(কর্মবীর সেরাজুল হকের ৫৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে)
অধ্যাপক শফিউল হক বাবলু
চলনবিলের কিংবদন্তী ‘এম সেরাজুল হক’ নব প্রজন্মের কাছে এক অজানা অচেনা নাম। বহুগুণে গুনান্বিত এই মানুষটির জন্ম হয়েছিল তৎকালীন বৃহত্তর পাবনা-রাজশাহী তথা চলনবিলাঞ্চলের এক অখ্যাত অজ পাড়াগাঁয়ের মোরশেদগুনা বর্তমান সেরাজপুর গ্রামে ১৯০৩ সালের ১লা নভেম্বর কোন এক শুভ লগ্নে। এম সেরাজুল হক একাাধারে ছিলেন সমাজসেবক, রাজনীতিক, সাহিত্যিক, অনলবর্ষী বক্তা ও সুলেখক।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে জীবনের অনেকটা সময় থেকেছেন জেলখানায় বন্দি। অত্যাচারী জমিদার ও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ব্রিটিশ সরকার সেকশন ফোর অব ইমারজেন্সি অর্ডিন্যান্স জারি করে ১৯৩২ সালে তাকে দীর্ঘদিন তার নিজ গ্রাম তাড়াশ উপজেলার সেরাজপুরে গৃহবন্দি রাখা হয়। বহুমূখি প্রতিভায় উদ্ভাসিত এম সেরাজুল হক চলনবিল তথা আসাম ও পূর্ববাংলার কুষক কুলকে বাঁচাতে লাইন প্রথা উচ্ছেদ, তেভাগা আন্দোলন, ঋনশালিশী বোর্ড গঠনসহ কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়নে উল্কার মত ভারত বর্ষের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন। কৃষকদের মঙ্গললার্থে একজন প্রতিথযশা সাংবাদিক হিসেবে তার অসংখ্য লেখা প্রকাশিত হয়েছে তৎকালীন ভারতবর্ষের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায়। এছাড়াও অসংখ্য সভা সমিতি কনফারেন্সে জ্বালাময়ি বক্তৃত্বা দিয়ে তিনি শোষিত নিপীড়িত কৃষক প্রজাদের উদ্ভুদ্ধ করেছেন। ভালোবাসা দিয়ে জয় করেছেন পাক বালার অগনিত কৃষকের অন্তর। মূলত: কৃষক প্রজার স্বার্থে তিনি বিপ্লবী রাজনীতি ও সংগ্রামে নিজের জীবন উসর্গ করেছিলেন।
বাংলা ১৩২৮ সালের ১০ই আষাঢ় পশ্চিম বাংলার মেদিনীপুরের ওয়াটসন কোম্পানী মেদিনীপুর,নদীয়া ও রাজশাহী জেলার কৃষক প্রজাদের উপড় যে বীভৎস নির্যাতন ও অত্যাচার করেছিল, সর্ব প্রথম এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে হক সাহেবকে প্রাণ নাশের হুমকি দেওয়া হয়। সে সময় উপমহাদেশের খ্যাতনামা ব্যক্তি তাঁর গুরু সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী” এম সেরাজুল হকের পক্ষ অবলম্বন করেন। তার উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় এম সেরাজুল হক উপমহাদেশের দিকপাল রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব চিত্ত রঞ্জন দাসের নিকট গমণ করেন। দেশবন্ধু চিত্ত রঞ্জন দাস হক সাহেবের কৃষক প্রজা আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধ সমান মনে করেন। অবশেষে সি. আর দাসের নেতৃত্বে এ আন্দোলন বেগবান হয়।
