লেখক : মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)
অনুবাদক : ইলিয়াস মশহুদ
রাসূল (ﷺ) এর পুণ্যাত্মা স্ত্রীগণরাসূল (ﷺ) এর মোট ১১ জন স্ত্রী ছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় দুজন ই*ন্তে/কাল করেন- খাদিজা রা. ও জায়নাব বিনতু খুজায়মা হিলালিয়া রা.। বাকি নয়জন তাঁর ই*ন্তে/কালের সময় জীবিত ছিলেন। তবে একসঙ্গে চারজনের অধিক বিয়ের বিষয়টি শুধু রাসূল (ﷺ) এর অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল, এ ব্যাপারে উম্মাহর ইজমা রয়েছে। তাঁর বৈশিষ্ট্যের এসব কারণ সামনে বর্ণনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।
১. খাদিজা বিনতু খুওয়াইলিদ (রা.)
তাঁর জীবদ্দশায় রাসূল (ﷺ) অন্য কোনো মহিলাকে বিয়ে করেননি।(৪৩) হিজরতের তিন বছর আগে ৬৫ বছর বয়সে-তখন রাসূল (ﷺ) এর বয়স ছিল ৪৯ বছর-তিনি ই*ন্তে/কাল করেন। একই বছর আবু তালিবও মারা যান। তাই এ-বছরকে ‘আমুল হুজন’ বা ‘শোকের বছর’ বলা হয়।
খাদিজা রা. এর ই*ন্তে/কালের পর রাসূল (ﷺ) আরও কয়েকজন সচ্চরিত্র মহিলাকে বিয়ে করেন। তাঁরা হচ্ছেন: ২. সাওদা বিনতু জামআ রা., ৩. আয়েশা বিনতু আবু বকর রা., ৪. হাফসা বিনতু উমর রা., ৫. জায়নাব বিনতু খুজায়মা রা., ৬. উম্মু সালামা রা., ৭. জায়নাব বিনতু জাহাশ রা., ৮. জুওয়াইরিয়া রা., ৯. উম্মু হাবিবা রা., ১০. সাফিয়া রা., ১১. মাইমুনা রাজিআল্লাহু আনহুম.।
২. সাওদা বিনতু জামআ (রা.)
খাদিজা রা. এর ই*ন্তে/কালের পর রাসূল (ﷺ) সাওদা বিনতু জামআ রা. কে বিয়ে করেন। এর আগে তিনি সাকরান ইবনু আমরের বিয়েবন্ধনে আবন্ধ ছিলেন। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং হাবশায় দ্বিতীয় হিজরত করেন। হাবশার মুহাজিরদের সঙ্গে মক্কায় ফেরার পর সাওদার স্বামী মারা যান। এরপর রাসূল (ﷺ) তাঁকে বিয়ে করেন। উমর রা.-এর খিলাফতকালের শেষ দিকে তিনি ই/ন্তে*কাল করেন।(৪৪) তাঁর থেকে পাঁচটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে সহিহ বুখারিতে একটি ও সুনানু আরবাআতে চারটি।
৩. আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)
নবুওয়াতের পঞ্চম বছরের শাওয়ালে আয়েশা রা. জন্ম নেন;(৪৫) আর দশম বছরে রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তখন তাঁর বয়স ছিল ছয় বছর। এর তিন বছর পর তাঁর নয় বছর বয়সে এবং রাসূল (ﷺ) এর মদিনায় হিজরতের সাত মাস পর প্রথম হিজরির শাওয়ালে তাঁর বাসর হয়।(৪৬) আয়েশা রা. হলেন রাসূল (ﷺ) এর একমাত্র কুমারী স্ত্রী। তাঁর ১৮ বছর বয়সে রাসূল (ﷺ) ই/ন্তে*কাল করেন। মাত্র নয় বছরের নবি সাহচর্য তাঁর ওপর কী প্রভাব বিস্তার করেছিল এবং তিনি কতটুকু অর্জন করেছিলেন, তা সাহাবিদের বিভিন্ন কথা থেকে সহজেই বোঝা যায়।
তিনি ছিলেন উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফকিহ নারী এবং নারীদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী। বড় বড় সাহাবি তাঁর ফাতওয়া গ্রহণ করতেন।(৪৭) তিনি ২ হাজার ২১০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন।(৪৮) তাঁর সম্পর্কে সাহাবিরা বলতেন, ‘কোনো মাসআলায় আমাদের সন্দেহ হলে আমরা আয়েশা রা. কে জিজ্ঞেস করলে সমাধান পেয়ে যেতাম।’ এ কারণে প্রসিদ্ধ অনেক সাহাবি তাঁর শিষ্য ছিলেন। ৫৮ হিজরির ১৭ রমজানে ৬৭ বছর বয়সে তিনি ই/ন্তে*কাল করেন।(৪৯)
৪. হাফসা বিনতু উমর (রা.)
