মোঃ আবুল কালাম আজাদ ।।
[ এই লেখা ২০ শে আগষ্ট ২০২১ মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশের ৩৫ তম মৃত্যু বার্ষিকীতে উৎসর্গীত ]
( গত সংখ্যার পর)
পঞ্চম দফা ঃ
বৈদেশিক বানিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা : বৈদেিিশক বানিজ্য বিষয়ে নি¤œরূপ সাংধিানিক বিধানের সুপারিশ করা হয়: (ক) ফেডারেশনভুক্ত প্রত্যেকটি অঙ্গরাজ্যের বর্বিানিজ্যের পৃথক পৃথক হিসাব রক্ষা করতে হবে। (খ) বহির্বানিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অঙ্গরাজ্যগুলির এখতিয়ারে থাকবেবে এবং অঙ্গরাজ্যের প্রয়োজন অঙ্গরাজ্য কর্তৃক ব্যবহৃত হবে। (গ) কেন্দ্রের জন্য প্রযোজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা সমান হারে অথবা সর্বসম্মত নির্দিষ্ট হারে অঙ্গরাজ্যগুলো মিটাবে। (ঘ) অঙ্গরাজ্যের মধ্যে দেশজ দ্রব্য চলাচলে ক্ষেত্রে শুল্ক বা কর জাতীয় কোন বাধা থাকবেনা। (ঙ) সংবিধানে অঙ্গরাজ্যগুলোকে বিদেশে নিজ নিজ বানিজ্য প্রতিনিধি দল প্রেরণের এবং স্ব স্ব স্বার্থে বানিজ্য চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দিতে হবে।
ষষ্ঠ দফা ঃ
আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা: (ক) আঞ্চলিক সংহতি ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষারজন্য সংবিধানে অঙ্গরাজ্যগুলোকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধা-সামরিক বাহিনী বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে। (খ) কেন্দ্রী সরকারের সকল শাখায় বা চাকরী ক্ষেত্রে প্রতিটি ইউনিট থেকে জনসংখ্যার ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ করতে হবে। (গ) নৌবাহিনীর সদও দপ্তর করাচী থেকে চট্রগ্রামে স্থানান্তর করতে হবে।
এই ৬ দফা ছিল বাঙালী জাতির মুক্তির সনদ। চয় দফা দাবী প্রকাশ হওয়ার পর বাঙালীদের হৃদয়ে এক নতুন আশার আলো দেখা দেয়।
এ বছরের মধ্যভাগে এই দেশেপ্রেমিক প্রানপুরুষ মাওলানা তর্কবাগীশ তৎকালীন ক্ষমতাসীন চক্রের স্লো পয়জনিংয়ে ভীষনভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডক্তার নুরুল ইসলাম সার্বক্ষনিক দেখাশোনা করে সুস্থ করে তোলেন।শারীরিক অবস্থার প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের গতিশীল নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা ভেবে তিনি মনে করেন যে,তাঁর পক্ষে দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়।
১৯৬৬ সালের ডিম্বের মাসে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। মাওলানা তর্কবাগীশের অবস্থা বুঝতে পেরে শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের প্রবীন নেতৃবৃন্দ তবুও তাঁকেই দলের সভাপতির পদে থাকার অনুরোধ জানান। মাওলানা তর্কবাগীশ তখন বলেন, ‘বাঙ্গালী জাতির সার্বিক মুক্তির রক্ষ্যে আওয়ামী লীগকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। ফলে আমি আমার ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে আওয়ামী লীগের লক্ষ্যকে ব্যাহত করতে পারিনা। আমার চেয়ে দল বড়, তার চেয়ে বড় হলো, এ জাতির ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যতের কথা ভেবেই আমি অব্যাহতি চাই। আপনারা তরুন সংগ্রামী উদ্যমী আপোষহীন ত্যাগী নেতৃত্বকে বাঙ্গালী জাতির সার্থে সামনে নিয়ে আসেন।’ এভাবে মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ সুদুরপ্রসারী দিগন্তের গতিশীল ত্যাগী নেতৃত্বেরও ইংগীত দেন।
১৯৬৬ সালের ১ মার্চ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল অধিবেশনে আপোষহীন ত্যাগী সংগ্রামী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী- মাওলানা তর্কবাগীশের আশির্বাদপুস্ট আস্থাশীল বিপ্লবী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি এবং তাজউদ্দিনকে সাধারন সম্পাদক নির্বচন করা হয় সর্বসম্মতিক্রমে।এবছরের প্রথম তিন মাসে শেখ মুজিবকে ৮ বার গ্রেফতার করা হয়।
