মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ
মানুষের বাহ্যিক জীবন যতই সুন্দর হোক, যদি তার অন্তর অসুস্থ থাকে—তবে সেই সৌন্দর্যের কোনো মূল্য থাকে না। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় তার ক্বাল্ব (অন্তর) দ্বারা। এই অন্তরই কখনো আলোর উৎস, আবার কখনো অন্ধকারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
“হে মানবজাতি! তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে, এতে রয়েছে অন্তরের রোগের শিফা, মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।” (সূরা ইউনুস: ৫৭)
এই আয়াত আমাদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়—অন্তরের চিকিৎসা কেবল আল্লাহর দিকনির্দেশনার মধ্যেই নিহিত।
১. অজ্ঞতা দূর করে জ্ঞানের আলো অর্জন
অজ্ঞতা অন্তরের সবচেয়ে ভয়ংকর রোগগুলোর একটি। অজ্ঞ ব্যক্তি শুধু পথভ্রষ্ট হয় না, বরং সে বুঝতেও পারে না যে সে পথভ্রষ্ট।
আল্লাহ বলেন—
“যাদের জ্ঞান নেই, আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেন।” (সূরা আর-রূম: ৫৯)
সুতরাং, ক্বাল্বকে সুস্থ রাখতে হলে প্রয়োজন—
– সহীহ দ্বীনি জ্ঞান অর্জন
– কুরআন ও হাদিসের আলোকে জীবন গঠন
– বিভ্রান্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা
২. ঈমানকে দৃঢ় ও জীবন্ত রাখা
ঈমান হলো অন্তরের প্রাণশক্তি। ঈমান যত শক্তিশালী হবে, অন্তর ততই প্রশান্ত ও স্থিতিশীল হবে।
আল্লাহ বলেন—
“যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, আল্লাহ তার অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন।” (সূরা আত-তাগাবুন: ১১)
আরও বলেন—
“তিনি মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি নাযিল করেন, যাতে তাদের ঈমান আরও বৃদ্ধি পায়।” (সূরা আল-ফাত্হ: ৪)
ঈমান বৃদ্ধি পায়—
– নেক আমল দ্বারা
– আল্লাহর উপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) দ্বারা
– কুরআনের সাথে সম্পর্কের মাধ্যমে
৩. অধিক পরিমাণে জিকির করা
অন্তরের প্রশান্তির অন্যতম প্রধান উপায় হলো আল্লাহর স্মরণ।
আল্লাহ বলেন—
“জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তর প্রশান্ত হয়।” (সূরা আর-রাদ: ২৮)
নিয়মিত জিকির যেমন—
– সুবহানাল্লাহ
– আলহামদুলিল্লাহ
– আল্লাহু আকবার
এসব শুধু শব্দ নয়, বরং অন্তরের ওষুধ।
৪. কুফরি ও শিরক থেকে অন্তরকে পবিত্র রাখা
অন্তরের সবচেয়ে মারাত্মক রোগ হলো শিরক ও কুফরি। এটি মানুষের সমস্ত আমলকে নষ্ট করে দেয়।
আল্লাহ বলেন—
“যারা অন্তরকে কুফরীর জন্য উন্মুক্ত করে, তাদের উপর রয়েছে আল্লাহর ক্রোধ।” (সূরা আন-নাহল: ১০৬)
তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব—
– আকীদা বিশুদ্ধ রাখা
– একমাত্র আল্লাহর উপর নির্ভর করা
– সকল প্রকার শিরক থেকে দূরে থাকা
৫. মুনাফিকি (কপটতা) পরিত্যাগ করা
মুনাফিকি অন্তরের এক ভয়াবহ ব্যাধি, যা মানুষকে দ্বিচারী করে তোলে।
আল্লাহ বলেন—
“তারা মুখে বলে যা তাদের অন্তরে নেই।” (সূরা আলে ইমরান: ১৬৭)
মুনাফিকির লক্ষণ—
– কথা ও কাজে অমিল
– প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ
– আমানতের খিয়ানত
অন্তরকে সুস্থ রাখতে হলে সত্যবাদিতা ও আন্তরিকতা অপরিহার্য।
৬. তাওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে অন্তর পরিশুদ্ধ করা
মানুষ ভুল করবেই। কিন্তু ভুলের পর আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই হলো মুমিনের সৌন্দর্য।
নিয়মিত পড়ুন—
আস্তাগফিরুল্লাহ
এটি অন্তরের কালো দাগ মুছে দেয় এবং আত্মাকে প্রশান্ত করে।
৭. সৎ সঙ্গ গ্রহণ করা
মানুষ তার সঙ্গীর দ্বারা প্রভাবিত হয়।
সৎ মানুষের সঙ্গ অন্তরকে নরম করে, আর অসৎ সঙ্গ অন্তরকে কঠিন করে তোলে।
সৎ সঙ্গের উপকারিতা—
– আল্লাহর স্মরণ বাড়ে
– গুনাহ থেকে দূরে থাকা সহজ হয়
– ঈমান শক্তিশালী হয়
৮. কুরআনের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করা
কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়, এটি জীবনের দিশারী।
অন্তরকে জীবিত রাখতে—
– প্রতিদিন কুরআন পড়ুন
– অর্থ বুঝে পড়ুন
– জীবনে বাস্তবায়ন করুন
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com