মাঠের সাংবাদিক, অরক্ষিত জীবন: কে দেবে নিরাপত্তা

Spread the love
সাংবাদিকতা পেশাটাকে আমরা সাধারণত সম্মানের চোখে দেখি। সমাজের আয়না বলা হয়, মানুষের কণ্ঠস্বর বলা হয়। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। বিশেষ করে মফস্বলে যারা কাজ করেন, তাদের কাছে সাংবাদিকতা অনেক সময় পেশা না, এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই বারবার সামনে আসে এক কঠিন সত্য। সাংবাদিক নির্যাতন এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি চলমান বাস্তবতা।প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক। একজন সাংবাদিক কেন নির্যাতনের শিকার হবেন?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই আসবে ‘সত্য’। একজন সাংবাদিকের কাজই হচ্ছে তথ্য খুঁজে বের করা এবং তা প্রকাশ করা। কিন্তু সেই তথ্য যদি কারও স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তখন সমস্যা শুরু হয়। দুর্নীতি, অনিয়ম, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, এসব বিষয়ে রিপোর্ট করতে গেলেই অনেক সময় সাংবাদিক হয়ে যান টার্গেট। যারা এসবের সঙ্গে জড়িত, তারা চায় না সত্য বাইরে আসুক। ফলে সহজ পথ হিসেবে তারা বেছে নেয় ভয় দেখানো, হামলা, কিংবা মামলার ফাঁদ।মফস্বলের বাস্তবতা আরও কঠিন। এখানে সম্পর্কের জালটা অনেক ঘন। রাজনীতি, ব্যবসা, প্রশাসন, সবকিছুই অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। একজন স্থানীয় সাংবাদিক যখন কোনো অনিয়ম তুলে ধরেন, তখন তিনি একা হয়ে যান। বড় শহরের মতো তাত্ক্ষণিক সাপোর্ট বা কাভারেজ পাওয়া যায় না। অনেক সময় নিজের এলাকাতেই তাকে লড়তে হয়, পরিচিত মানুষদের বিরুদ্ধেই দাঁড়াতে হয়।
আরেকটা বড় কারণ হচ্ছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা নতুন কিছু না। কিন্তু এসব ঘটনার কতগুলো শেষ পর্যন্ত বিচার পর্যন্ত যায়? খুব কম। অনেক সময় অভিযোগ দায়ের হয়, কিন্তু তদন্ত এগোয় না। আবার কোথাও প্রভাবশালীদের চাপে বিষয়টা চাপা পড়ে যায়। এতে একটা বার্তা পরিষ্কার হয়ে যায়: সাংবাদিককে মারলে খুব বেশি কিছু হয় না। এই মানসিকতাই অপরাধকে আরও উৎসাহ দেয়।
তবে এখানে শুধু একপক্ষের কথা বললে পুরো চিত্রটা পরিষ্কার হবে না। সাংবাদিকতার ভেতরেও কিছু দুর্বলতা আছে, যেগুলো অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
সব সাংবাদিক কি পেশাগত নীতিমালা মেনে চলেন? বাস্তবতা বলছে, সবসময় না। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, যাচাই ছাড়া তথ্য প্রকাশ করা হয়, একপাক্ষিক রিপোর্ট করা হয়, কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িয়ে পড়ে। আবার কেউ কেউ সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অন্য সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন। এসব আচরণ শুধু ব্যক্তিকে নয়, পুরো পেশাটাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।এখানেই সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় বিশ্বাসের জায়গায়। মানুষ যদি মনে করে সাংবাদিক নিরপেক্ষ না, তাহলে তার প্রতি সহানুভূতিও কমে যায়। এটি কোনোভাবেই নির্যাতনকে বৈধতা দেয় না, তবে বাস্তবতা বোঝার জন্য এই দিকটি গুরুত্বপূর্ণ।তাই সমাধানের পথটা একমুখী না। এখানে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি পেশাগত মান ধরে রাখা।প্রথমত, সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শুধু মামলা নিলেই হবে না, তার অগ্রগতি মানুষের সামনে আনতে হবে।
দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব নিতে হবে আরও স্পষ্টভাবে। মাঠে যারা কাজ করেন, বিপদের সময় তাদের পাশে দাঁড়ানো প্রতিষ্ঠানগুলোর নৈতিক দায়িত্ব।তৃতীয়ত, সাংবাদিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা দরকার। তথ্য যাচাই, নৈতিকতা, ঝুঁকি মোকাবিলা, এসব বিষয়ে দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।চতুর্থত, স্থানীয় প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।সবশেষে একটা বড় প্রশ্ন সামনে আসে। একজন সাংবাদিক যদি নিরাপদ না থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে নিরাপদ থাকবেন? কারণ সাংবাদিক শুধু নিজের জন্য কাজ করেন না, তিনি কাজ করেন সমাজের জন্য, মানুষের জানার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য।সাংবাদিক নির্যাতন মানে শুধু একজন পেশাজীবীর ওপর হামলা নয়। এর মানে হলো সত্যকে চেপে ধরার চেষ্টা, জবাবদিহিতা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা। এই প্রবণতা থামানো না গেলে ক্ষতিটা ধীরে ধীরে পুরো সমাজের ওপরই পড়বে।
সত্য বলা কখনো সহজ ছিল না। এখনো না। কিন্তু যারা এই কাজটা করে যাচ্ছেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু দায়িত্ব না, এটি আমাদের সবার স্বার্থের বিষয়। কারণ শেষ পর্যন্ত সত্যটাই সমাজকে এগিয়ে নেয়। আর সেই সত্য যদি ভয় পেতে শুরু করে, তাহলে অন্ধকারই শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
লেখক: মো. হাফিজুর রহমান ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট।, মোবাইল: ০১৬০৮৩৯০৭০৬; ইমেইল: hafiz321242@gmail.com;
Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD