ঘদিনের—নদী পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে শুধু বর্তমানের সংকুচিত চিত্র নয়, নদীর ঐতিহাসিক গতিপথ ও বিস্তার বিবেচনা করতে হবে। বিশেষত সিএস জরিপের মানচিত্র, পরবর্তী আরএস জরিপ, টপোগ্রাফিক তথ্য, পুরোনো স্যাটেলাইট চিত্র এবং বর্তমান নদীভূ-প্রকৃতির সমন্বিত বিশ্লেষণ ছাড়া নদী খনন করলে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
সিএস মানচিত্রের নদী কোথায় গেল?
সিএস বা ক্যাডাস্ট্রাল জরিপ বাংলাদেশের ভূমি ও জলসীমানার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল। বহু নদীর ক্ষেত্রে এই জরিপে যে বিস্তৃত জলসীমানা দেখা যায়, পরবর্তী সময়ের আরএস বা রিভিশনাল জরিপে তা অনেক ক্ষেত্রে সংকুচিত দেখা যায়।
এর কারণ শুধু নদীর স্বাভাবিক পরিবর্তন নয়। সময়ের সঙ্গে নদীতে পলি জমেছে, চর সৃষ্টি হয়েছে, দখল হয়েছে, বসতি ও স্থাপনা গড়ে উঠেছে। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরবর্তী মানচিত্রে নদীর যে সংকুচিত চেহারা দেখা যায়, তা নদীর প্রকৃত ঐতিহাসিক রূপের প্রতিফলন নাও হতে পারে।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যে নদী একসময় কয়েকশ মিটার প্রশস্ত ছিল, দখল ও পলি জমে পরে যদি অনেক সরু হয়ে যায়, তাহলে পরবর্তী জরিপে সংকুচিত অংশটুকুকেই কি নদীর চূড়ান্ত সীমানা ধরে নিতে হবে?
ফুলজোড়, করতোয়া কিংবা বাঙালি নদীর মতো নদীগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সময় এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তবে এটিও সত্য যে, শুধু সিএস মানচিত্র ধরে হুবহু নদী পুনর্নির্মাণ করাও সব ক্ষেত্রে সম্ভব বা বিজ্ঞানসম্মত নয়।

কারণ নদী একটি জীবন্ত ভূ-প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। শত বছর আগের নদীর জায়গায় আজ জনপদ, রাস্তা, কৃষিজমি ও অন্যান্য স্থাপনা গড়ে উঠেছে। তাই সমাধান হলো না শুধু সিএস অথবা শুধু আরএস।
সমাধান হলো—সিএস, আরএস, এসএ, বিএস, পুরোনো মানচিত্র, স্যাটেলাইট চিত্র এবং নদীর বর্তমান ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থার সমন্বিত বিশ্লেষণ।
নদী খনন করে মাটি নদীতেই—এ কেমন উন্নয়ন?
নদী খননের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক একটি চিত্র হলো—নদীর বুক থেকে কোটি টাকার মাটি কেটে আবার নদীর দুই পাশের ভেতরেই ফেলে রাখা।
এতে প্রথমে মনে হয় নদী খনন হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নদীর দুই পাশে খননকৃত মাটির উঁচু স্তূপ তৈরি হলে নদীর কার্যকর প্রস্থ কমে যেতে পারে। বর্ষার অতিরিক্ত পানি ছড়িয়ে পড়ার স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হয়। নদীর সঙ্গে সংযুক্ত নিম্নভূমি, বিল ও খালের স্বাভাবিক জলবিনিময়ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আরও বড় বিপদ হলো, নদী তার স্বাভাবিকভাবে বহন করে আনা পলি কোথায় ফেলবে?
যদি নদীর প্রস্থ সংকুচিত করা হয় এবং তার দুই পাশ মাটি দিয়ে উঁচু করে ফেলা হয়, তাহলে নদী আবার নিজের বুকেই পলি জমাতে শুরু করবে। কয়েক বছর পর নতুন করে খননের প্রয়োজন হবে।
তাহলে প্রশ্ন উঠবে—আমরা কি নদী বাঁচাচ্ছি, নাকি একটি স্থায়ী খনন-চক্র তৈরি করছি?