১৯৬৮ সালে যখন পিডিএম গঠিত হয় তখন মাওলানা তর্কবাগীশের কাছে বেশকিছু নেতা পরামর্শের জন্য সিরাজগঞ্জ তাঁর বাড়িতে যান। দীর্ঘ আলোচনার পর তিনি কেবলমাত্র রাজবন্দিদের মুক্তির শর্তে তখনকার রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতৃত্বদানের অনুরোধ মেনে নেন।
১৯৬৮ সালের ১০ নভেম্বর। আয়ুব খান পেশোয়ার যান। সেখানে হাশিম উমর নামের একজন ছাত্র তাঁকে গুলি করে। কিন্তু গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে আয়ুব খান প্রানে বেঁচে যান।হাশিম পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। জবানবন্দিতে হাশিম বলেন,জেনারেল আয়ুব দীর্ঘদিন ধরে দেশের জনগনকে নির্যাতন করে আসছে। আয়ুবকে খুন করতে না পেরে সে দুঃখীত।
১৯৬৯সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ডাকসু কার্যালয়ে ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে পুর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ (তোফায়েল),পুর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন( মতিয়া) পুর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ( মেনন) এবং এন এস এফ (বিদ্রোহী গ্রুপ) এই কয়টি ছাত্র সংগঠন মিলে ৬ দফাকে সম্পুর্ন অন্তর্ভূক্ত করে ১১ দফা প্রনয়ন করে। এই সংগঠনগুলির সমন্বয়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতা ছিলেন- পুর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুর রউফ ও সাধারণ সম্পাদক খালেদ মোহাম্মদ আলী ; ছাত্র ইউনিয়ন(মতিয়া গ্রুপ) সভাপতি সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক ও সাধারণ সম্পাদক সামসুদ্দোহা; ছাত্র ইউনিয়ন ( মেনন গ্রুপ) সভাপতি মস্তোফা জামাল হায়দার ও ষাধারন সম্পাদক মাহবুবউল্লাহ এবং এন এস এফ এর একাংশের সভাপতি ইব্রাহীম খলিল ও সাধারণ সম্পাদক ফকরুল ইসলাম মুন্সী ; ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদ এবং ডাকসুর জিএস নাজিম কামরান চৌধুরী। তোফায়েল আহমেদ সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক, সমন্বায়ক ও মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৯ সালের ৫ই জানুয়ারী সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ও ডাকসু ভিপি তোফায়ল আহমেদেও সভাপতিত্বে সর্বসম্মতিতে ৬দফাসহ ১১ দফা দাবি আদায়র লক্ষ্যে – ছাত্র সংগ্রম পরিষদ ঘোষনা করে ঐতিহাসিক ১১ দফা। পুর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ সে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আগরতলা ষড়যন্ত্র প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে দেশব্যপি ছাত্র আন্দোলন শুরু করে। ঐতিহাসক ৬ ও ১১ দফা কর্মসুচি বাস্তবায়ন ও আইয়ুববিরোধী ঐতিহাসক গন অভ্যুত্থান পরিচালনার লক্ষ্যে বিরোধী প্রায় সবক’টি দলের সমন্বয়ে গঠিত হয় ডেমোক্র্যাটিক এ্যাকশন কমিটি ( ডাক)। মাওলানা তর্কবাগীশ ডাক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন।
১৯৬৯ সালের ১৭ জানুয়ারী ‘ডাক’ সমগ্র পাকিস্তানব্যাপী দাবী দিবস পালনের কর্মসুচি ঘোষনা করলে সৈরাচারী আইয়ুব সরকার রাজপথে ১৪৪ ধারা জারী করে। পুর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক ঢাকার বায়তুল মোকাররম হতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের জন্য মিছিলের কর্মুচি নেওয়া হলে হাজার হাজার ছাত্র যুবক জনতামিছিলে অংশগ্রহন করেন। সেই মিছিলের অগ্রভাগে থাকার কথা ছিল মাওলানা ভাষানী, মাওলানা তর্কবাগীশ, নুরুল আমিন, আব্দুস সালাম খান, এয়ার মার্শাল আসগর খান, আতাউর রহমান খানসহ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। বিপুল সংখ্যক পুলিশ ইপিআর,সেনাবাহিনী মিছিলে ওপর লাঠিচার্জ করলে জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। নেতৃবৃন্দ প্রান রক্ষার্থে আত্মগোপন করেন। কেবলমাত্র রাজপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এগোতে থাকেন নির্ভীক মালানা তর্কবাগীশ আর আসগর খান। ঐদিন বিভিন্ন রাজপথে মিছিলকারীদের কয়েজন নিহত ও অনেকে আহত হয়।