মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ
মানুষের জীবন যেন সময়ের এক ক্ষণস্থায়ী সফর। এই সফরের মাঝে কিছু সময় আল্লাহ তাআলা বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন—যেখানে সামান্য আমলও হয়ে ওঠে অমূল্য, আর ছোট্ট ত্যাগও পরিণত হয় বিশাল সওয়াবে। হিজরি সালের দ্বাদশ মাস জিলহজ তেমনই এক মহিমান্বিত সময়, বিশেষত এর প্রথম দশ দিন—যা ইসলামের দৃষ্টিতে ইবাদতের এক অনন্য মৌসুম।পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “শপথ ফজরের, শপথ দশ রাত্রির।” (সূরা ফজর: ১–২)
তাফসিরবিদদের সর্বসম্মত অভিমত—এই ‘দশ রাত্রি’ বলতে জিলহজের প্রথম দশ দিনকে বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ নিজেই যখন কোনো সময়ের শপথ করেন, তখন তা নিঃসন্দেহে সেই সময়ের বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ বহন করে।রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহর কাছে এমন কোনো দিন নেই, যাতে আমল করা এই দশ দিনের চেয়ে অধিক প্রিয়।” (মুসনাদে আহমদ: ৫৪৪৬)অতএব, এই দিনগুলোতে ইবাদত করা মানে আল্লাহর নৈকট্য লাভের সবচেয়ে সহজ ও মহিমান্বিত পথ বেছে নেওয়া।
জিলহজের তাৎপর্য: ইবাদত ও ইতিহাসের সম্মিলন জিলহজ কেবল একটি মাস নয়; এটি ত্যাগ, আত্মসমর্পণ ও ঈমানের পরীক্ষার প্রতীক। এই মাসেই সংঘটিত হয়েছিল হজের মহান সমাবেশ, যেখানে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ এক কাতারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর একত্বের ঘোষণা দেয়। এই মাসেই নবী ইবরাহিম (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক ত্যাগের ঘটনা স্মরণ করা হয়, যেখানে তিনি আল্লাহর আদেশে নিজের প্রিয় পুত্রকে কোরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন।
এই ঘটনা আমাদের শেখায়—আল্লাহর ভালোবাসার কাছে দুনিয়ার সবকিছু তুচ্ছ।জিলহজের গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি আমল
এক. চুল ও নখ না কাটা: আত্মনিয়ন্ত্রণের সূচনা ,জিলহজের চাঁদ দেখা থেকে কোরবানি দেওয়া পর্যন্ত চুল ও নখ না কাটা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “তোমাদের কেউ কোরবানির ইচ্ছা করলে, সে যেন নিজের চুল ও নখ না কাটে।” (সহিহ মুসলিম: ১৯৭৭)
এই আমলের মাধ্যমে একজন মুসলমান নিজের ইচ্ছাকে সংযত করে, যা কোরবানির মূল চেতনারই একটি প্রতিফলন।
দুই. রোজা রাখা: আত্মশুদ্ধির অনন্য মাধ্যম
জিলহজের প্রথম নয় দিন রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
বিশেষ করে আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেন,
“আমি আশা করি, এটি বিগত এক বছর ও আগামী এক বছরের গুনাহ মাফ করবে।” (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
এই একটি দিনই হয়ে উঠতে পারে জীবনের পাপমোচনের এক বিশাল সুযোগ।
তিন. অধিক পরিমাণে জিকির: অন্তরের জাগরণ
এই দিনগুলোতে আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,
তোমরা এতে বেশি বেশি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার ও আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করো।” (মুসনাদে আহমদ: ৫৪৪৬)
জিকির মানুষের অন্তরকে প্রশান্ত করে, আত্মাকে পবিত্র করে এবং আল্লাহর নৈকট্য বৃদ্ধি করে।
চার. তাকবিরে তাশরিক: ঈমানের সম্মিলিত উচ্চারণ
জিলহজের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রতিটি ফরজ নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা হয়।
“আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।” (দারুকুতনি: ১৭৫৬)
এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের এক অপূর্ব প্রকাশ।
পাঁচ. হজ ও ওমরাহ পালন: জীবনের শ্রেষ্ঠ ইবাদত
সামর্থ্যবানদের জন্য হজ ফরজ।
রাসুল (সা.) বলেন,
“যে ব্যক্তি হজ করে এবং গুনাহ থেকে বিরত থাকে, সে নবজাতকের মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে।” (সহিহ বুখারি: ১৫২১)
হজ মানুষের আত্মাকে নতুনভাবে গড়ে তোলে, জীবনে আনে এক নতুন অধ্যায়।
ছয়. কোরবানি: ত্যাগের সর্বোচ্চ নিদর্শন
জিলহজের ১০ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত কোরবানি করা হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“তুমি তোমার রবের জন্য নামাজ পড়ো এবং কোরবানি করো।” (সূরা কাউসার: ২)
কোরবানি আমাদের শেখায়—আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রিয় বস্তু ত্যাগ করাই প্রকৃত ঈমানের পরিচয়।
আধুনিক জীবনে জিলহজের বার্তা
আজকের ব্যস্ত জীবনে মানুষ দুনিয়ার পেছনে ছুটতে ছুটতে নিজের আত্মাকে ভুলে যাচ্ছে। জিলহজ আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া আত্মাকে ফিরে পাওয়ার আহ্বান জানায়।এই দশ দিন আমাদের শেখায়—সংযম, ত্যাগ, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ।একটি প্রশ্ন, একটি জাগরণ
জিলহজের এই দিনগুলো আমাদের সামনে আবারও ফিরে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—
আমরা কি এই সুযোগকে গ্রহণ করব, নাকি অবহেলায় হারিয়ে ফেলব?
যদি আমরা সত্যিই নিজেদের জীবন বদলাতে চাই, তাহলে এই দশ দিনই হতে পারে আমাদের নতুন সূচনা। কারণ, কে জানে—এই জিলহজই হয়তো হতে পারে আমাদের জীবনের শেষ জিলহজ।আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জিলহজের এই বরকতময় দিনগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগানোর তাওফিক দান করুন, আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমাদের জীবনকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করুন। আমিন।
( লেখক তরুণ আলোচক, গবেষক ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ)
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com