ফারুক আহমেদঃ
মানুষ নিজেকে সন্দুর রাখতে কতো কিছুই না করে থাকে। সেই প্রাচীন কাল থেকে মানুষ নিজেকে অপরের সামনে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে আসছে। আর মানুষকে সুন্দর করে তোলা যাদের কাজ তাদেরকে বলা হয়, নরআআররসুন্দর।আমরা আঞ্চলিক ভাষায় বলে আরথাকি নাপিত বা শীল। কাটতে গেলেও ভিড় জমিয়ে অপেক্ষা করতে হতো হাটুরে সেলুনে। নরসুন্দর বা শীলরা তাদের পায়ের হাটু দিয়ে চাপ দিয়ে ধরে মানুষের চুল-দাড়ি কাটতো। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে নরসিংদীর সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন হাট-বাজারে পিড়িতে বসা ওই সকল হাটুরে সেলুন”।
আধুনিক সভ্যতার ক্রমবিবর্তনে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গতিধারায় এসেছে পরিবর্তন। লেগেছে নতুনত্বের ছোঁয়া। তাই আজ হাট-বাজারে বটবৃক্ষের ছায়ায়,খেয়াঘাট ও ফুটপাতে কিংবা গ্রামগঞ্জের জল চৌকিতে বা ইটের ওপরে সাজানো পিড়িতে বসে নাপিতের কাছে গ্রামবাংলার মানুষের চুল দাঁড়ি কাটার সেই দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না বললেই চলে। জাকজমকপূর্ণ সেলুনে সংস্কৃতির ঢেউ এখন শহর থেকে গ্রামের সবখানে। যার ফলে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন গ্রামঞ্চরের নরসুন্দররা। তারপরও কিছু সাধারণ মধ্যবৃত্ত ও অসহায় গরীব মানুষ গুলি আজও অবলীলায় বিভিন্ন হাটে কিংবা জল চৌকিতে বসে হাটুর কাছে এখনো মাথা পেতে দেন বলেই কয়েকজন হাটুরে নরসুন্দর বেঁচে আছেন এই প্রাচীন পেশা ধরে। তাড়াশ উপজেলার গুল্টা হাটেসহ এখনো সিরাজগঞ্জ বিভিন্ন হাট ও বাজারে বাপ দাদার পেশা আজও আকড়ে ধরে আছেন বেশকিছু নরসুন্দর। বহু বছর ধরে এ কাজ ধরে রেখেছেন। আগে এ পিড়িতে বসে কাজ করিয়ে ভালো মতো তাদের সংসার চললেও বর্তমানে মানবতার জীবজাপনসহ সংসার চালাতে নিদারুণ হিমশিম খেতে হচ্ছে এ নরসুন্দরদের।আধুনিকত্বের ছোঁয়া বাদ দিয়ে বাপ দাদার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন তাড়াশ উপজেলার গুল্টা হাটের রণজিৎ শীল। হঠাৎ করে রণজিৎ শীলের এই হাটুরে সেলুন দেখে দীর্ঘক্ষণ আলাপ হয় প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকার এই প্রতিবেদকের সাথে।
এসময় নরসুন্দর রবিনাথ শীল ও পরিতোষ শীল দৈনিক সংগ্রামের প্রতিনিধিকে জানান, ৬৫ বছর যাবত বাপ-দাদার ঐতিহ্য পেশা ধরে রেখে পিড়িতে বসিয়ে মানুষের চুল-দাঁড়ি কামাচ্ছি। বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষ জন সেলুন মুখী হয়ে গেছে। মাটিতে বসে চুল-দাঁড়ি কাটতে চায়না, এখন খুব কমই মিলে। আয় রোজগার তেমন নেই। বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রেখেছি মাত্র।তাড়াশ উপজেলার গুল্টা হাটের প্রধান ফটকের সামনে শনিবার ও মঙ্গবার সাপ্তাহে দুই দিন বিকালে মার্কেটের ঠিক পূর্ব দিকে যেতেই চোখে পড়লো আরো কয়েকজন নরসুন্দর শ্রী রগনাথ ও শুবাস চন্দ্র সর্বমার চুল কাটার দৃশ্য। তাদের বাড়ি একই এলাকায়। ৮৫ বছরের বৃদ্ধ, প্রায় ৪৮ বছর ধরে পিড়িতে বসিয়ে মানুষের চুল দাঁড়ি কামানোর কাজ করছেন।রবিনাথ শীল ও পরিতোষ শীল তারা জানান, মাটিতে এভাবে বসে চুল দাঁড়ি কাটাতে চায়না, কারণ সেলুনে চেয়ারে বসে কাটতে পারে। তারপরও বাপ-দাদার পেশা ছাড়তে পারি না। তবে সাপ্তাহে দুইদিন এই হাট করি বিকাল শেষে প্রতিদিন প্রায় ২/৩ শত টাকা কামাতে পারি। বয়সের ভারে এখন আর তেমন কাজ করতে ইচ্ছে হয় না। আজ থেকে ৪৫ বছর আগে কারোর বাড়িতে সন্তান জন্মালে সেই বাড়িগুলিতে সম্মানের সাথে কাজ করতাম। আজ আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই কাজগুলি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে।
শুধু ঐতিহ্যটাকে ধরে রেখেছি। চুল দাঁড়ি কাটতে আসা রানিদিঘি গ্রামের রিপন সরকার জানান, কাজের ফাঁকেফাঁকে আমি ছোট থেকেই পরিতোষ দাদার এখানে চুল দাঁড়ি কামাতে আসি। চুল দাঁড়ি কামাতে আমার বাবাও সকাল বেলা নিয়ে যেতো শীল পাড়ায় অথবা এই গুল্টা হাটে পিড়িতে বসে কাটানোর অভ্যাসটি হয়তো আর ছাড়তে পারবো না। আবার টাকাও কম লাগে। চড়িয়া গ্রাম থেকে দাঁড়ি কাটাতে আসা আলহাজ্ব ছাবেদ ও উপরসেল্ট থেকে আসা শ্রী সুশিল কুমার নামে অপর এক শ্রমিক জানান, ২০ বছর যাবত দাদার এখানে চুল দাঁড়ি কাটাই। মাত্র ৩০ টাকা দিতে হয়।আধুনিক সেলুনে কাটালে ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। আয় রোজগার কম তাই এখানে চুল দাঁড়ি কাটাতে চলে আসি। সৌন্দর্য বর্ধন করার কৌশলগত কারণে শীলদের প্রয়োজনীয়তা ও কদর ফুড়াবেনা। কিন্তু হাট বাজারে সাজানো পিড়িতে বসে চুল দাঁড়ি কাটার সেই দৃশ্য কালের বিবর্তনে হয়তো এক সময় হারিয়ে যাবে একেবারেই। তবে স্মৃতির পাতা থেকে নরসুন্দররা কখনো হারিয়ে যাবে না।
সলঙ্গা /সিরাজগঞ্জ থেকে
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com