মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ
মুসলমানদের জীবনে আরবি বারো মাসের প্রতিটিই নিজস্ব মর্যাদা ও তাৎপর্যে ভরপুর। পবিত্র রমজানের বিদায়ের পর আমরা শাওয়ালের ছয় রোজার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করেছি। এখন আমরা শাওয়ালের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে—সামনে আগমন করছে এক তাৎপর্যময়, নীরব অথচ গভীর শিক্ষাবাহী মাস—জিলকদ।
জিলকদ (জুলকাআদাহ) আরবি চন্দ্র বছরের একাদশ মাস। এটি হজের তিন মাস—শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ—এর দ্বিতীয় মাস। একই সঙ্গে এটি চারটি সম্মানিত ‘হারাম মাস’-এর একটি; বাকি তিনটি হলো মহররম, রজব ও জিলহজ। এই হারাম মাসগুলোতে পাপের ভয়াবহতা বৃদ্ধি পায় এবং নেক আমলের প্রতিদান বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।জিলকদ: ইবাদতের মাঝপথে এক নীরব বিরতি
‘জুলকাআদাহ’ শব্দের অর্থ—বসে থাকা, স্থির হওয়া, বিশ্রাম নেওয়া। রজব, শাবান, রমজান ও শাওয়ালের টানা ইবাদতের পর এই মাস যেন এক প্রশান্তির অবকাশ। আবার এর পরেই আসে জিলহজ ও মহররম—যেখানে ইবাদতের নতুন জোয়ার। এই ধারাবাহিকতায় জিলকদ মাস আমাদের জন্য এক প্রস্তুতিমূলক বিরতি—যেখানে আমরা আত্মাকে গুছিয়ে নিই, শক্তি সঞ্চয় করি, এবং পরবর্তী ইবাদতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করি।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও পাপ থেকে বিরত থাকার শিক্ষা জাহেলি যুগেও আরবরা এই মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ রাখত। তারা বাণিজ্য ও সংঘর্ষ থেকে ফিরে এসে এক ধরনের সামাজিক স্থিতি বজায় রাখত। এই ঐতিহ্য ইসলামে এসে আরও পরিশুদ্ধ রূপ পায়—এই মাসে পাপ থেকে বিরত থাকা, অন্যায় থেকে দূরে থাকা এবং আত্মশুদ্ধির চর্চা বিশেষ গুরুত্ব পায়।
অবসর মানেই অবহেলা নয় জিলকদ আমাদের শেখায়—অবসর মানেই গাফেলতি নয়; বরং এটি নেক আমল বৃদ্ধির একটি সুবর্ণ সুযোগ। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:“ফা-ইযা ফারাগতা ফানসাব, ওয়া ইলা রাব্বিকা ফারগাব।”অর্থ: “তুমি যখন অবসর পাও, তখনই ইবাদতে মগ্ন হও এবং তোমার রবের প্রতিই মনোনিবেশ কর।” (সুরা ইনশিরাহ: ৭-৮) আরেক স্থানে বলেন:“ওয়াল আসর! ইন্নাল ইনসানা লাফি খুসর…”অর্থ: “সময়কে শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে…” (সুরা আসর: ১-৩)অতএব, সময়কে অবহেলা করা মানেই নিজের ক্ষতি ডেকে আনা।
হাদিসের আলোকে সময়ের মূল্যরাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:“পাঁচটি জিনিসের আগে পাঁচটি জিনিসকে গুরুত্ব দাও—ব্যস্ততার আগে অবসর, অসুস্থতার আগে সুস্থতা, দারিদ্র্যের আগে প্রাচুর্য, বার্ধক্যের আগে যৌবন এবং মৃত্যুর আগে জীবন।”আরও একটি হাদিসে এসেছে—কিয়ামতের দিন বান্দাকে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে: তার জীবন, যৌবন, উপার্জন, ব্যয় এবং জ্ঞান অনুযায়ী আমল সম্পর্কে।
জিলকদ মাসের করণীয় আমল যদিও এই মাসে নির্দিষ্ট কোনো ফরজ বা ওয়াজিব আমল নেই, তবুও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নফল আমল রয়েছে যা একজন মুমিনকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দিতে পারে—নফল রোজা রাখা (বিশেষ করে আইয়ামে বিদ—১৩, ১৪, ১৫ তারিখ) প্রতি সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশত (দুহা), আউওয়াবিন নামাজ আদায় সালাতুত তাসবিহ পড়া বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত
দান-সদকা করা জিলহজের ইবাদত ও কোরবানির প্রস্তুতি গ্রহণ মহররমের রোজার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা ইবাদতের ধারাবাহিকতায় সৌভাগ্যের দরজা যদি একজন মুমিন রজব থেকে শুরু করে মহররম পর্যন্ত ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন, তবে তিনি প্রায় আট মাস ধরে এক অবিচ্ছিন্ন ইবাদতের স্রোতে নিজেকে প্রবাহিত রাখতে সক্ষম হন—যা নিঃসন্দেহে বিরল সৌভাগ্য।
উপসংহার
জিলকদ মাস নিছক একটি ‘বিশ্রামের মাস’ নয়; বরং এটি আত্মবিশ্লেষণ, আত্মশুদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ ইবাদতের প্রস্তুতির মাস। এই মাস আমাদের শেখায়—জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান, প্রতিটি নিঃশ্বাসই এক একটি সুযোগ।আসুন, আমরা এই মাসকে অবহেলায় নষ্ট না করে, নফল ইবাদত, তাওবা-ইস্তিগফার এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করি।মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন।আমীন ছুম্মা আমীন।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com