‘৬৯ এর গন আন্দোলনে প্রান দিয়েছিলেন, কিশোর মতিউর রহমান,ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল আসাদ-যার নামে আয়ুব গেটের নাম হয়েছিল ‘ আসাদ গেট’ । এখনও সেই আসাদ গেট নামে স্মৃতি বহন করছে।
২২ ফেব্রুয়ারী জনগনে অব্যাহত আন্দোলনের মুখে কেন্দ্রীয় সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ অন্যান্য আসামিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।। শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে তর্কবগিীশের বাসায় যান।
২৩ ফেব্রুয়ারী রেসকোর্স ময়দানে ( বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত ঐতিহাসিক সংবর্ধনায় তোফায়েল আহমেদ সভাপতিত্ব করেন। প্রায় ১০ লাখ ছাত্রজনতার এই সংবর্ধনা সমাবেশে কারামুক্ত বাঙালীর প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভুষিত করেন। বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সের ভাষনে ছাত্রসমাজের ১১ দফা দাবির প্রতি পুর্ন সমর্থন জানান।
১০ ই মার্চ বঙ্গবন্ধু রাওয়ালপিন্ডিতে আইয়ুব খানের গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করেন। বঙ্গবন্ধু গোলটেবিল বৈঠকে আওয়ামী লীগের ৬ দফা ও ছাত্র সমাজের ১১ দফা দাবি উত্থাপন করে বলেন,গন অসন্তোষ নিরসনে ৬ দফা ও ১১ দফার ভিত্তিতে আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন প্রদান ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। পাকিস্তানী শাসক ও রাজনীতিবিদরা বঙ্গবন্ধুর দাবি অগ্রাহ্য করলে ১৩ ই মার্চ তিনি গোলটেবিল বৈঠক ত্যাগ করেন এবং ১৪ ই মার্চ তিনি ঢাকয় ফিরে আসেন। ২৫ শে মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হন
১৯৬৯ সালের ২৪ মার্চ পুর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে আন্দোলন যখন তুঙ্গে , যখন দেশের বহু কিছু বিপর্যস্ত তখন পাকিস্তানের লৌহমানব জেনারেল আইয়ুব খান কুখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করেন এবং ২৫ মার্চ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব অর্পন করে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান। ঘোষিত হয় জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচন।
নবম পর্ব ঃ (জাতীয় নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী)
১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান জাতীয় ও প্রাদেশীক নির্বাচন দেন। এটাই হলো পাকিস্তানের শেষ নির্বাচন।‘ মাওলানা তর্কবাগীশ দুইটি আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে পুর্ব পাকিস্তানে ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি এবং প্রাদেশীক পরিষদে ৩১৩ টি আসনের মধ্যে ১৯৯ টি আসন পায় আওয়ামী লীগ এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ভুট্রোর পিপলস পার্টি ৮৮টি অন্যান্য সব দল মিলে ৫৭ টি আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।এই প্রথম পাকিস্তান শাসন করবে পুর্ব পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ। বঙ্গবন্ধু পরিস্কার কওে বলে দিলেন ,তিনি ৬ দফার কথা বলে জনগনের ভোট পেয়েছে এবং তিনি শাসনতন্ত্র রচনা করবেন ৬ দফার ভিত্তিতে। দেশ শাসিত হবে ৬ দফার ভিত্তিতে। পাকিস্তান সেনাবহিনী তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, কোনভাবেই বাঙালীদেও হাতে শাসনভার তুলে দেওয়া যাবেনা। ফলে নিজের অজান্তেই জেনারেল ইয়াহিয়া খান আর তার দলবল ‘বাংলাদেশ’ নামে নতুন একটি রাষ্ট্র জন্ম দেবার প্রক্রিয়া শুরু করে দিল।
