বর্তমানে শুধু তাড়াশ উপজেলায় নয়, সমগ্র চলনবিলের সবক’টি উপজেলায় সর্বকালের সর্বাধিক সংখ্যক পুকুর খনন চলছে তিন ফসলী জমি কেটে। হিড়িক পড়া, মহোৎসব বা ধুম পড়ে গেছে বললে কম বলা হয়। বস্তুত এটা প্রথমে হুজুগের আমেজে চললেও এখন তা ভয়াবহ রোগে পরিণত হয়েছে। সমাজের অন্যান্য অবক্ষয়ের মত এটাও তাই দ্রুতই ক্যানসারের ন্যায় ছড়িয়ে পড়ছে সকল জনপদে। একে এক ধরণের নেশা বললেও ভুল হবে না। এ নেশা অর্থ-স্বার্থ কামাইয়ের নেশা। এই নেশার মাদকতা ইয়াবার চেয়ে কম কিসে। এর সুদুর পরিণাম অতীব দৃর্যোগপূর্ণ,ধ্বংসাত্মক। এর চূড়ান্ত ফলাফল হবে আজাব, গজব ও মছিবত। যার প্রতিক্রিয়া ঘটবে চাষাবাদ ও মানুষের জীবন জীবিকার ওপর। এটাকে রম্য কথায় বললে , যে ডালে সে বসে আছে সে ডালই সে কেটে ফেলছে। এর পতন ঘটলে মরণ অনিবার্য। কিন্তু ডাল কাটার ক্ষণিকের মোহে অন্ধ হয়ে সে দিকটায় তাদের নজর নেই।
পত্রিকার খবরে জানা যাচ্ছে , তাড়াশ উপজেলায় এ যাবৎ পাঁচ শতাধিক পুকুর খনন হয়েছে যদিও এর অধিক হওয়া অসম্ভব বা অবাস্তব নয়। চলতি শুকনো মওসুমে এ তৎপড়তা যেরকম জোরদারভাবে চলছে তাতে হাজার পুরতে বেশী দিন লাগবে না। যখন এই পর্বটা লিখছি তখনো বহু স্থানে ফসলী জমিতে দেদারছে পুকুর কাটা চলছে। আর তা চলছে একেবারে প্রশাসনের নাকের ডগায়। তাড়াশ সদরের আশেপাশেই। সদরের অদূরে তাড়াশ-ভইুঁয়াগাতী আঞ্চলিক সড়কের ধারে ধানকুন্টি ব্রিজ এলাকায় মাধাইনগর ইউনিয়নের ওয়াশিন গ্রামের জনৈক প্রভাবশালী ব্যক্তি বিশাল পুকুর খনন করছেন। ফলে ২০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি জলাবদ্ধতার কবলে পড়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। এ পুকুর খনন হচ্ছে সরকারি খাল দখল করে। অপরদিকে উত্তর তাড়াশের আশানবাড়ী গ্রামের কাছেই দক্ষিণের মাঠে অনুরুপ বিরাট পুকুর কাটা হচ্ছে যা অন্তত ১৫/২০ গ্রামের মাঠের জল নিস্কাশনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা করছে সবাই। কিন্তু সব জায়গাতেই প্রভাবশালীদের ভয়ে কেউ কিছু বলার কিংবা বাধা দেয়ার সাহস পায় না। আর এমনিভাবে অবাধে নির্বিচারে নৈরাজ্য করা দেখে একে অপরে মেতে উঠেছে এই সর্বনাশা খেলায়।
এখন প্রশ্ন হল, এই ভয়ানক দুর্মতি দুর্দমনীয় প্রবণতা থামাবে কে ? তাড়াশ উপজেলা প্রশাসন সবগুলো ইউনিয়নে মাইকিং করেছে। এর প্রতিফলন হল চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি। কারণ সতর্কতা প্রচারনার পাশাপাশি পুকুর খনন আরো দিগুন বেগে অব্যাহত আছে এ মওসুমে। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ ভ্রাম্যমান আদালত করছেন মাঝে মাঝে। তাতে দেখা যায় সামান্য জরিমানা সাথে সরু নালার মতো পানি গড়ানোর ব্যবস্থা রেখে বিষয়টি ওখানেই ইতি। এতে পরিস্থিতির কোন উন্নতি না হয়ে আরো অবনতির দিকে যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, সচেতনতা সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। কিন্তু চোর পালালে যেমন বুদ্ধি বাড়ে তেমনি শত-সহস্র পুকুর খননের পর হেদায়েতী বাণী কখন কতটুকু কাজে আসবে তা বিবেচ্য। আর সেটা সঞ্চারিত হয়ে কার্যকরি ভূমিকা নিতে যত দিন গড়াবে, ইতোমধ্যে পরিবেশ ও পরিস্থিতির বারোটা বেজেই গেছে ও আরো যাবে। এব্যাপারে দু একটি দৃষ্টান্ত দেখা যেতে পারে। গুরুদাসপুরের মাননীয় সাংসদ নিজে মাঠে গিয়ে পুলিশের সাহায্যে ভেকু মেশিন জব্দ করে থানায় নিয়ে গেছেন। উপজেলার আইন শৃঙ্খলা মিটিংএ কঠোর সিদ্বান্ত নিয়েছেন। আর পাবনার আটঘরিয়ায় প্রশাসন একবারে স্পটে খনন যন্ত্র ধরে পুড়িয়ে দিয়েছেন। তবে অনেক এলাকায় প্রশাসন, পুলিশ ছাড়াও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর এবং স্থানীয় পরিষদের সাথে খননকারিদের পারস্পারিক যোগসাজশে বেপরোয়া পুকুর খননের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি তেমন হলে শর্ষের মধ্যে ভূতের অস্তিত্বের গন্ধ মেলে। আমাদের দেশে এই খেলা নানান কিছুতেই চলে। তাই যদি সত্য হয় তাহলে এ ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে শেষতক। সবশেষে বলব, আইনের যথাযথ প্রয়োগ, নিরপেক্ষ শাস্তিমূলক পদক্ষেপ,সকলের সম্মিলিত অভিযান, প্রতিবাদে-প্রতিরোধে জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিতকরণ, পুকুরের পাড় গুরিয়ে দেয়া ও পূনরায় ভরাটে বাধ্য করা এবং পুকুর খননের সব উপকরণ তথা যন্ত্রের এই অবৈধ কাজে ব্যবহারে সরকারি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া ইত্যাকার প্রয়াসের কথা চিন্তা করা যেতে পারে। কেননা, আর দেরি না করে এই অমঙ্গলের উগ্র ক্ষুধা থামাতে হবে এখনই। মনে রাখতে হবে, এটা সাময়িক কোন প্রতিহত বা প্রতিরোধের বিষয় নয়। দূরদর্শী পরিকল্পনা নিয়ে এর টেকসই প্রতিকার করা আশু জরুরী আবশ্যক। অন্যথায় আমাদের সমাজে এই অপকর্ম অবলীলাক্রমে চলতেই থাকবে।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com