গুরুদাসপুরে কলেজ সভাপতির পদ নিয়ে টানাটানি

Spread the love

শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত

গুরুদাসপুর প্রতিনিধি: বৃহৎ চলনবিলাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া নারীদের উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রতিষ্ঠান গুরুদাসপুরের রোজী মোজাম্মেল মহিলা কলেজ। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজে দীর্ঘদিন ধরে সভাপতি পরিবর্তনের রাজনীতি চলছে। কলেজটির গভর্নিং বডির নেতৃত্ব পরিবর্তনকে ঘিরে বিএনপির দুইপক্ষের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। রাজনৈতিক উত্তেজনায় কলেজটির উন্নয়ন ও শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশকেই প্রশ্নের মুখে ফেলা হয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রামে বিএনপির সাবেক এমপি প্রয়াত মোজাম্মেল হকের প্রতিষ্ঠিত ১৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই অঞ্চলের শিক্ষার ভিত্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। তার নামের সঙ্গে সম্পৃক্ত তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রোজী মোজাম্মেল মহিলা কলেজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কলেজটি তাদের দান ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে তাঁর মায়ের পৈতৃক নিবাসে প্রতিষ্ঠিত। প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোগত উন্নয়নেও পরিবারটির প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে।
তবে জুলাইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মোজাম্মেল হকের জ্যেষ্ঠ পুত্র জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আবু হেনা মোস্তফা কামাল রঞ্জু সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বৈধভাবে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। হঠাৎ তাকে অপসারণ করায় স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নিয়োগ বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম, সভাপতি ও অধ্যক্ষ পদ নিয়ে দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে কলেজটি মুখ থুবরে পড়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি পরিবর্তন হয়েছে ১৫ বার এবং অধ্যক্ষ পরিবর্তন হয়েছে ১২ বার। শুধু ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৯ বছরে সভাপতি বদল হয়েছে ৮ বার এবং অধ্যক্ষ বদল হয়েছে ৭ বার। ঘনঘন এই পরিবর্তনের ফলে কলেজটির একাডেমিক কার্যক্রম ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে প্রায় ১৭ বছর প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সদস্যদের কলেজে প্রবেশ পর্যন্ত করতে দেওয়া হয়নি। আবার ৫ আগস্টের পর উপাধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ কলেজটি দখলে নেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আবু হেনা মোস্তফা কামাল রঞ্জু কলেজের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেইসাথে প্রতিষ্ঠানটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার উদ্যোগ নেন।
কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে অপসারণ করে ৩ অক্টোবর আবুল কালাম আজাদের স্ত্রীর ভাই অধ্যাপক ওমর আলীকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের হস্তক্ষেপে ২০ অক্টোবর আবু হেনা মোস্তফা কামালকে পুনরায় চেয়ারম্যান পদে পুনর্বহাল করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ২২ জুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাকে স্থায়ীভাবে চেয়ারম্যান মনোনীত করে।
কিন্তু উপাধ্যক্ষ পদে পুনর্বহালের জন্য উপজেলা জিয়া পরিষদের সভাপতি ও স্থানীয় এমপি আব্দুল আজিজের সমর্থক আবুল কালাম আজাদের দাখিলকৃত আবেদনপত্রে স্বাক্ষর দিতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। এতেই কলেজের অভ্যন্তরে প্রশাসনিক উত্তেজনা বেড়ে যায়। ধানের শীষের প্রচারণা চালিয়েও নিজ দলের এমপি সমর্থকদের রাজনীতির শিকার হলেন ব্যারিষ্টার রঞ্জু।
অভিযোগ রয়েছে, ভূগোল বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আবুল কালাম আজাদ ২০০৫ সালে ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদের মাধ্যমে উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি প্রভাষক পদ থেকে পদত্যাগ না করেই একই সঙ্গে দুইটি পদে বহাল থেকে বেতন-ভাতা উত্তোলন করেন। যা ২০১৩ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অডিটে বেআইনি হিসেবে চিহ্নিত হয়। সুপারিশ অনুযায়ী তাকে একটি পদে থাকার নির্দেশ দেওয়া হলেও তা মানা হয়নি। শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে তাকে উপাধ্যক্ষ পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি আদালতে মামলা দায়ের করলে তা বিচারাধীন আছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে উপাধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ বলেন- “সাবেক সভাপতি নিজের অনিয়ম দুর্নীতি ঢাকতে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছেন। তার চাহিদামতো অর্থ না দেয়ায় আমার উপাধ্যক্ষ পদ কেড়ে নেয়া হয়। তাছাড়া তার বাবা কলেজটির চেয়ারম্যান থাকাকালীন বৈধভাবে আমাকে উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দিয়েছেন।”
সর্বশেষ গত ৩০ মার্চ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আদেশে কলেজটির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা কামাল রঞ্জুকে সরিয়ে নতুন সভাপতি হিসেবে অধ্যাপক মো. ওমর আলীর নাম ঘোষণা করা হয় এবং দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর সাবেক সভাপতি রঞ্জুর বিরুদ্ধে প্রায় ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে শিক্ষক-কর্মচারীদের টাকা ফেরতের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেন উপাধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ।
তবে এ অভিযোগকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত দাবি করে রঞ্জুর সমর্থকরা পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে বলা হয়, যথাযথ তদন্ত ছাড়াই পরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সদস্যকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা গেছে। কলেজের উন্নয়নে বাধাগ্রস্ত না করে রাজনীতিমুক্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চান শিক্ষার্থীরা।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সেলিম আকতার বলেন, “সভাপতি পরিবর্তনের বিষয়টি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের। পদের দ্বন্দ্বে কলেজের শিক্ষাব্যবস্থা ব্যহত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে শিক্ষার্থী-অভিভাকরা। শিক্ষকদের মধ্যেও বিভক্তির সৃষ্টি হয়। তবে কলেজে পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের দিকে নজর দিতে শিক্ষকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছি।”
সাবেক সভাপতি আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, “দীর্ঘ ১৭ বছর বাবার গড়া এই প্রতিষ্ঠানে যেতে পারিনি। দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখি কলেজের তহবিলে কিছুই নেই। আমি কোনো অনিয়ম করিনি, বরং ফান্ডে অর্থ সংরক্ষণ করেছি। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আমাকে সরানো হয়েছে।”
তিনি দাবি করেন, “আবুল কালাম আজাদের উপাধ্যক্ষ পদের নিয়োগ বৈধ ছিলনা। চলমান মামলার প্রেক্ষিতে তাকে পদোন্নতি না দেওয়ায় উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন।”
তবে বর্তমান সভাপতি ওমর আলী বলেন, “কলেজের এফডিআর ফান্ডে থাকা ৬ লাখ টাকার হিসাব পেয়েছি। কিন্তু কলেজের পূর্বের সব ঘটনার সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কলেজে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছি।”
এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কল রিসিভ করেননি তিনি।#

 

Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD