আবুল কালাম আজাদ।।
১৯৮৫ সাল। নাটোর থেকে প্রকাশিত জেলার একমাত্র সংবাদপত্র “সাপ্তাহিক প্রকাশ “ প্ত্রিকার সম্পাদক কাজী গোলাম মোর্শেদ ভাই এবং প্রকাশক অলিউজ্জামান খান মুকুল ভাইয়ের অনুরোধে গুরুদাসপুর উপজেলা পরিষদ পাঠাগারের লাইব্রেরিয়ানের চাকরি ছেড়ে দিয়ে সাপ্তাহিক প্রকাশ পত্রিকায় বার্তা সম্পাদক পদে যোগদান করি।আমি তখন চলনবিল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ,আতহার হোসেন সভাপতি।
সাপ্তাহিক প্রকাশ পত্রিকায় দায়িত্ব পালনকালে নবির ভাই,জুলফিকার হায়দার যোশেফ, এস এম বাবু, রনেন দা, খগেন দা, মোর্শেদ ভাইয়ের ভাগ্নে ফরাজী এ আর বাবন, বাপ্পী,কবি আশিক, আর্টিষ্ট আবুল মার্শাল, আজিজুল হক টুকু, হালিম খান, ফরহাদ, গোলাম মোস্তোফা, বাপ্পি, সিংড়ার সাবেক এমপি আসরাফ চাচা, আসগর চাচা, মিঠু, শারফুল ইসলাম খান খোকনসহ অনেকেই পত্রিকায় লেখা দিতেন । আমি সেগুলি সম্পাদনা করে প্রকাশ পত্রিকায় ছাপনোর ব্যবস্থা করতাম। এম আসলাম লিটন দিত কার্টুন। এতে সবাই আমার প্রতি খুব খুশি হত। মনে হতো আমরা সবাই প্রকাশ পত্রিকা পরিবার। প্রতিদিনই পত্রিকা অফিসে এবং নাটোর প্রেসক্লাবে আড্ডা দিতাম এবং নিউজ নিয়ে মতবিনিময় করতাম।
সেই সুবাদে নবির ভাইয়ের সাথে গভির সম্পর্ক গড়ে উঠে। আমাকে ছোট ভাইয়ের মত স্নেহ করতেন। আমার খুব ভক্ত ছিলেন। আমিও নবির ভাইকে পছন্দ করতাম আগ্রহ এবং সততার জন্য। নবির ভাই ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং নাটোর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার ।নবির ভাইয়ের সাথে আমার গভী হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। ধিরে ধিরে নবির ভাই নবির ভাই সাংবাদিকতা করার আগ্রহ জানালে আমি বগুড়ার দৈনিক উত্তর বার্তা পত্রিকায় লেখার জন্য বলি। নবির ভাই প্রাতষ্ঠানিক লেখা-পড়া প্রাথমিকের গন্ডি পাড় হতে পারেনি হয়তো। হাতের লেখা বুঝা কষ্টসাধ্য ছিল। সিংড়ার নির্ভিক প্রবীন সাংবাদিক আলী আসগর চাচার লেখা কাগজের পাতা থেকে উদ্ধার করা আমার খুব কষ্ট হতো। নবির ভাইয়ের আগ্রহ দেখে আমি উতসাহিত করি। নিউজ ড্রাফট করে দেই। নিউজ নিয়মিত ছাপা হতে লাগলো। নাটোর জেলা প্রতিনিধি হিসেবে আমার তত্তাবধানে নিয়মিত লিখতে থাকেন।এবং নাটোর জেলার প্রায় সব কটা উপজেলার সরকারি ও বেসরকারি বিজ্ঞাপন একচ্ছত্রভাবে উত্তরবার্তায় দিতেন। এতে উত্তর বার্তা পত্রিকা অফিসে ভালো স্থান করে নেন। সম্পাদক মাহবুব ভাই , শংকরদা, আশিষ উর রহমান শুভ, সার্কুলেশন ম্যানেজার আবুবকর সিদ্দিক, বিজ্ঞাপন ম্যানেজার হামিদ এবং বিশিষ্ট কলামিষ্ট আব্দুল মতিন খালুসহ সাবার কাছে দায়িত্বশিল সাংবাদিক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।আমি শংকরদাকে চিঠি লিখে দিলাম নবির ভাইয়ের সংবাদ ছাপানো এবং জেলা ব্যুরো প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেয়ার জন্য। নবির ভাই প্রস্তাব দিলেন বগুড়া পত্রিকা অফিসে যাওয়ার জন্যে। নবির ভাইয়ের অনুরোধে রাজি হলাম ।
