মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ
আমাদের দেশে আজ অসংখ্য হিফজ মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার শিশু-কিশোর আল্লাহর কালাম মুখস্থ করার এই মহান পথে নিজেদের নিয়োজিত করছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি বরকতময় কাজ, একটি গৌরবের বিষয়। একজন হাফেজ হওয়া মানে কুরআনকে নিজের বুকে ধারণ করা—এ এক অনন্য মর্যাদা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই হিফজের পর তাদের জীবনের কী অবস্থা?
বাস্তবতা কিছুটা বেদনাদায়ক। দেখা যায়, একটি বড় অংশের ছাত্র হিফজ সম্পন্ন করার পর আর সঠিক দিকনির্দেশনা পায় না। কেউ সামান্য কিতাবি পড়াশোনা করে, আবার অনেকেই একেবারেই শিক্ষার ধারাবাহিকতা থেকে ছিটকে পড়ে। ফলে তারা দ্বীনের গভীর জ্ঞান, আদব-আখলাক, সামাজিক আচরণ—এসব থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়।
অথচ একটি বিষয় আমাদের গভীরভাবে অনুধাবন করা উচিত—শুধু কুরআন মুখস্থ করাই যথেষ্ট নয়; বরং সেই কুরআনের আলোকে জীবন গঠন করাই প্রকৃত লক্ষ্য।
বর্তমান বাস্তবতায় অনেক হিফজ প্রতিষ্ঠানে তালিম ও তারবিয়াতের ঘাটতি স্পষ্ট। ছাত্রদেরকে কেবল মুখস্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, কিন্তু তাদের চরিত্র গঠন, দায়িত্ববোধ, সামাজিক আচরণ—এসব বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে হিফজ শেষ করার পর তাদের চলাফেরা, কথা-বার্তা, জীবনযাপন অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।
দেখা যায়, একজন আলেম যেখানে নিজ আচরণে শালীনতা, গাম্ভীর্য ও সংযম বজায় রাখেন, সেখানে কিছু হাফেজের মাঝে সেই আদর্শের ঘাটতি লক্ষ করা যায়। এটি হিফজের মর্যাদাকে ছোট করে না, বরং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি দুর্বলতাকে সামনে আনে।
এই সমস্যার অন্যতম কারণ হলো—একাধিক উস্তাদের সংস্পর্শ থেকে বঞ্চিত হওয়া। বিভিন্ন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করলে ছাত্রদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হয়, চিন্তার গভীরতা বাড়ে, এবং ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে। কিন্তু সীমাবদ্ধ পরিবেশে বেড়ে ওঠা অনেক ছাত্র এই সুযোগ পায় না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—মৌলিক শিক্ষা। এমনও দেখা যায়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের হাফেজ হয়েও কেউ নিজের ভাষায় সঠিকভাবে লিখতে বা প্রকাশ করতে অক্ষম। এটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রতিযোগিতা ও বাহ্যিক সাফল্যের পেছনে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। ছাত্রদেরকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করিয়ে পুরস্কার অর্জনের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়, অথচ তাদের সামগ্রিক জীবন গঠনের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়।
আরও একটি অনৈতিক প্রবণতা হলো—কিছু ক্ষেত্রে হিফজ সম্পন্ন হওয়ার পরও ছাত্রদেরকে অযথা আটকে রাখা হয়, শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে। এটি একজন ছাত্রের মূল্যবান সময় নষ্ট করার শামিল, যা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
তাই সময় এসেছে আমাদের ভাবার—
আমরা কি কেবল হাফেজ তৈরি করছি, নাকি একজন পরিপূর্ণ মানুষ গড়ে তুলছি?
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি—
প্রথমত, হিফজের পাশাপাশি মৌলিক সাধারণ শিক্ষা (বাংলা, লেখা-পড়া) বাধ্যতামূলক করা উচিত।
দ্বিতীয়ত, নিয়মিত আদব-আখলাক ও তারবিয়াতের ক্লাস চালু করতে হবে।
তৃতীয়ত, শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যাতে তারা ছাত্রদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারেন।
চতুর্থত, অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
পঞ্চমত, হিফজ সম্পন্ন হওয়ার পর ছাত্রদেরকে কিতাবি বা অন্য উপযোগী শিক্ষার পথে সঠিকভাবে পরিচালিত করতে হবে।
মনে রাখতে হবে—কুরআন শুধু মুখস্থ করার জন্য নয়, বরং জীবনে বাস্তবায়নের জন্য নাযিল হয়েছে। একজন হাফেজ তখনই সফল, যখন তার জীবন কুরআনের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
আসুন, আমরা হিফজ শিক্ষাকে শুধু একটি ধাপ হিসেবে নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন গঠনের সূচনা হিসেবে দেখি। তাহলেই আমাদের সমাজ পাবে এমন হাফেজ, যারা শুধু কুরআনের ধারক নয়, বরং কুরআনের প্রকৃত প্রতিনিধি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং আমাদের সন্তানদেরকে হিফজের পাশাপাশি ইলম, আমল ও উত্তম চরিত্রে সমৃদ্ধ হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com