আব্দুল লতিফ সরকার
১৫ই নভেম্বর ১৯৬৩ সালে তাড়াশের সুর্য সন্তান জীবন যুদ্ধের বীর সৈনিক চলনবিল তথা তাড়াশের উজ্জল নক্ষত্র মওলানা সেরাজুল হক সাহেবের জীবন প্রদীপ চিরতরে নির্বাপিত হয়।
তিনি ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ ।একটি অনন্য প্রতিভামন্ডিত এক মহান সত্ত্বা। বৃটিশ বিরোধী ধুমকেতু। একজন আজাদী পাগল মানুষ। আজীবন সত্য সন্ধানী একজন একনিষ্ঠ সাধক। সাহিত্য সাংবাদিকতায় ঐ সময়কার জগতে একজন নিবেদিত প্রাণ আলোকিত ব্যক্তিত্ব। কু:সংস্কারে নিমজ্জিত মুসলিম সমাজের পথ প্রদর্শক ও সমাজ সংস্কারক। যার সম্পর্কে আমার আব্বার (পিতা) মুখে শোনা এবং শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক এম এ হামিদ সাহেবের লেখা “কর্মবীর সেরাজুল হক” ও “চলনবিলের ইতিকথা” বই পড়ে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সৈনিক কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সমাজ সংস্কারক ইসলামের পথ প্রদর্শক প্রতিথযশা অগ্নিপুরুষ সম্পর্কে আজকের লেখা আমার জন্য এক ধরনের দু:সাধ্য ব্যাপার।
১৯০৩ সালের ১ নভেম্বর তাড়াশ থানার মরাসগুনা বা মোরসেদগুনা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে সেরাজুল হক জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শেখ মেছের উদ্দিন, মাতা সবজাহান নেছা। তিনি মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘শিশু শিক্ষা’ দ্বিতীয় ভাগ পর্যন্ত যখন পড়েছিলেন। তখন এটুকু লেখা পড়া জানাতেই তিনি তৎকালে একজন ভাল শিক্ষিত লোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ঐ সময় চলনবিল অঞ্চল ছিল শিক্ষাদীক্ষায় অত্যন্ত পশ্চাৎপদ। একেকটি ইউনিয়নে ২/৩ টির বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল না। ১৯৪০ সাল পর্যন্ত তাড়াশ, গুরুদাসপুর, বড়ইগ্রাম থানায় কোন হাইস্কুল ছিল না। চলনবিল অঞ্চলে ছিল শুধু মাছ আর মাছ। যা এখনও মাছের ভান্ডার হিসেবে সারাদেশে পরিচিত। তাই সাধারণ লোকদের শিক্ষার প্রতি তেমন আগ্রহ ছিল না। বরং তারা বলতেনÑ “লেখা পড়া শিখিবে মরিবে দু:খে, মৎস্য ধরিবে খাইবে সুখে”। সেরাজুল হক সাহেবের পিতা ছিলেন শিক্ষানুরাগী ।সেই কারণেই ছেলেকে প্রথমে ওয়াশীন পাঠশালায় ও পরে তাড়াশ নি¤œ প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করেন।
১৯১৬ সালে তিনি নি¤œ প্রাইমারী বৃত্তি লাভ করেন এবং তাড়াশ থানায় কোন উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় উল্লাপাড়া ইংলিশ হাই স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। এখানে পড়াকালে পাঠ্য বইয়ের বাইরেও বিভিন্ন বই পড়ার প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে পড়েন। তিনি বিষাদ সিন্ধু, কাছাছল আম্বিয়া, আলিফ লায়লা, জঙ্গনামা, সমাজ ও সংস্কার, বিধবা গঞ্জনা, নীলদর্পন প্রভৃতি বই পাঠ করে সমাজ সচেতন হয়ে উঠেন। এছাড়া নিয়মিত খবরের কাগজ পড়ে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও রাজনীতি সম্পর্কে কিছু কিছু জ্ঞান লাভ করতে থাকেন।
উল্লাপাড়া হাই স্কুলে থাকাকালে কিছু সহপাঠী নিয়ে ‘নহর’ নামে একটি হাতে লেখা দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করেন। এছাড়াও তিনি স্কুলের বিতর্ক, আবৃত্তি, বক্তৃতা, রচনা ও ক্রীড়া প্রতিযোগীতায় অংশ গ্রহণ করে সুনাম অর্জন করেন। ১৯২০ সালের ডিসেম্বরে বার্ষিক পরিক্ষায় সুনামের সহিত পাশ করে সপ্তম শ্রেণিতে উঠলে দেশের খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পরলে তার স্কুলের পড়ার পর্ব শেষ হয়।
এরপর তাঁর পিতা একরূপ জোর করে দ্বীনি এলেম শিক্ষা দিবার জন্য উল্লাপাড়ার চৌবিলা মাদ্রাসায় ভর্তি করেন। হক সাহেব মাদ্রাসার সাপ্তাহিক সভায় ছাত্রদের চরিত্র গঠন, সমাজ সংস্কার, শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা প্রভূতি বিষয়ে বক্তব্য রেখে সুনাম অর্জন করেন। ১৯২৭ সালে তিনি চৌবিলা মাদ্রাসা হতে জুনিয়র পাশ করেন।