জেনারেলদের ষড়যন্ত্রে সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী ছিল সেনা শাসক জেনারের আয়ুব খানের এক সময়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রী, পশ্চিম পাকিস্তানের পিপলস পার্টির সভাপতি জুলফিকার আলী ভুেট্রা। হঠাৎ করে জুলফিকা আলী ভুট্রো জেনারের ইয়াহিয়া খানকে লারকানায়‘ পাখি শিকার ’ করতে আমন্ত্রন জানান।‘পাখি শিকার’ করতে জেনারেল ইয়াহিযা খানের সাথে যোগ দিল পাকিস্তানের বাঘা বাঘা জেনারেল।বাঙালীদের হাতে কেমন করে ক্ষমতা না দেয়া যায় সেই ষড়যন্ত্রের নীল নক্সা সেখানেই তৈরী হযেছিল। ভেতরে ভেতরে ষড়যন্ত্র চলতে থাকলেও বাইওে বুঝতে দেওয়া হয়নি। তাই সে ১৩ ফেব্রুয়ারী ঘোষনা করলো ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হবে। সবাই তখন গভীর আগ্রহে সেই দিনটির জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে।
শুরু হলো ক্ষমতা হস্তান্তরের ষড়যন্ত্র। সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া ও ভুট্রোর মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে পরামর্শ হলো যদিও পাকিস্তান এসেম্বলীতে আওযামী লীগ ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরে শুরু হয় অশুভ ষড়যন্ত্র। তারা শেখ মুজিবকে অগ্রাহ্য করতে লাগলো। এর মাঝে ১৯৭১ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী বাঙালীদের ভালোবাসা এবং মমতার শহীদ দিবস উদযাপিত হলো এক অন্য ধরনের উন্মাদনায়।বাঙালীদেও সেই উন্মাদনা দেখে পাকিস্তানী সেনাশাসকদের যেটুকু দ্বিধাদ্বন্দ ছিল সেটিও দুর হয়ে যায়। জুলফিকা আলী ভুট্রো ছির সংখ্যালঘু দলে। তার কাষমতার অংশ পাবার কথানয়। কিন্তু সে ক্ষমতা পাওয়ার জন্যে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। জাতীয় পরিষদেও অধিবেশনের ঠিক ২ দিন আগে ১ মার্চ জেনারেল ইযহিয়া খান হঠাৎ করে ঘোষিত সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষনা করেন।। সাথে সাথে বিক্ষোভে ফেটে পড়লো পুর্ব পাকিস্তানের জনগন।বেরিয়ে এলো রাজপথে। ২ মার্চ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাঙরার পতাকা তোরা হলো। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের জনসভায় বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত হিসেবে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “ আমার সোনার বাঙলা, আমি তোমায় ভালোবাসি” গানটি নির্বাচন করা হলো। প্রতিবাদে সারাদেশে ৩ মার্চ হরতাল পালিত হয়।দেশজুড়ে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। আন্দোলন শ্লোগানে মুখরিত হয় সারাদেশ।
১৯৭১- এর ঐতিহাসিক ৭ ই মার্চ। একটানা পাঁচদিন হরতালের পর রেসকোর্স ময়দানে( বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধুর ভাষন শুনতে লক্ষ লক্ষ মানুষের গন জামায়ত জনসমুদ্রে পরিনত হয়। বঙ্গবন্ধু অলিখিত ঐতিহাসিক ভাষনে ঘোষনা করলেন ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম ভাষন খুব একটা দেয়া হয়নি।এই ভাষনটি সেদিনদেশের সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় অকাতওে প্রান দিয়ে দেশকে স্বাধীন করার শক্তি যুগিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখমুজিবের ঐতিহাসিক ভাষন শেষে মাওলানা তর্কবাগীশ মোনাজাত পরিচালনা করেন। ঐ মোনাজাতে তিনি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালীর কাংখিত স্বাধীনতা অর্জনের উদাত্ত আহবান জানান। এই সময় জেনারেল ইয়াহিয়াখান গন হত্যার প্রস্তুতি নিতে থাকে। বেলুচিস্তনের কসাই নামে পরিচিত জেনারেল টিক্কা খানকে পুর্ব পাকিস্তানের গভর্নও করে পাঠায়। কিন্তু পুর্ব পাকিষÍানের কোন বিচারপতি টিক্কা খানকে গভর্নর হিসেবে শপথ করাতে রাজি হলেননা। ইয়াহিয় খান নিজে ১৫ মার্চ ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনার ভান করতে থাকে। এর মাঝে প্রত্যেকদিন বিমানে কওে ঢাকায় সৈন্য আনা হতে থাকে।যুদ্ধ জাহাজে কওে অস্ত্র, গোলাবারুদ এনে চট্রগ্রাম বন্দওে নোঙর করে।কিন্তু জনগনের বাধার কারনে সেই অস্ত্র তারা নামাতে পারছিলনা। ২১ মার্চ এই ষড়যন্ত্রে ভুট্রো যোগ দেয়।সদলবলে ঢাকায় এসে সে আরোচনার ভান করতে থাকে।১৯শে মার্চ জয়দেবপওে বাঙালী সেনারা বিদ্রোহ করে। তাদেও থামানোর জন্য ঢাকা থেকে যে সেনাবাহিনী পাঠানো হয় তাদেও সাথে সাধারন জনগনের সংঘর্ষ হয়। এতে বহু সাধারন মানুষ শহীদ হয়। ২ মে মার্চ ছির পাকিস্তান দিবস কিন্তু সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্ট আর গভর্নমেন্ট হাউজ ছাড়া সারা বাংলাদেশে কোথাও পাকিস্তানের পতাকা খুঁজে পাওযা যায়নি। ধানমন্ডিতে সেদিন বঙ্গবন্ধুর বাসাতেও‘ আমার সোনার বাঙরা , আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানের সাথে সাথে স্বাধীন বাঙলাদেশের পতাকা তোলা হয়। ২৫ শে মার্চ পর্যন্ত আলোচনার ছলে পুর্ব পাকিস্তানের সামরিক অভিযানের নীল নক্সা তৈরী করে চলে যান।শুরু হয় অঘোষিত যুদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি প্রানপুরুষ ঃ
২৫ শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী মানব ইতিহাসের সবচাইতে পৈশাচিক হত্যাকান্ডে বাঙালী জাতির ওপর অত্যাধুনিক মারনাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঐ রাতের মধ্যভাগে ২৬ শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করেন। তার পরই পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী স্বাধীনতার ঘোষনা দেবার অপরাধে রাত ১টা ১০ মিনিটে ধানমন্ডির ৩২ নং বাসভবন থেকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার কওে ঢাকা সেনানীবাসে নিয়ে যায় এবং ২৬ মার্চ গভীর রাতে তাঁকে বন্দি অবস্থায় পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। ইয়াহিয়া খান ২৬ মার্চ ভাষনে আওযামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষনা করেন। ২৫ শে মার্চ সন্ধ্যাবেলা মাওলানা তর্কবাগীশ ধানমন্ডির ৩২ নং বাসভবনে বঙ্গবন্ধুর পাশে অবস্থান করে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগ নেতা-কর্মীদের পাকবাহিনীর আক্রমনের তাৎক্ষনিক জবাবদান ও প্রযোজনীয় পথ- নির্দেশ দেন। ২৫ মার্চ রাত ১২টা ৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করেন।
গন হত্যার জন্য জেনারেল ইয়াহিয়া খান ২৫ শে মার্চ তারিখটা বেছে নিযেছিল কারন সে বিশ^াস করতো এটা তার জন্যে একটা শুভদিন। দুই বছর আগে এই দিনে সে আয়ুব খানের কাছ থেকে ক্ষমতা পেয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়েছিল। তাই ২ শে মার্চ রাতে বাংলাদেশের ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম গন হত্যার আদেশ দিয়ে সে সন্ধ্যাবেলায় বিমানে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যায়।জেনারেল ইয়াহিয়া খান সেনাবহিনীকে বলেছিল ‘তিরিশ লক্ষ বাঙালীকে হত্যা কর, তখন দেখবে তারা আমাদের হাত চেটে খাবে’। গন হত্যার নিখুঁত পরিকল্পনা অনেক আগে থেকেই করা আছে সেই নীল নক্সার নাম ‘অপারেশন সার্চ লাইট’। সেখানে স্পষ্ট করে লেখা আছে কেমন করে আলাপ আলোচনার ভান করে কীভাবে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় আক্রমন করা কবে, সোজা কথায়, কীভাবে আকটা জাতীকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধীনতা রক্ষা ও পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ৭ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর বৈদ্যিনাথতলার আ¤্রকাননেবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অবর্তমানে তাঁকে রাষ্ট্রপতি করে মুজিবনগর বিপ্লবী সরকার গঠনের মধ্যদিয়ে মহান স্বাধীনতা অর্জনে বিশাল এক মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন।