ফুলজোড় নদী হোক, করতোয়া হোক কিংবা বাঙালি নদী—প্রতিটি নদীর ক্ষেত্রেই খননের মাটি কোথায় ফেলা হচ্ছে, তা নদী খননের গভীরতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
নদীকে শুধু গভীর করলেই নদী ফিরে আসে না।
নদীর প্রাণ শুধু তার গভীরতায় নয়। নদীর প্রাণ তার প্রবাহে, প্রস্থে, বাঁকে, পলি পরিবহনে এবং আশপাশের জলাভূমির সঙ্গে সংযোগে।
একটি নদীকে কেটে গভীর করা হলো, কিন্তু তার উজানের প্রবাহ নেই; শাখা খালগুলো বন্ধ; নদীর দুই পাশ দখল হয়ে গেছে; বন্যাপ্রবাহভূমি ভরাট; খননের মাটি নদীর ভেতরেই রাখা হয়েছে—তাহলে সেই নদী কখনো তার সত্যিকারের প্রাণশক্তি ফিরে পাবে না।
এটি অনেকটা মানুষের রক্তনালী পরিষ্কার করে আবার তার চারপাশে চাপ সৃষ্টি করার মতো।
ফুলজোড় নদীর সঙ্গে যুক্ত খাল ও জলাভূমির সংযোগ, করতোয়ার ঐতিহাসিক প্রবাহপথ এবং বাঙালি নদীর অববাহিকাগত সম্পর্ক—সবকিছুকে একত্রে বিবেচনা না করলে শুধু মূল নদীপথ খনন স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না।
একটি নদী একা বাঁচে না; তার পুরো জলব্যবস্থাকে বাঁচাতে হয়।
ইতিহাস থেকে শিক্ষাঃ
বাংলাদেশের নদীর ইতিহাস বলে, নদীর গতিপথ পরিবর্তন স্বাভাবিক। ব্রহ্মপুত্রের প্রধান প্রবাহপথ পরিবর্তিত হয়ে যমুনা সৃষ্টি হওয়া এ অঞ্চলের নদীভূ-প্রকৃতির অন্যতম বড় ঐতিহাসিক উদাহরণ।
কিন্তু নদীর স্বাভাবিক পরিবর্তন আর মানুষের কারণে নদীর মৃত্যু এক বিষয় নয়।
নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু দখল, বাঁধ, অপরিকল্পিত স্থাপনা, সংযোগ খাল বন্ধ করে দেওয়া এবং ভুল খননের ফলে নদী যখন ধীরে ধীরে সরু নালায় পরিণত হয়, তখন তাকে স্বাভাবিক পরিবর্তন বলা যায় না।
এ কারণেই নদী পুনরুদ্ধারের আগে প্রতিটি নদীর একটি ঐতিহাসিক নদী-প্রোফাইল তৈরি করা জরুরি।
জানতে হবে—
সিএস জরিপে নদী কোথায় এবং কতটা বিস্তৃত ছিল;
আরএস জরিপে কী পরিবর্তন ঘটেছে;
পরবর্তী জরিপগুলোতে কীভাবে নদী সংকুচিত হয়েছে;
গত ৫০ থেকে ৭০ বছরে স্যাটেলাইট চিত্রে নদীর গতিপথ কীভাবে বদলেছে;
কোন কোন খাল ও জলাভূমি একসময় নদীর সঙ্গে যুক্ত ছিল;
কোথায় পলি জমছে এবং কেন;
উজান থেকে পর্যাপ্ত পানি আসছে কি না।
কী করলে নদী ফিরে পাবে তার যৌবন?