১৯৮৭ সাল, ১ জানুয়ারী , বৃহস্পতিবার নববর্ষের শুরুতেই সকাল থেকে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি -শ্রমিক ইউনিয়ন জোটের আহবানে ৬ দফা দাবীতে বাস, ট্রাক, কাভার্ড, ট্যাংক লরি , রিক্সা-ভ্যানসহ সকলপ্রকার পরিবহনের অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট শুরু হয়। সামরিক সরকার জেনারেল এরশাদের পদত্যাগ ও নির্বাচনের দাবিতে বিরোধী দল আওয়ামী লীগ –বিএনপি –জামায়াত ও সমমনা বাম দলের যুগপত হরতাল, অবরোধ অসহক্সোগ এবং আন্দোলনে দেশে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে।
প্রকাশ পত্রিকা অফিসের দোতালায় আমি থাকি। নবির ভাই ভোরে আমার রুমে আসেন। দুইজনে রিক্সায় নাটর ষ্টেশনে গেলাম। ভোর ৬ টার লোকাল ট্রেনের টিকিট করলাম। দেশব্যাপী পরিবহন ধর্মঘটের কারণে ষ্টেশনে যাত্রীদের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকাও যাচ্ছিলনা। অবশেষে ২ ঘন্টা অপেক্ষার অবসান ঘটেয়ে ৮ টার সময় ট্রেন এসে ষ্টেশনে ভিড়লো। ট্রেনে যাত্রীর চাপে তিল ধারনের ঠাঁই নাই । উপরে-নীচে যাত্রী গিজগিজ করছে। আমি –নবির ভাই অনেক কষ্টে একটা বগিতে উঠে চিপাচিপি করে সুবিধামত জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলাম। আধা ঘন্টা পর যাত্রী উঠায়ে অবশেষে ট্রেন হুইসাল বিয়ে ছাড়লো। ট্রেন বাবাজী পেটে-বুকে-পিঠে ভর্তি মানুষ এবং মালামাল নিয়ে হেঁটে চলা গতিতে সবকয়টা ষ্টেশনে আধা ঘন্টা, এক ঘন্টা বিশ্রাম নিতে নিতে বিকাল ৪ টার দিকে শান্তাহার জংশনে গিয়ে পৌছালাম। শান্তাহার ট্রেন বদল করে বগুড়ার ট্রনে উঠে প্রায় দুই ঘন্টা মানুষের চাপাচাপি গুতাগুতি, পিষাপিষি সহ্য করে দাঁড়িয়ে রাত ১২ টায় বগুড়া ষ্টেশনে নেমে পায়ে হেঁটে সাতমাথা পত্রিকা অফিসে পৌঁছাই। হঠাত এত রাতে বিদ্ধস্ত অবস্থায় আমাদে র দেখে শংকরদা শুভ, সিদ্দিক , হামিদ ভাই এবন কম্পোজিটররা বিস্মিত। শিতের রাত আমরা কাঁপছি। শংক রদা আমাদের থাকার জন্য খান বোর্ডিংয়ে ফোন করে দিলেন। সার্কুলেশন ম্যানেজার সিদ্দিক ভাই নিজে গিয়ে বোর্ডিংয়ে রেখে আসলেন। ফ্রেস হয়ে রাত দেড়টার দিকে আকবরিয়া হোটেলে খেয়ে দুইজন বোর্ডিংয়ে গিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।
পরদিন সকাল ১০টায় নাস্তা করে পত্রিকা অফিসে গিয়ে নবির ভাইয়ের জেলা ব্যুরো প্রতিনিধির নিয়োগ এবং পরিচয়পত্র সম্পাদক মাহবুব ভাই অফিসে আসলে স্বাক্ষর করার আগে কিছু শর্ত দেম। শর্তগুলি হচ্ছে, নাটোর জেলার ৬ উপজেলার সরকারি বিজ্ঞাপন নিয়ে দিতে হবে, পত্রিকার সার্কুলেশন বৃদ্ধির জন্য এজেন্ট এবং হকার নিয়োগ দিতে হবে। যেসব উপজেলায় প্রতিনিধি নাই সেসব উপজেলায় সাংবাদিক নিয়োগ দিতে হবে।এজেন্ট এবং বিজ্ঞাপনের কমিশন বিষয়েও বলে স্বাক্ষর করেন। নিয়োগ পত্র নিয়ে সাপ্তাহিক জীবন পত্রিকা অফিসে গিয়ে জীবন পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম এবং তাঁর সহধর্মিনী অধ্যাপক নূর আফরো জ্যোতি ( প্রধান মন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় ১৯৯১ সালে বি এন পির সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য ছিলেন) এর সাথে সাক্ষাত করে নাটোর যাওয়ার জন্য দ্রুত চলে আসি। কারণ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাস, ট্রাক, ট্যাংক লরি মালিক –শ্রমিকদের হরতাল চলছে , ভাগ্যক্রমে কোন পরিবহন যদি পাই চেপে নাটোর যাওয়া যাবে। কিন্তু বিধি বাম। শহরে ঢুকে দেখি পরিবহন শ্রমিকদের পিকেটিংয়ের ভয়ে রিক্সাও বন্ধ।
