পীরজাদা মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ
মানুষের জীবন কোনো খেলাঘর নয়, এটি একটি পরীক্ষা ক্ষেত্র। এখানে প্রতিটি কাজ, প্রতিটি চিন্তা এবং প্রতিটি অনুভূতিরও হিসাব দিতে হবে মহান রবের দরবারে। একজন মুসলিমের আনন্দ, উৎসব, সংস্কৃতি—সবকিছুই হতে হবে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী, ঈমান ও আকিদার সুরক্ষার মধ্যে।
পহেলা বৈশাখ আজ বাঙালির একটি বহুল প্রচলিত উৎসব। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই এর উদযাপন বিস্তৃত। কিন্তু একজন সচেতন মুসলিমের জন্য প্রশ্ন হলো, এই উদযাপনের প্রতিটি উপাদান কি ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য? নাকি এর ভেতরে এমন কিছু রয়েছে, যা অজান্তেই আমাদের ঈমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে?
এক. আকিদাবিরোধী প্রতীক ও প্রথার বিস্তার
মঙ্গল শোভাযাত্রায় দেখা যায় বিভিন্ন জীবজন্তুর মুখোশ, প্রতিকৃতি, পৌরাণিক চিত্র, রঙিন মুখ আঁকা এবং বিশেষ ধর্মীয় প্রতীকের ব্যবহার। ইসলামে জীবজন্তুর মূর্তি বা প্রতিকৃতি নিয়ে উৎসব পালন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তদুপরি কপালে টিপ, সিঁদুর, শাঁখা ইত্যাদি এমন চিহ্ন, যা নির্দিষ্ট ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রতীক।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যারা ইসলামে থেকেও জাহিলিয়্যাতের রীতি অনুসরণ করে, তারা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয়।
এ থেকে বোঝা যায়, মুসলিম পরিচয় বজায় রাখতে হলে এমন প্রতীক ও প্রথা থেকে দূরে থাকা জরুরি।
দুই. বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ
পহেলা বৈশাখের উদযাপনে এমন অনেক উপাদান রয়েছে, যা ইসলামী ঐতিহ্যের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। বরং এগুলোর শিকড় অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির সাথে যুক্ত।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি যে জাতির অনুকরণ করে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
অতএব, মুসলিম হিসেবে আমাদের পরিচয় হবে স্বতন্ত্র, আমাদের আনন্দও হবে স্বতন্ত্র—যা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা নির্ধারিত।
তিন. অশ্লীলতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের পরিবেশ
বাস্তবতা হলো, এই উৎসবের অনেক আয়োজনে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, অশালীন পোশাক, উচ্চস্বরে গান-বাজনা এবং নানা ধরনের অনৈতিক কার্যকলাপ পরিলক্ষিত হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যভিচারের বিভিন্ন স্তরের কথা উল্লেখ করে আমাদের সতর্ক করেছেন। চোখ, কান, জিহ্বা, হাত ও পা—সবকিছুই গুনাহের পথে ব্যবহৃত হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, অশ্লীলতার কাছেও যাওয়া যাবে না—তা প্রকাশ্য হোক বা গোপন।
চার. হারাম বিনোদনের প্রসার
পহেলা বৈশাখের বর্তমান রূপে গান, বাদ্যযন্ত্র এবং অনেক ক্ষেত্রে হারাম উপাদানের উপস্থিতি স্পষ্ট। এসব ধীরে ধীরে মানুষের অন্তরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করে বলেছেন, যখন গান-বাজনা ও মদ্যপানের প্রসার ঘটবে, তখন আল্লাহর আযাব নেমে আসবে।
অতএব, যে আনন্দ আল্লাহর অসন্তুষ্টি ডেকে আনে, তা কখনো প্রকৃত আনন্দ হতে পারে না।
পাঁচ. সময় ও সম্পদের অপচয়
এই উৎসব উপলক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয়, সময়ের অপচয় এবং অনর্থক কাজে নিমগ্নতা আমাদের বাস্তব জীবনের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আল্লাহ তাআলা সফল মুমিনদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, তারা অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকে।
একজন মুমিনের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। সে জানে, তার সময়ই তার জীবন।
ইসলামী দৃষ্টিতে অবস্থান
ইসলামের বিশিষ্ট আলেমগণ স্পষ্টভাবে বলেছেন, অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবে অংশগ্রহণ করা, তাদের অনুকরণ করা বা তাদেরকে অভিনন্দন জানানো—সবই ইসলামী দৃষ্টিতে নিন্দনীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ।
এটি শুধু একটি সামাজিক বিষয় নয়, বরং ঈমান ও আকিদার সাথে সম্পৃক্ত একটি সংবেদনশীল বিষয়।
আত্মজিজ্ঞাসা
আজ আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করা উচিত—আমরা কি সমাজের চাপে আমাদের ঈমানের সাথে আপস করছি? নাকি আমরা সত্যকে জানার পরও তা এড়িয়ে যাচ্ছি?
আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে দিয়েছেন, যে ব্যক্তি ঈমানকে অস্বীকার করবে, তার সব আমল ব্যর্থ হয়ে যাবে এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
তাই একজন মুসলিমের প্রকৃত পরিচয় হলো—সে সত্য জানার পর তা গ্রহণ করে এবং সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে।
উপসংহার
পহেলা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা শুধুমাত্র একটি সাংস্কৃতিক উৎসব নয়, বরং এর ভেতরে এমন বহু উপাদান রয়েছে, যা ইসলামী জীবনবোধের সাথে সাংঘর্ষিক।
একজন প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি, যিনি সমাজের প্রচলিত রীতির চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে বেশি গুরুত্ব দেন।
আজ আমাদের প্রয়োজন সচেতনতা, আত্মসমালোচনা এবং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনার দৃঢ় অঙ্গীকার।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহিহ বুঝ দান করুন, সত্যকে গ্রহণ করার তাওফিক দিন এবং ভ্রান্ত পথ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
লেখক তরুণ আলোচক ও গবেষক, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com