নদীকে হুবহু শত বছর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সব ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। কিন্তু তার হারানো প্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

প্রথমত, প্রতিটি নদীর জন্য বৈজ্ঞানিক নদী পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা করতে হবে। কোনো খনন প্রকল্প শুরুর আগে নদীর হাইড্রোলজি, পলি, প্রবাহ, গভীরতা, প্রস্থ ও বাঁকের বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিক সীমানা নির্ধারণে বহু উৎসের তথ্য ব্যবহার করতে হবে। শুধু আরএস মানচিত্র বা শুধু বর্তমান প্রবাহকে নদীর চূড়ান্ত পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না।
তৃতীয়ত, খননকৃত মাটি নদীর ভেতরে বা তার স্বাভাবিক প্লাবনভূমি বন্ধ করে এমনভাবে ফেলা বন্ধ করতে হবে, যাতে নদীর প্রাকৃতিক বিস্তার ও জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়।
চতুর্থত, নদীর সঙ্গে যুক্ত খাল-বিল পুনঃসংযোগ করতে হবে। ফুলজোড়, করতোয়া ও বাঙালি নদীর মতো নদীগুলোকে বাঁচাতে হলে তাদের শাখা জলপথও বাঁচাতে হবে।
পঞ্চমত, নদী দখলমুক্ত করতে হবে। নদীর বুক খনন করে দুই পাড়ে অবৈধ স্থাপনা রেখে নদী পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
ষষ্ঠত, বড় প্রকল্পের আগে নদী বিশেষজ্ঞ, ভূতত্ত্ববিদ, পরিবেশবিদ, হাইড্রোলজিস্ট, ভূমি জরিপবিদ এবং স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির মতামত নিতে হবে।
নদী খনন নয়, নদীর পুনর্জন্মঃ
আমাদের উন্নয়নের দর্শন বদলাতে হবে। নদীকে শুধু একটি পানি নিষ্কাশনের নালা হিসেবে দেখলে চলবে না। নদী একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র, একটি ভূ-প্রাকৃতিক ইতিহাস এবং একটি জনপদের জীবনরেখা।
ফুলজোড়, করতোয়া ও বাঙালি নদীকে বাঁচাতে হলে শুধু খননযন্ত্র নামালেই হবে না। জানতে হবে নদী কোথা থেকে এসেছে, কোথায় গেছে, কোথায় তার পথ রুদ্ধ হয়েছে এবং কোথায় তার স্বাভাবিক প্রবাহের শক্তি হারিয়েছে।
সিএস মানচিত্র আমাদের বলে নদীর ইতিহাস।
আরএস মানচিত্র বলে পরিবর্তনের একটি পর্যায়।
স্যাটেলাইট চিত্র বলে সাম্প্রতিক রূপান্তর।
আর নদীর স্রোত, পলি ও ভূ-প্রকৃতি বলে—নদী আজ কী চায়।
এই সব তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করেই নদী পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করতে হবে।
নদীর যৌবন ফিরবে শুধু গভীর খননে নয়। ফিরবে তার স্বাভাবিক প্রস্থ, প্রবাহ, বাঁক, পলি পরিবহনের ক্ষমতা এবং খাল-বিল-জলাভূমির সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্ক ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে।
অতএব, সময়ের দাবি—নদী খননের আগে নদীর ইতিহাস পড়ুন; নদীর বুক কাটার আগে তার প্রবাহ বুঝুন; আর নদী খনন করে সেই মাটি নদীর ভেতরেই ফেলে নদী বাঁচানোর প্রহসন বন্ধ করুন।
আমরা আর খাল তৈরি করার জন্য নদী খনন দেখতে চাই না।
আমরা চাই—ফুলজোড় আবার প্রবাহিত হোক, করতোয়া তার হারানো জলপথ ফিরে পাক, বাঙালি নদী তার অববাহিকার সঙ্গে নতুন করে সংযুক্ত হোক।
কারণ নদী বাঁচলে শুধু পানি বাঁচে না—বাঁচে কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ এবং একটি পুরো জনপদের ভবিষ্যৎ।
তাই শুধু নদী খনন নয়—নদীর পুনর্জীবন চাই।
লেখক: সাংবাদিক।
সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ,  বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ) ।
আহ্বায়ক,  বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর সিরাজগঞ্জ জেলা শাখা।

Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD