মো. মাজেম আলী মলিন
মানুষের জীবন কখনো কখনো একটি জনপদের ইতিহাসের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে, মানুষটি চলে গেলেও তাঁর ছায়া থেকে যায় মাটির গন্ধে, মানুষের কথায়, স্মৃতির অলিগলিতে। সময় তাঁকে সরিয়ে নেয় দৃশ্যপট থেকে, কিন্তু মুছে ফেলতে পারে না তাঁর পদচিহ্ন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক মো. আব্দুল কুদ্দুস ছিলেন তেমনই একজন। চলনবিলের পানি-মাটি আর সাধারণ মানুষের জীবন থেকে উঠে এসে যিনি পৌঁছেছিলেন জাতীয় রাজনীতির শীর্ষপর্যায়ে। তাঁর জীবন ছিল রাজনীতি, আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, প্রতিকূলতা, জনসম্পৃক্ততা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের এক বিস্তৃত অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের শেষ পৃষ্ঠা লেখা হয়েছে তিন বছর আগে; কিন্তু গল্পটি এখনো শেষ হয়নি।
২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে। আজ তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। তিন বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে। বদলেছে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, বদলেছে নেতৃত্বের বিন্যাস, বদলেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অনেক পরিচিত দৃশ্য। অথচ নাটোরের রাজনীতির স্মৃতিতে অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস এখনো একটি উজ্জ্বল ও আলোচিত নাম।
১৯৪৬ সালের ৩১ অক্টোবর গুরুদাসপুর উপজেলার বিলশা গ্রামে তাঁর জন্ম। চলনবিলের যে মাটি তাঁকে জন্ম দিয়েছিল, সেই মাটির আলো-বাতাসেই তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। পরবর্তী সময়ে রাজশাহী কলেজ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি জড়িয়ে পড়েন সময়ের উত্তাল ছাত্ররাজনীতিতে।
সেটি ছিল বাঙালির ইতিহাসের এক অগ্নিগর্ভ সময়। ষাটের দশক তখন স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তাপে উত্তপ্ত। ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ—একটির পর একটি ঐতিহাসিক ঘটনা জাতিকে নিয়ে যাচ্ছিল স্বাধীনতার অনিবার্য পরিণতির দিকে। সেই সময়ের রাজনীতিতে অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস ছিলেন সক্রিয় একজন সংগঠক ও নেতা।
ছাত্রজীবনেই তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভিত গড়ে ওঠে। রাজশাহী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্ব, বৃহত্তর রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব, রাজশাহী কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তাঁর ভূমিকা তাঁকে নিয়ে যায় বৃহত্তর রাজনীতির পথে। মুজিব বাহিনীর রাজশাহী অঞ্চলের আহ্বায়ক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে কয়েক দশকের পথচলায় তিনি রাজশাহী ও নাটোরের রাজনীতিতে নিজের যোগ্যতা ও সাংগঠনিক দক্ষতায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের পাশাপাশি আমৃত্যু নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। কারাবন্দি অবস্থাতেও বৃহত্তর রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯১ সালে নাটোর-৪ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সাতবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে পাঁচবার বিজয়ী হন। পঞ্চম, সপ্তম, নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদে তিনি নাটোর-৪ আসনের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। ছাত্রনেতা থেকে পাঁচবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য—তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন হয়ে ওঠে সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও জনসম্পৃক্ততার এক অনন্য অধ্যায়।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন তাঁর রাজনৈতিক জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জাতীয় পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেলেও নিজের নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি।
গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রামের মানুষের কাছে তাঁর পরিচয় কেবল একজন সাবেক প্রতিমন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি পরিচিত মুখ—যাঁর কাছে মানুষ নিজেদের কথা বলত, প্রত্যাশা জানাত, অভাব-অভিযোগ তুলে ধরত।
রাজনীতির অভিধানে জনপ্রতিনিধি শব্দটির অর্থ অনেক সময় কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু একজন রাজনীতিক তখনই সত্যিকার অর্থে জনসম্পৃক্ত হয়ে ওঠেন, যখন মানুষের জীবনের আনন্দ-বেদনা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অংশ হয়ে যায়। অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুসের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়নে এই জনসম্পৃক্ততার জায়গাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে তাঁর পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। আন্দোলন-সংগ্রাম, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, নিপীড়ন ও কারাবরণের অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। রাজনীতির কঠিন সময়ে তিনি যে মূল্য দিয়েছেন, তাঁর সহযোদ্ধা ও অনুসারীদের কাছে সেসব স্মৃতি আজও তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও ত্যাগের প্রতীক।