১৯৩১ সালের ১লা মার্চ অবিভক্ত ভারতের হুগলীতে যে পশ্চিমবঙ্গ কৃষক ও রায়াত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এম সেরাজুল হক ছিলেন তার অন্যতম সদস্য। হক সাহেবের প্রচেষ্টায় ১৯৩২ সালের ৩ মার্চ সিরাজগঞ্জ মহকুমা কৃষক প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, পাটচাষ নিয়ন্ত্রণ,কঢ়ুরী পানা ধ্বংস, জমিদার ও প্রজাদের সম্বন্ধ প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা করা হয়। উক্ত সম্মেলনে নি¤œ লিখিত প্রস্তাব সমূহ গৃহীত হয়।
“ঋণ শালিশী বোর্ড প্রতিষ্ঠা, কঢ়ুরী পানা ধ্বংসের জন্য বাধ্যতামূলক আইন, পাট চাষ নিয়ন্ত্রণ,গোচারণ ভূমি প্রজা পত্তন না দেওয়ার অনুরোধ, প্রজার নিকট হতে বেআইনী আবদার আদায় বন্ধ, চলনবিলাঞ্চলের বন্যা রোধের জন্য সারা- সিরাজগঞ্জের রেল লাইনে ব্রীজ নির্মাণ, চলনবিলে পানি আনায়নের জন্য ফুলজোর নদী হতে বেশানী নদী পর্যন্ত খাল খনন, সমবায় ব্যাংক হতে গৃহীত টাকার সুদ মৌকুফ, কিস্তি বন্দী হিসেবে ঋণ বন্দী হিসেবে ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা ,বাঁকী খাজনা কৃষকদের নিকট মওকুফ করা।
এছাড়াও পাক ভারতের কৃষককুলকে ঋনের দায় থেকে মুক্তির জন্য এবং চলনবিলাঞ্চলের কৃষককুল রক্ষার জন্য কর্মবীর সেরাজুল হকের উদ্যোগে চলনবিলের মধ্যস্থল তৎকালীন নাটোর মহকুমার অর্ন্তগত বর্তমান গুরুদাসপুর উপজেলার ঐতিহাসিক ব্যবসা কেন্দ্র চাঁচকৈড়ে অবিভক্ত ভারতের শিক্ষা মন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন, বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের অন্যতম সদস্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী , শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হককে আমন্ত্রণ করে যে ঐতিহাসিক নিখিল বঙ্গ রায়াতখাতক কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয় এম সেরাজুল হক ছিলেন উক্ত সম্মেলনের প্রধান অর্গানাইজার ও সেক্রেটারী। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, তৎকালীন সময়ে চলনবিলাঞ্চল এর সেই সমাবেশের চেয়ে আর অধিক লোক সমাহম কোথায়ও হয় নাই। উক্ত সম্মেলনের কিছুদিন পরেই শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে ঋনশালিশী বোর্ড গঠন করা হয়।
কৃষক প্রজাদের আন্দোলন সংগ্রাম জোড়দার করার লক্ষে হক সাহেব পাক ভারতের বিভিন্ন স্থানে সভা সমিতি করেন। এবং ওইসব সভাসমিতিতে জনগন যাতে যোগদান করতে পারে তার জন্য অসংখ্য চিঠি, রিপোর্ট ,খবর,প্রবন্ধ, নিবন্ধ প্রভৃতি খবরের কাগজে লিখতেন। বিশেষ করে রাজশাহী ও পাবনা অঞ্চলের কৃষকদের জন্য নিজেকে উজার করে দিয়ে রাত দিন চিন্তা করতেন। হক সাহেব ছিলেন চলনবিল উন্নয়ন সমিতিরি সভাপতি। তারই উদ্যোগে তার ক্ষুরধার লেখনির কারণে তৎকালীন পূর্তবিভিাগ নয় লক্ষ টাকা ব্যয় করে চলনবিলাঞ্চলের মানুষের দুঃখ দুর্দশা লাঘবের জন্য ঐতিহাসিক নিমাইচড়া ও বেশানী গুমানী খাল খনন করে। অধিকন্ত তারই চেষ্টায় ১৯৬০ সালে তিনি যখন তাড়াশ উপজেলার ৭নং মাধাইনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তখন তাড়াশ হতে কাঁটাগাড়ি পর্যন্ত দীর্ঘ ১২ কি:মি: রাস্তা ও খাল খনন করেন যা আজও সেরাজখাল নামে খ্যাত। উক্ত খাল খননের ফলে উত্তর তাড়াশের কুষক কুলের জন্য ভাগ্য পরিবর্তন হয়। এর পূর্বে ওই এলাকার পানি নিষ্কাশনের আদৌ কোন ব্যবস্থা ছিল না । মূলত কর্মবীর সেরাজুল হক কর্তৃক তাড়াশ কাঁটাগাড়ী রাস্তা খাল নির্মাণ ছিল এলাকাবাসীর জন্য আর্শীবাদ।