মহান ভাষা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সৈনিক মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ ৭১ বছর বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়েননি।¯েœহভাজন শেখ মুজিবের নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জনের বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণাদান ও প্রতিরোধ সংগ্রামে সরাসরি অংশগ্রহনের লক্ষ্যে ২৭ শে মার্চ ২ পুত্রসহ ঢাকা থেকে পালিয়ে সিরাজগঞ্জ নিজ এলাকায় গমন করেন। এই মহান বয়ঃবৃদ্ধ সংগ্রামী নেতার ব্যাক্তিগত উপস্থিতি ও তত্বাবধানে-নেতৃত্বে সমগ্র পাবনা অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধারা প্রবল বিক্রমে সাহসিকতার সাথে বিভিন্ন রনাঙ্গনে পাকবাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে।
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করার অপরাধে পাকবাহিনী হন্যে হয়ে মাওলানা তর্কবাগীশের খোঁজে মরিয়া হয়ে উঠে। তাঁকে ধরতে না পেওে পাক বাহিনী ও তাদের দোষর রাজাকার-লুটেরা বাহিনী মাওলানা তর্কবাগীশের ঢাকার বনগ্রামের বাসভবনসহ সিরাজগঞ্জ গ্রামের বাড়িঘর লুটপাট করে ও আগুন দিয়ে জ¦ালিয়ে দেয়। মাওলানা তর্কবাগীশের পরিবারের বহু প্রাচীন ধন-সম্পদ ও মুল্যবান দলিল দস্তাজে , বইপত্র লুটপাট করে নিয়ে যায় ও আগুনে ভস্মিভুত করে দেয়।
১৯৭২ সালের ১লা জানুয়ারী রাত ৮ টায় মাওলানা তর্কবাগীশ সিরাজগঞ্জ রনাঙ্গন থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন।আজীবনের স্বপ্ন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলার রাজধানীর মাটিতে পা রেখে মাওলানা তর্কবাগীশ ন’মাসব্যাপী দুর্বিসহ জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে এক পরম মুক্তির নিঃশ^াস ছাড়েন।
দশম পর্ব ঃ (স্বাধীনতাত্তোর যুদ্ধবিদ্ধস্ত নতুন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের অগ্রনায়ক)
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের পর থেকে মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ সর্বপ্রথম অনুভব করলেন যে,দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশের সকল মসজিদ-মাদরাসাসহ অন্যান্য ধর্মপ্রতিষ্ঠানসমুহ হয় সম্পুর্ন বন্ধ, নাহয় কোন প্রকার খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে।এর কারন, এসব মসজিদ-মাদরাসা ও প্রতিষ্ঠানের মুন্সী-মোল্লা, মৌলভী ও মাওলানাদের সিংহভাগই নয় মাসব্যাপী পাকহানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসাবে গনহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ ও নারী ধর্ষনের মত যঘন্য কার্যকলাপে লিপ্ত থেকে ইসলামের সেবা করেছিল। মুক্তিযুদ্ধ শেষে এদের অধিকাংশ পালিয়ে গা ঢাকা দেয় এবং কিছু সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বন্দী হয়। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় মাওলানা তর্কবাগীশ এগিয়ে এসে সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রাখেন। বিষয়টি তিনি বঙ্গবন্ধুর গোচরীভুত করেন।
১৯৭২ সালে জানুয়ারী মাসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু মসজিদ-মাদরাসা বোর্ড পুনর্গঠনকল্পে মাওলানা তর্কবাগীশের ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত করে তাঁকেই এর প্রথম চেয়ারম্যান নিযুক্ত করেন। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতষ্ঠানের পরিচালনার ভারও তাঁকে দেওয়া হয়। রেডিও- টেলিভিশনসহ অন্যান্য গনমাধ্যমগুলোতে ইসলামসহ অন্যান্য ধর্ম প্রচারের ব্যবস্থাও প্রতিপালিত হয় মাওলানা তর্কবাগীশের পরামর্শক্রমে। বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের বিকাশ ও তাকে প্রগতিশীল গতিধারায় প্রবাহিত করার লক্ষ্যে ৭২-এর প্রথমভাগে ‘ইসলামী শিক্ষা সংস্কার সংস্থা’ গঠন করে তিনি এর সভাপতি হন।তাঁরই পরামর্শে মাদরাসা শিক্ষা জাতীয় শিক্ষা কর্যক্রমের মধ্যে স্বীকৃতি লাভ করে এবং মাদরাসাসহ সকল ধর্ম শিক্ষায় বাংলা ভাষর প্রচলন ঘটে।তর্কবাগীশের সুপারিশ অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু ’৭২ সালে “ইসলামী ফাউন্ডেশন” গঠন করে এবং এর পরিচালনার ভার মাওলানা তর্কবাগীশের ওপর ছেড়ে দেন।