সেরাজুল হক সাহেব ছিলেন কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও তুখোর বক্তা। তার গুরু ছিলেন ঋৃষী ইসমাইল হোসেন সিরাজী। বন্ধু ছিলেন বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম। তিনি শুধু পত্রিকায় লেখালেখি করেননি, করেছেন সম্পাদনাও। আবার তার সাধনার ফসল স্বরূপ উত্তরসুরীদের জন্য অমর গ্রন্থসমূহ প্রকাশ করে রেখে গেছেন। যা আমাদের জন্য পথ চলার পাথেয়। কিন্তু দু:খের বিষয়, বইগুলো এতই দু:স্প্রাপ্য যে, চোখে দেখার বা পড়ার ভাগ্যে ক’জনার জুটেছে তা বলা কঠিন। তার লেখা বইগুলোÑ মোসলেম সমস্যা, সুধার পেয়ালা, শিরাজী চরিত, ইসলামের বৈশিষ্ট্য, টুটিল তিমীর রাত্রি, কেতাবুল ঈমান, শেরেক ধ্বংস-ঈমান রক্ষা, পাকিস্তানী গজল গীতি, আল্লাহর পানে ফিরিয়া চাও, ইসলাম প্রভা ইত্যাদি। এছাড়া অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি হচ্ছেÑ অমর জীবন কাহিনী, বিদ্রোহী তিতুমীর, প্রলয় বিষান।
মাদ্রাসার ছাত্রাবস্থাতেই তার প্রথম গ্রন্থ মোসলেম সমস্যা ১৯২৫ খৃ: প্রকাশ পায়। মাদ্রাসায় ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলে তিনি রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পরেন। তখন দেশে খেলাফত আন্দোলন চলছিল। হক সাহেবে ১৯৪১ সালে খেলাফত কমিটি’র সদস্য হয়ে খেলাফত আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় তিনি পাকভারতের অপ্রতিদ্বন্ধী রাজনৈতিক দল সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটিরও সদস্য হন। তিনি কংগ্রেস ও খেলাফত কমিটির ইংরেজ বিরোধী অসহযোগ, আইন অমান্য, বিলাতীদ্রব্য বর্জন, ইংরাজ উচ্ছেদ প্রভূতি আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন এবং পাক ভারতের বহুস্থানে এই উদ্দেশ্যে বহু সভায় জ¦ালাময়ী বক্তৃতা করেন। তাকে অনললবর্ষী বক্তা নামে অভিহিত করা হয়। স্বাধীকার প্রশ্নে হক সাহেব ছিলেন আপসহীন। ১৯৩০ সালের ২৮ শে আগস্ট ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তাকে গ্রেফতার করা হয়। আন্দোলনে কোনরূপ আপোষ করতে রাজী না হওয়ায় হক সাহেবকে তিন মাসের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়। তিনি তা নিঃসস্কোচে বরণ করেন।
হক সাহেব তার রাজনৈতিক জীবনে তৎকালে উপমহাদেশের যে সকল দেশবরেণ্য ঐতিহাসিক নেতৃবর্গের সাহচর্য লাভ করেছেন তারা হলেনÑ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী, গান্ধীজী, দেশবন্ধু, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, আলী ভাতৃদ্বয়, নেতাজী সুভাস বোস, সত্যেন মজুমদার, কবি কাজী নজরুল ইসলাম, মাওলানা তর্কবাগীশ প্রমূখ। তিনি রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ^াসী। বহুধা গুণে গুনান্বিত ও অসাধারণ প্রতিভায় প্রদীপ্ত কর্মবীর সেরাজুল হক চলনবিল তথা সমগ্র ভারতবর্ষে যে রাজনৈতিক আদর্শ রেখে গেছেন আজকের রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সাহিত্যিক-সাংবাদিকগণ তা স্মরণ ও অনুসরণ করে একটি সুস্থ ও স্থায়ীত্বশীল রাজনৈতিক দর্শনের সন্ধান পেতে পারেন। তার কীর্তিময় জীবন বর্তমান প্রজম্মের আদর্শের ও অনুপ্রেরণার খোরাক হয়ে আছে।
পরিশেষে চলনবিল তথা তাড়াশের লেখক ও গুণীজনের কাছে এ অধমের নিবেদন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সেরাজুল হক সাহেবকে জানাতে অনুকরণ ও অনুসরণ করে সঠিক পথে চলার দিক্ষা দিতে হলে তাড়াশে “সেরাজুল হক স্মৃতি পরিষদ” সক্রিয় করে কমপক্ষে তার জন্মদিন ও মৃত্যুবার্ষিকী প্রতি বছর পালন করা অতি আবশ্যক। এবং তার লেখা বইগুলো সংগ্রহ করে পূণ: মূদ্রণ করে সেরাজুল হক স্মৃতি পাঠাগারে রাখা হোক। তাছাড়া এই মহান ব্যক্তির স্মৃতি রক্ষার্থে তাড়াশের প্রতিষ্ঠানের ও সড়কের কিংবা স্থাপনার নামকরণ করা খুবই জরুরী। তাঁর ৫৬তম মৃত্যু বার্ষিকীতে মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে শেষ করছি, আমীন।
লেখক: কবি-প্রাবন্ধিক, মুঠোফোন : ০১৭৪৩-৯০৪৪৫৯
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com