নবুওয়াতের পাঁচ বছর আগে তিনি জন্ম নেন। তাঁর পিতা উমর ইবনুল খাত্তাব রা., মা জায়নাব বিনতু মাজউন রা.। প্রথমে খুনায়িস ইবনু হুজাফা সাহমি রা.-এর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। এরপর দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় হিজরিতে রাসূল (ﷺ) তাঁকে বিয়ে করেন। তাঁর থেকে ৬০টি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। ৪৫ হিজরিতে মদিনায় তিনি ই/ন্তে*কাল করেন।
৫. জায়নাব বিনতু খুজায়মা হিলালিয়া (রা.)
তিনি ‘উম্মুল মাসাকিন’ বা ‘নিঃস্বদের মা’ নামে পরিচিত ছিলেন। প্রথমে তাঁর বিয়ে হয় তুফায়িল ইবনু হারিসের সঙ্গে কিন্তু এক পর্যায়ে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর তুফায়িলের ভাই উবায়দা রা. তাঁকে বিয়ে করেন। বদরযুদ্ধে উবায়দা রা. শহিদ হলে রাসূল (ﷺ) তাঁকে বিয়ে করেন।(৫০) তাঁর সঙ্গে বিয়ের মাত্র দু-মাস পর তিনি ই/ন্তে*কাল করেন।(৫১)
৬. উম্মু হাবিবা বিনতু আবু সুফিয়ান (রা.)
তিনি আবু সুফিয়ান রা.-এর মেয়ে। তাঁর প্রথম বিয়ে হয় উবায়দুল্লাহ ইবনু জাহাশের সঙ্গে। উবায়দুল্লাহর ঔরসে তাঁর সন্তানও হয়। তাঁরা উভয়ে ইসলামগ্রহণ করে হাবশায় হিজরতও করেন। হাবশায় যাওয়ার পর উবায়ল্লাহ খ্রি/ষ্টান হয়ে যায়। তবে উম্মু হাবিবা নিজের ইমানে অটল থাকেন। তখন রাসূল (ﷺ) হাবশার বাদশাহ নাজাশিকে চিঠি লিখে জানান, তিনি যেন রাসূল (ﷺ) এর পক্ষ থেকে তাঁর কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। রাসূল (ﷺ) এর চিঠি পেয়ে বাদশাহ উম্মু হাবিবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেন এবং ৪০০ দিনার মোহর তাঁর পক্ষ থেকে আদায় করেন। বিয়েতে তাঁর অভিভাবক ছিলেন খালিদ ইবনু সায়িদ ইবনুল আস রা.। ৪৪ হিজরিতে তিনি ই/ন্তে*কাল করেন। তাঁর থেকে মোট ৬৫টি হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
৭. উম্মু সালামা (রা.)
তাঁর নাম হিন্দা। প্রথমে তাঁর বিয়ে হয় আবু সালামা ইবনু আবদুল আসাদের সঙ্গে। তাঁদের সন্তানাদিও হয়। স্বামীর সঙ্গে তিনি হাবশা ও মদিনায় হিজরত করেন। তৃতীয় অথবা চতুর্থ হিজরির জামাদিউস সানিতে রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ৩৭৮টি হাদিস তিনি বর্ণনা করেছেন। কারও মতে ৬৩ হিজরিতে ৮৪ বছর বয়সে তিনি ই/ন্তে*কাল করেন।(৫২) বলা হয়ে থাকে, উম্মাহাতুল মুমিনিনের মধ্যে ১১. মাইমুনা বিনতু হারিস হিলালিয়া (রা.)
তিনি প্রথমে মাসউদ ইবনু উমরের স্ত্রী ছিলেন। সে তাঁকে তালাক দেওয়ার পর আবু রিহামের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। আবু রিহামের মৃত্যুর পর সপ্তম হিজরিতে রাসূল (ﷺ) তাঁকে বিয়ে করেন। তিনি নবিজির শেষ স্ত্রী। ৫১ হিজরিতে তিনি ই/ন্তে*কাল করেন। তাঁর থেকে ৭৬টি হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
টীকা :
(৪৩) রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গে বিয়ের আগে তাঁর আরও দু-বার বিয়ে হয়েছিল। প্রথমে আতিক ইবনু আবিদের সঙ্গে। এই তরফে আবদুল্লাহ নামে এক ছেলে ও হিন্দ নামে এক মেয়ে জন্ম নেয়। হিন্দ মুসলমান হয়েছেন। আতিকের মৃত্যুর পরে তিনি আবু হালা ইবনু নাবাশ ইবনু জারারা তামিমিকে বিয়ে করেন। এ পক্ষে হিন্দ ও হালা নামে দুজন ছেলেসন্তান জন্ম নেন এবং উভয়েই মুসলমান হন। সিরাতু ইবনি হিশাম : ২/৬৪৪।
(৪৪) শারহুজ জুরকানি আলাল মাওয়াহিব : ৩/২২৩।
(৪৫) সিরাতে আয়েশা, সাইয়িদ সুলায়মান নদবি (অনুবাদ: মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম): ৪৪।
(৪৬) সহিহ বুখারি : ৫১৩৩।
(৪৭) জাদুল মাআদ: ১/১০৬।
(৪৮) আস-সিরাতুন নাবাবিয়াতুস সাহিহিয়া: ২/৬৪৯।
(৪৯) সিরাতে আয়েশা, সাইয়িদ সুলায়মান নদবি (অনুবাদ: মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম): ২২৭।
(৫০) সিরাতে মুগলতাই: ৪৯।
(৫১) নাশবুত তিব।
(৫২) শারহুজ জুরকানি আলাল মাওয়াহিব: ৩/২৪১।
(৫৩) সিরাতে মুগলতাই: ৫৫।
(৫৪) জায়নাব রা.-এর বিয়ে সম্পর্কে আমি যা কিছু লিখেছি, তা অত্যন্ত বিশুদ্ধ হাদিসের আলোকেই লিখেছি। এ বিষয়ের বিশুদ্ধ হাদিসগুলো সহিহ বুখারির ব্যাখ্যাকার আল্লামা ইবনু হাজার আসকালানি রাহ, তাঁর ফাতহুল বারিতে সূরা আহজাবের তাফসিরে সংকলন করেছেন। এগুলো ছাড়া যেসব ভ্রান্ত বর্ণনা প্রচার করা হয়েছে, সেগুলো মুনাফিক ও কাফিরদের মনগড়া কাহিনি। সেসব বর্ণাকে অনেক মুসলিম লেখক ও ইতিহাসবিদ কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই নিজেদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন; অথচ এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্য আর অপবাদ ছাড়া কিছু নয়।
(৫৫) সুনানু আবি দাউদ : ৩৯৩১।
লেখা :
বই – সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া ﷺ ; পৃষ্ঠা : ৩৩-৩৮
লেখক : মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)
অনুবাদক : ইলিয়াস মশহুদ
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com