১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারী স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহবান করা হয়। জাতির জনক প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের অনুরোধে ও সর্বসম্মতিক্রমে মাওলানা তর্কবাগীশ জাতীয় সংসদের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে সংসদ অধিবেশনে সভাপতির আসন অলংকৃত করেন। এ অধিবেশনে সর্বপ্রথম শাসনতান্ত্রি পদ্ধতিতে সংসদের প্রথম স্পীকার. ডেপুটি স্পীকার ও সংসদ নেতা নির্বাচিত হন। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে সংসদের সকল কার্যক্রম বাংলা ভাষায় নির্বাহ করার নির্দেশ দান করেন এবং সংসদ পরিচালন ধার-পদ্ধতি তারই নির্দেশ- উপদেশে রচিত হয়। আজো সেই ধারা-পদ্ধতি সংসদ পরিচালনার ক্ষেত্রে চলমান রয়েছে।
১৯৭২ সালের ৪ অক্টোবর মাওলানা তর্কবাগীশ সোভিয়েত ইউনিয়নে আমন্ত্রিত হয়ে রাশিয়ার ধর্ম পরিষদ কর্তৃক ‘ইসলাম’ শীর্ষক সেমিনাওে বিশেষ অতিথি হিসেবে তিন ঘন্টাব্যাপী যে সারগর্ভ বক্তৃতাদান করেন তাতে মুসলিম বিশে^র নেতারা তঁর মনীষার ভুয়সী প্রসংসা করেন। তিনি মস্কো ও লুবম্বা বিশ^বিদ্যালয়েও জ্ঞনগর্ভ মুল্যবান ভাষনদান করেন। মস্কো ইসলামী সম্মেলনে আমন্ত্রিত মধ্যপ্রচ্যে ও ধর্মীয় নেতাদের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ও বাঙ্গালী মুসলমানদের ধর্ম বিশ^াসের ওপর এক নাতিদীর্ঘ ভাষনদান করে বাংলাদেশ ও বাঙ্গালী জাতির প্রতি ঐসব অঞ্চলে যে ভ্রান্ত ধারনা প্রচলিত ছিল তা নিরসনের ক্ষেত্রে বিপুলভাবে সফল হন। বিশেষ করে পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের সরকারগুলো যেভাবে বাংলাদেশ ও বাঙ্গালী জাতির ওপর মিথ্যচারের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়ে ইসলামী দুনীয়ায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল তা নিরসনকল্পে বঙ্গবন্ধু প্রথম থেকেই মাওলানা তর্কবাগীশকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহনের দায়িত্ব অর্পন করেছিলেন। সেই লক্ষ্যে তাই তিনি মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে সৌদি আরব সফর করে মুসলিম বিশে^ বাংলাদেশের ভাবমুর্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রাখেন। ’৭৩ সাল থেকেই তিনি রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহন করেন।
একাদশ পর্ব ঃ ( বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যাপরবর্তী প্রথম কবর জিয়ারত)
১৯৭৫ সারের ১৫ ই আগষ্ট স্বাধীনতা বিরোধী দেশী-বিদেশীচক্রের হাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবার-পরিজনসহ নির্মমভাবে নিহত হন। বয়ঃবৃদ্ধ মাওলানা তর্কবাগীশ আজীবন ¯েœহভাজন শেখ মুজিবের মৃত্যু-শোকে একেবারে নুয়ে পড়েন। এ সময়ে তিনি ছিলেন গুরুতর অসুস্থ। এ অবস্থায়ও হত্যাকারীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের সাথে যোগাযোগ করে ব্যর্থ হয়ে একেবারে মুষড়ে পড়েন। অবশেষে তিনি বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারত করার পরিকল্পনা করেন। অনেক বাধা-বিঘœ অতিক্রম করে তিনিই একমাত্র সর্বপ্রথম ব্যক্তি,যিন হত্যা কান্ডের অব্যবহিত পরে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারত করেন। বিভিন্ন সময় আনীত মহানবীর কবর ও অন্যান্য পবিত্র স্থানের মাটি, আবে জমজমের পানি, কাবাশরীফের বৃষ্টিধৌত পানি ইত্যাদি তিনি পরম যতেœর সাথে বঙ্গবন্ধুর কবরে ছিটিয়ে দেন।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে,বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার অব্যবহিত পরে তিনি স্বপ্নযোগে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাত পান এবং তিনি ( বঙ্গবন্ধু)তাঁকে ( তর্কবাগীশকে) দোয়া করতে বলেন।
