ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহের গুরুত্ব

Spread the love
মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ হাফিযা হুল্লাহ 
বিবাহ মানবজীবনের একটি স্বাভাবিক, পবিত্র ও মহিমান্বিত প্রতিষ্ঠান। এটি শুধু নারী-পুরুষের বৈধ মিলনের মাধ্যম নয়; বরং একটি আদর্শ পরিবার, সুস্থ সমাজ ও নৈতিক সভ্যতা গঠনের অন্যতম ভিত্তি। ইসলামে বিবাহকে ইবাদত, সুন্নত এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরিহার্য দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। যে সমাজে বিবাহের প্রতি গুরুত্ব কমে যায়, সেখানে ব্যভিচার, পারিবারিক ভাঙন, নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। তাই ইসলাম মানবজাতির কল্যাণে বিবাহকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মহান আল্লাহ তাআলা মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করার পর তাঁর জন্য সঙ্গিনী হিসেবে হযরত হাওয়া (আ.)-কে সৃষ্টি করেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ ঘোষণা করেন যে, মানুষ একাকী জীবনযাপনের জন্য নয়; বরং পারস্পরিক ভালোবাসা, সহযোগিতা ও দাম্পত্য বন্ধনের মধ্য দিয়ে জীবনকে পরিপূর্ণ করার জন্য সৃষ্টি হয়েছে।
মহান আল্লাহ বলেন,”আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।”(সূরা আর-রূম: ২১)এই আয়াত প্রমাণ করে, বিবাহের মূল উদ্দেশ্য কেবল জৈবিক চাহিদা পূরণ নয়; বরং মানসিক প্রশান্তি, পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও স্থায়ী পারিবারিক বন্ধন প্রতিষ্ঠা করা।রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিবাহকে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন,
“বিবাহ আমার সুন্নত। যে ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে বিমুখ হবে, সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।”(সুনানে ইবনু মাজাহ, হাদিস: ১৮৪৬) অন্য এক হাদিসে তিনি যুবকদের উদ্দেশে বলেছেন,
“হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে। কেননা এটি দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। আর যে সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে; কারণ তা তার প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করবে।”(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪০০)এ থেকেই স্পষ্ট হয় যে, বিবাহ চরিত্র রক্ষার সর্বোত্তম মাধ্যম। আজকের পৃথিবীতে অশ্লীলতা, অবৈধ সম্পর্ক ও নৈতিক বিপর্যয়ের যে স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে, তার কার্যকর প্রতিরোধের অন্যতম উপায় হলো সময়মতো শরিয়তসম্মত বিবাহ।
ইসলামী শরিয়তে বিবাহের কয়েকটি মৌলিক রুকন ও শর্ত রয়েছে। ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুল (গ্রহণ) স্পষ্টভাবে সম্পন্ন হতে হবে। বর ও কনের পারস্পরিক সম্মতি থাকতে হবে। শরিয়তসম্মত অভিভাবকের উপস্থিতি, ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী এবং বিবাহে কোনো শরয়ী প্রতিবন্ধকতা না থাকা আবশ্যক। এসব শর্ত পূরণ হলেই বিবাহ শরিয়তসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়।
বিবাহ কেবল দুই ব্যক্তির নয়; বরং দুটি পরিবার, দুটি বংশ এবং অনেক সময় দুটি সমাজের মধ্যেও সৌহার্দ্য ও সম্পর্কের সেতুবন্ধন তৈরি করে। একজন আদর্শ স্বামী ও একজন নেককার স্ত্রী পরস্পরের সহযোগী, বন্ধু ও কল্যাণকামী। তারা একে অপরকে আল্লাহর আনুগত্যের পথে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে অত্যন্ত সুন্দর উপমায় বর্ণনা করেছেন—”তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক।”(সূরা আল-বাকারা: ১৮৭) পোশাক যেমন মানুষকে আবৃত করে, সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং নিরাপত্তা দেয়, তেমনি স্বামী-স্ত্রী একে অপরের দোষ গোপন করেন, মর্যাদা রক্ষা করেন এবং সুখ-দুঃখে পাশে থাকেন।ইসলামে বিবাহের মাধ্যমে বংশধারা সংরক্ষিত হয়, সন্তানরা বৈধ পরিচয় লাভ করে এবং একটি আদর্শ প্রজন্ম গড়ে ওঠে। নেককার সন্তান পৃথিবীতে পিতা-মাতার জন্য শান্তির কারণ এবং মৃত্যুর পরও সদকায়ে জারিয়ার অন্যতম মাধ্যম।অনেকের ধারণা, বছরের নির্দিষ্ট মাস বা দিনে বিবাহ করলে অমঙ্গল হয়। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন কুসংস্কার। ইসলামে কোনো মাস, দিন বা সময়কে বিবাহের জন্য অশুভ বলা হয়নি। শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ যেকোনো দিনেই বিবাহ করা যায়। তবে জুমার দিনকে বরকতময় দিন হিসেবে অনেকে পছন্দ করেন, যদিও এটিকে বাধ্যতামূলক বা বিশেষ সুন্নত বলা যায় না।
ইসলামী শরিয়তে বিবাহের বিধান সবার জন্য এক নয়। যার ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং বিবাহের সামর্থ্যও আছে, তার জন্য বিবাহ করা ওয়াজিব হতে পারে। কারও জন্য এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ, আবার যে ব্যক্তি স্ত্রীর অধিকার আদায় করতে সক্ষম নয় বা নিশ্চিতভাবে জুলুম করবে, তার জন্য বিবাহ করা হারামও হতে পারে। তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত নিজের অবস্থা বিবেচনা করে শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।আজকের সমাজে বিবাহকে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় জাঁকজমক, অপচয়, অযৌক্তিক দেনমোহর, যৌতুক ও সামাজিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কঠিন করে তোলা হয়েছে। অথচ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সহজ ও বরকতময় বিবাহের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,”সবচেয়ে বরকতময় বিবাহ হলো যে বিবাহে খরচ কম হয়।”(মুসনাদ আহমাদ; অর্থগতভাবে সহিহ সূত্রে বর্ণিত)
অতএব, আমাদের উচিত বিবাহকে সহজ করা, যৌতুক ও অপসংস্কৃতি বর্জন করা এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে পারিবারিক জীবন গড়ে তোলা। একটি নেককার পরিবারই একটি আদর্শ সমাজের ভিত্তি, আর আদর্শ সমাজই একটি কল্যাণময় রাষ্ট্র গঠনের পূর্বশর্ত।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন, সহজ ও বরকতময় বিবাহের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করুন এবং আমাদের পরিবারগুলোকে ঈমান, তাকওয়া, ভালোবাসা ও রহমতে পরিপূর্ণ করে দিন। আমীন।
লেখক দাঈ ও গবেষক 
Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD