জাহিদ হাসান 
এক সময় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সোনালি আঁশ পাট আজ যেন চলনবিল অঞ্চলের কৃষকদের জন্য আশীর্বাদের বদলে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি মৌসুমে বাজারে পাটের কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃষি শ্রমিকের (কামলা) অস্বাভাবিক মজুরি বৃদ্ধি। বর্তমানে পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোর কাজে একজন শ্রমিককে দৈনিক ৯০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলেও পাট বিক্রি করে সেই খরচ তুলতে পারছেন না অধিকাংশ কৃষক।
চলনবিলের বিভিন্ন গ্রামের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাট চাষের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই ব্যয় বেড়েছে। জমি প্রস্তুত, বীজ ক্রয়, সার, কীটনাশক, সেচ, আগাছা পরিষ্কার, পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, শুকানো এবং বাজারে পরিবহন—সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। অথচ বাজারে পাট বিক্রি করতে গিয়ে তারা কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না।
কৃষকদের অভিযোগ, শ্রমিকের সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে অনেক ক্ষেত্রেই দৈনিক ৯০০ থেকে ১,০০০ টাকা মজুরি দিতে হচ্ছে। অনেক সময় এই মজুরির পাশাপাশি খাবারের ব্যবস্থাও করতে হয়। এতে এক বিঘা জমির পাট কাটার খরচই কয়েক হাজার টাকা বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাজারে পাটের দাম উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় লাভ তো দূরের কথা, মূলধন ফেরত পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, ঋণ নিয়ে কিংবা ধারদেনা করে পাট চাষ করলেও মৌসুম শেষে সেই ঋণ পরিশোধ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক কৃষক আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী মৌসুমে তারা পাট চাষ কমিয়ে দেবেন বা বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকবেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী অর্থকরী ফসল এবং পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক আঁশ হিসেবে বিশ্ববাজারে এর চাহিদাও রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে পাট চাষে আগ্রহ কমে যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতে দেশের পাট উৎপাদন এবং রপ্তানি উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চলনবিলের কৃষকদের দাবি, সরকার দ্রুত পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করুক, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করুক এবং কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে কৃষিঋণ, ভর্তুকি ও আধুনিক কৃষিযন্ত্রের সুবিধা বাড়ানো হোক। পাশাপাশি শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় যান্ত্রিকীকরণে আরও গুরুত্ব দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
কৃষকদের ভাষায়, “আমরা দেশ ও মানুষের জন্য ফসল ফলাই। কিন্তু বছরের পর বছর পরিশ্রম করেও যদি ন্যায্য দাম না পাই, তাহলে কৃষিকাজ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, আর কৃষি বাঁচলেই দেশের অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে চলনবিলের কৃষকদের একটাই প্রত্যাশা—তাদের উৎপাদিত পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হোক এবং কৃষকের ঘাম ও শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করা হোক। অন্যথায় দেশের এই ঐতিহ্যবাহী পাট চাষ ধীরে ধীরে সংকটের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ReplyForward