অবশ্য কোনো মানুষের জীবনকে কেবল প্রশংসার আলোয় দেখলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একজন রাজনীতিকের সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক অবস্থান, সীমাবদ্ধতা ও সময়ের প্রেক্ষাপটও বিচার করা প্রয়োজন। অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুসও তার বাইরে নন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে ইতিহাস নিশ্চয়ই নিজস্ব ভাষায় মূল্যায়ন করবে।
কিন্তু ইতিহাসের নির্মোহ বিচারের পাশাপাশি মানুষের স্মৃতিরও একটি নিজস্ব ভাষা থাকে। সেই ভাষায় আব্দুল কুদ্দুসের পরিচয় অনেক বেশি ব্যক্তিগত, অনেক বেশি মানবিক।
২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর নাটোরের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। পরদিন বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর পাইলট মাঠ এবং সর্বশেষ তাঁর জন্মস্থান বিলশা ঈদগাহ মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বিপুলসংখ্যক মানুষ তাঁর শেষ বিদায়ে অংশ নেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। পরে জন্মভূমির বিলশা কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
শেষ বিদায়ের সেই দৃশ্য ছিল একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রতি মানুষের নীরব স্বীকৃতি। সেখানে শুধু রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ছিলেন না; ছিলেন সাধারণ মানুষও। কেউ এসেছিলেন রাজনৈতিক সম্পর্কের টানে, কেউ ব্যক্তিগত স্মৃতি নিয়ে, কেউবা একটি পরিচিত মুখকে শেষবারের মতো দেখার আকাঙ্ক্ষায়।
সেদিন হয়তো কেউ হিসাব করেনি—তিনি কতবার সংসদ সদস্য ছিলেন, কতটি পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। শেষ বিদায়ের মুহূর্তে পদ-পদবির হিসাব মুছে গিয়ে সামনে এসেছিল একজন মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক।
তিন বছর পর আজ সেই সম্পর্কই সবচেয়ে বেশি কথা বলে। চলনবিল তার নিজস্ব ছন্দে এখনো বেঁচে আছে। বর্ষায় বিলের জল বাড়ে, বাতাসে কাশফুল দোলে, কৃষক মাঠে যায়, নৌকা চলে, সন্ধ্যা নামে। জনপদ তার প্রতিদিনের ব্যস্ততায় ফিরে যায়। প্রকৃতি কারও চলে যাওয়ার জন্য থেমে থাকে না। কিন্তু মানুষের স্মৃতি থেমে থাকে—কখনো একটি নামের কাছে, কখনো একটি মুখের কাছে, কখনো একটি সময়ের কাছে।
কোনো প্রবীণ মানুষের কথায় যখন তাঁর নাম উঠে আসে, তখন ফিরে আসে একটি সময়। মনে পড়ে আন্দোলনের দিন, নির্বাচনের দিন, রাজনৈতিক উত্তাপের দিন, মানুষের ভিড় আর জনসভায় তাঁর কণ্ঠ। নতুন প্রজন্ম হয়তো সেই সময় দেখেনি; কিন্তু ইতিহাসের সূত্র ধরে তারা একদিন জানতে চাইবে—এই মানুষটি কে ছিলেন?
আব্দুল কুদ্দুসের উত্তরাধিকার শুধু তাঁর নির্বাচনী সাফল্যে নয়; তাঁর উত্তরাধিকার রয়েছে একটি প্রজন্মের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায়, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে, মানুষের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্কের গল্পে এবং নাটোরের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর রেখে যাওয়া দৃশ্যমান চিহ্নে।
চলনবিলের মাটি থেকে উঠে আসা সেই মানুষটি শেষ পর্যন্ত আবার ফিরে গেছেন সেই মাটিতেই। জন্ম ও মৃত্যুর এই বৃত্ত যেন তাঁর জীবনের এক গভীর প্রতীক। যে জনপদ তাঁকে বড় করেছে, রাজনীতির দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত সেই জনপদই তাঁকে আপন করে নিয়েছে।
সময়ের নিয়মে মানুষ চলে যায়। প্রজন্ম বদলায়। রাজনৈতিক পতাকা বদলায়। নতুন নেতার আবির্ভাব ঘটে। পুরোনো স্লোগান একদিন ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। কিন্তু কিছু নাম সময়ের ক্যালেন্ডারে আটকে থাকে না। তাঁরা মানুষের স্মৃতিতে নিজেদের জন্য একটি আলাদা জায়গা তৈরি করে নেন। অধ্যাপক মো. আব্দুল কুদ্দুস সেই স্মৃতিরই একজন মানুষ।
তাঁকে নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে, মূল্যায়নের ভিন্নতা থাকতে পারে, ইতিহাস তাঁর কর্মকাণ্ডকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে পারে। কিন্তু নাটোরের রাজনীতির একটি দীর্ঘ সময়ের কথা বলতে গেলে তাঁর নাম উচ্চারিত হবেই। কারণ তিনি শুধু সেই সময়ের অংশ ছিলেন না; তিনি নিজেই ছিলেন সেই সময়ের অন্যতম নির্মাতা ও সাক্ষী।
আজ তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন প্রয়াত রাজনীতিককে স্মরণ করা নয়। স্মরণ করা একটি সময়কে, একটি রাজনৈতিক প্রজন্মকে, একটি দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনকে এবং চলনবিলের সেই মাটিকে—যে মাটি একজন তরুণকে রাজনীতির পথে পাঠিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকেই নিজের বুকে চিরদিনের জন্য আশ্রয় দিয়েছে।
চলনবিলের জল বয়ে যাবে। নতুন প্রজন্ম আসবে। নতুন ইতিহাস লেখা হবে। তবু কোনো এক শান্ত সন্ধ্যায়, বিলের বাতাসে, পুরোনো রাজনৈতিক স্মৃতির ভাঁজে কিংবা কোনো মানুষের কথার ফাঁকে আবার উচ্চারিত হবে একটি নাম—”অধ্যাপক মো. আব্দুল কুদ্দুস’।
তখন মনে হবে, তিনি হয়তো আমাদের চোখের আড়ালে চলে গেছেন; কিন্তু তাঁর সময়, তাঁর সংগ্রাম এবং তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি এখনো এই জনপদের মাটির সঙ্গে মিশে আছে। তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক -মো. মাজেম আলী মলিন, সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট ডেইলী অবজারভার ও ভোরের কাগজ। সেল নম্বর ০১৭১৯৭৩৪৫২০/md.magem1974@ gmail.com
Weekly Chalonbeel Barta chalonbeelbarta.com