কোন উপায় না দেখে দুইজন আল্লাহর নাম নিয়ে সাহসে বুক বেঁধে বগুড়া থেকে পায়ের ওপর ভরসা করে মহাসড়ক দিয়ে হেঁটেই এক দুঃসহ যাত্রা শুরু করলাম। মহাসড়ক ফাঁকা। কোনরকম যানবাহন নাই। দুইজন গল্প করতে করতে হেটেই চলছি তো চলছিই………। দুই তিন মাইল যাওয়ার পর বিশ্রাম নিচ্ছি আর ষ্টলে বসে চা-বিস্কুট ক্লান্তি দূর করছি। সমস্ত সড়কেই চলছে শ্রমিকদের পিকেটিং।সড়কে গাছ ফেলে , টায়ার জ্বালিয়ে উল্লাস করছে আর শ্লোগান দিচ্ছে “স্বৈরাচার এরশাদ গদি ছারো, আমাদের দাবী মানতে হবে ইত্যাদি”। আমরা পিকেটিং এড়িয়ে এগিয়ে চলছি সামনে।
এদিকে নবির ভাই মুক্তিযুদ্ধের সময় গুলি লেগে আহত হয়েছিলেন। দীর্ঘ পথ একটানা হাঁটায় জুতার ঘর্ষনে ক্ষতস্থান ফুলে ব্যথায় হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল।তুবুও প্রবীন বীর মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধকালিন সময়ের মত বুকে সাহস ও শক্তি নিয়ে একসাথে পা মিলিয়া মার্চ করে দুইজন হেঁয়ে এগিয়েই চিলছি সামনে। ক্ষুধা, হাঁটার ক্লান্তি আমাদের পথ মনে হচ্ছে আরো দীর্ঘ হচ্ছে।
পশ্চিমে সূর্য লাল হয়েছে। সন্ধ্যা নেমে আসছে।নন্দিগ্রাম,ছেড়ে ওমরপুর পাড় হচ্ছি এমন সময় পি ছন ফিরে দেখি বগুড়ার সাপ্তাহিক জীবন পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম স্যার পুড়াতন মডেলের এটলাস হোন্ডা—50 মটর সাইকেল নিয়ে আমাদের দিকেই আসছেন। আমাদের হাটতে দেখেই সুহৃদ রফিকুল ইসলাম স্যার চমকে উঠেন। বাইক থামালেন। রাত ঘনিয়ে আসছে। যেতে হবে আরও বহুদুর……..।
রফিক স্যার জানালেন তিনি রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে যাচ্ছেন। রাত হয়ে আসছে। সামনে রাস্তাও রনবাঘা থেকে সিংড়া সম্পুরর ফাঁকা। আমাদের হেঁটে যাওয়া সম্ভব হবেনা। তাছাড় নিরাপত্তারও বিষয় আছে। সবকিছে বিবেচনা করে রফিক স্যার আমাদেরকে তাঁর ছোট্র মটরসাইকেলে উঠার জন্য পিড়াপিড়ি করতে লাগলেন।আমরাও নিজেদের বিপদের কথা ভেবে অবশেষে আমি মাঝখানে এবং নবির ভাই পিছনে ক্যারিয়ারে তিনজন ঠাসা ঠাসি করে বসি। রফিক স্যার দক্ষ হাতে দীর গতিতে বাইক চালিয়ে নাটোর পৌঁছাতে প্রায় ৪ ঘন্টা সময় লাগে। রাত সাড়ে ১১ টার দিকে প্রকাশ পত্রিকা অফিসে এসে পৌঁছাই। পত্রিকা অফিসের দোতালায় আমার রুমে গিয়ে তিনজন ফ্রেশ হয়ে হোটেলে গিয়ে খেয়ে নবির ভাই বাসায় গেলেন। রাত্রে স্যারকে আর রাজশাহী যেতে দিলামনা। আমার রুমেই তাকার ব্যবস্থা করলাম। পরদিন সকালে নাস্তা করে মহান আল্লাহর ইচ্ছায় আমাদের ত্রানকর্তা রফিকুল ইসলাম স্যার রাজশাহী রওয়ানা হলেন। পাঠক, দুইদিনের এই দুঃসহ ভ্রমন যাত্রার কথা মনে হলে আজও শিহরিত হই এবং তাঁর জীবনের ঝুঁকিনিয়ে আমাদেরকে উদ্ধার করে নাটোর পৌঁছে দেওওয়ার জন্য এখনো বারবার কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হই।।
## আবুল কালাম আজাদ, সাপ্তাহিক প্রকাশ পত্রিকার সাবেক বার্তা সম্পাদক ( ১৯৮৫-১৯৯৫ ), প্রধান উপদেষ্টা ও সাবেক সভাপতি, চলনবিল প্রেসক্লাব, গুরুদাসপুর, নাটোর, ০১৭২৪ ০৮৪৯৭৩, তারিখ ১/৯/২০২৬ ##
Weekly Chalonbeel Barta chalonbeelbarta.com