গন আজাদী লীগ দল এবং জিয়া বিরোধী ঐক জোট গঠন ঃ
মাওলানা আব্দুর রশীদ তকবাগীশ ¯েœহভাজন মুজিবের মৃত্যু তাঁকে আবারও রাজনীতিতে যেন টেনে আনে।জেনারেল জিয়ার সামরিক শাসনেরবিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়ে ওঠেন। জেনারের জিয়া রাজনীতির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে তিনি ‘গন আজাদী লীগ’ গঠন করে পুনরায় সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় ১৯৭৮ সালে জিয়াবিরোধী ১০ দলীয় গন ঐক্যজোট গঠিত হয়। গন ঐক্যজোট জেনারেল জিয়ার বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মনোনয়ন দেয়।
এরশাদের বিরুদ্ধে ১৫ দলীয় জোট গঠন ঃ
১৯৮২ সালের ২ মে মার্চ জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর সামরিক আইন প্রত্যাহার ও গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে ১৯৮৩ সারের জানুয়ারী মাসে সর্বপ্রথম মাওলানা তর্কবাগীশের সভাপতিত্বে স্বাধীনতার পক্ষের একটি ১৫ দলীয় জোট গঠিত হয়। তাঁর হাতে গড়া ১৫ দলীয় জোট পরবর্তীতে জেনারেল এরশাদ উৎখাতের আন্দোলনে কার্যকর নেতৃত্ব প্রদান করে।
বিশ^মানবতার অগ্নিপুরুষ মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ ১৯৩৮ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত যতগুলি নির্বাচনে অংশগ্রহন করেছেন তাঁর বিপরীতে সকল প্রার্থীরই জামানত বাজেযাপ্ত করে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়লাভ করেছেন।
১৯৮০ সাল থেকে মাওলানা তর্কবাগীশ তাঁর সুদীর্ঘ বৈচিত্রময় বর্নাঢ্য জীবনের ওপর আত্মজীবনীমুলক একখানি পান্ডুলিপি লেখায় হাতদেন। তিনি পান্ডুলিপিখানি ইসলামী ফাউন্ডেশনের নামে উৎসর্গ করে গেছেন।
যবনিকা
১৯৮৬ সালের ১৫ ই আগষ্ট মাওলানা তর্কবাগীশ বার্ধক্যজনিত কারনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।তাঁকে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৯ তারিখে তাঁর স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটে। ২০ আগষ্ট ভোর ৪ টায় এই মহান নেতার জীবনের যবনিকাপাত ঘটে। তাঁর মহা প্রয়ানে ভারত উপমহাদেশের প্রায় শতাব্দীকালীন ইতিহাসের অন্যতম পুরধা-রূপকারের বর্নাঢ্য বিচিত্র সংগ্রামমুখর বৈপ্লবিক জীবনের অবসান ঘটে। ঢাকার বনানীতে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
তথ্যসুত্র ঃ
#তর্কবাগীশ ‘৯৩ পদক সংকলনী , মাওলানা তর্কবাগীশ সংসদ কর্তৃক প্রকাশিত।
# ঐতিহাসিক সলঙ্গা দিবস স্মরনিকা ২০০৭, মাওলানা তর্কবাগীশ পাঠাগার কর্তৃক প্রকাশিত।
# সময়ের দাবী , ভাষা আন্দোলনের সুবর্ন জয়ন্তী স্মারক ঃ- ভাষা আন্দোলনের সুবর্ন জয়ন্তী স্মারক উদ্যাপন কমিটি কর্তৃক প্রকাশিত ২০০২।
#মহী রুহ, মহান জাতীয় নেতা মনীষী মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ এর ১৬ তম মৃত্যুবার্ষিকী স্মারক ঃ- বাংলাদেশ গন আজাদী লীগ কর্তৃক প্রকাশিত,আগষ্ট ২০০২।
#জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবার পরিজন ঃ- ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত।
# মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, লেখক – মুহম্মদ জাফর ইকবাল।
# অসমাপ্ত আত্মজীবনী-শেখ মুজিবুর রহমান।
## লেখক মোঃ আবুদ কালাম আজাদ, সভাপতি, চলনবিল প্রেসক্লাব, গুরুদাসপুর, নাটোর, ০১৭২৪ ০৮৪৯৭৩ , তারিখ- ২০/ ০৮/ ২০২১ ##
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com