কর্মবীর সেরাজুল হক শুধু চলনবিল নয় উপমহাদেশের কৃতি ব্যক্তিদের অন্যতম। পরিতাপের বিষয় এম, সেরাজুল হককে স্মরণীয় করে রাখার কোন উদ্যোগ নেই চলনবিল তথা তাড়াশ এলাকাবাসীর অথবা সরকারের। এই মহতী মানুষটির নামে নেই কোন রাস্তাঘাট, স্কুল কলেজ, মাদ্রাসা এমন কি খেলার মাঠ। ধ্বংস বা ভগ্ন প্রায় তার মাজারটি রক্ষারও নেই কোন উদ্যোগ। ১৯৬৩ সালের ১৫ নভেম্বর এই মহৎ প্রাণ পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান না ফেরার দেশে। শুধুমাত্র চলনবিলাঞ্চলেই নয় বিংশ শতাব্দির মধ্য ভাগে পাক বাংলার সর্বত্র মাওলানা এম সেরাজুল হকের পরিচিতি ছিল। নব প্রজন্মের কাছে এটি একটি অচেনা নাম। তিনি ছিলেন একজন কবি, সাহিত্যিক,সাংবাদিক,রাজনীতিক ও সমাজকর্মী। অর্থাৎ বহু গুণে গুনান্বিত একজন আলোকিত মানুষ। তিনি কেবল প্রখ্যাত সমাজসেবী ও লেখক অধ্যাপক এম এ হামিদের ওস্তাদ বা গুরু ছিলেন না; তার জমানা পরবর্তী চলনবিলের সকল কৃতি ্র প্রসিদ্ধ পুরুষদেরই তিনি প্রেরণার উৎস । তার কাছে আমাদের অশেষ ঋন আছে তা অস্বীকার করার নয়।
হক সাহেবের মৃত্য সংবাদে ব্যথিত ও আন্দোলিত হয়েছিনে দেশ বিদেশের তৎকালীন অনেক বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ। দেশের বাইরে তথা পশ্চিম বাংলার কলকাতাতে আজও তার জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালন করা হয়। ১৯৫৩ সালের ১৫ নভেম্বর তার মৃত্যুতে লন্ডন হতে প্রকাশিত “আওয়ার হোম” পাকিস্তানের “হামারা ওয়াতান” ও পূর্ব পাকিস্তানের “আমাদের দেশ” পদিকার সম্পাদক ব্যারিষ্টার আব্বাস তার এক শোকবাণীতে লিখেছিলেন “মাওলানা এম সেরাজুল হক সাহেবের মৃত্যর খবরে আমি অত্যন্ত দু:খিত হয়েছি। তাঁর জীবন অবসানে পাকিস্তান একজন কৃতি সন্তানকে হারিয়েছে। তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার কারিগর। দেশের ছেলে মেয়েদের কিভাবে শিক্ষিত করা যায় সেই পরিকল্পনায় তার মন ছিল ভরা। বৃটেনের মত দেশে যদি এরকম কোন লোক জন্মগস্খহণ করতেন ,তাহলে তার অবদানের ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ত। আমার বিশ্বাস ,যখন পাকিস্তানের সত্যিকার ইতিহাস লেখা হবে মরহুম হক সাহেবের নাম পাকিস্তানের অন্যতম কৃতি সন্তান হিসেবে লেখা থাকবে”।
হক সাহেব আমাদের গর্ব , আমাদের অহংকার । তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব সবার। হক সাহেব কোন পরিবারের লোক নয়, কোন অঞ্চলের নয়, তিনি দেশের, তিনি জাতীর অহংকার ও অলংকার। তথা তিনি বাঙ্গালী সমাজের অন্যতম মুকুট। তার জীবন ও কর্মাদর্শ আমাদের দেশ এবং সমাজ গঠনে পাথেয় হয়ে থাকবে।
লেখক: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com