মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতিকথা ৫ম পর্ব
আব্দুর রাজ্জাক রাজু
তাড়াশের আশানবাড়ী গ্রামে মা বাবা থাকতেন আমাদের যে মাটির দেয়াল ঘরে, টিনের চাল দেয়া তার বারান্দায় থাকতাম আমি। ঘরের দরজা ও বারান্দার দরজা ছিল সামনাসামনি ও সোজাসুজি। দরজার ঠিক পূর্বের পাশেই কাঠের চৌকিতে আমার শয্যা। মেঘলা সে রাতে আমি গভীর ঘুমে মগ্ন। বাইরে বৃষ্টি ছিল কি না মনে নেই। তবে স্বাধীনতার সে বছর টইটম্বুর বর্ষা তা সবারই জানা। আমাদের বাড়ীর বাইরের উঠানের কানায় বন্যার পানি এসে পৌছেছে। সমগ্র মাঠে ধানক্ষেতে ভাসা আমন ধান কিছু কিছু জেগে আছে। ততদিনে মুক্তিযুদ্ধের ধুম পড়েছে সাড়া দেশ জুরে। এ ব্যাপারে লোকমুখে নানা গুজব-গুঞ্জন ভেসে আসছে নিরন্তর। তাই যেখানেই রেডিও খবর, সেখানেই ছুটে যাই আমরা কিশোর-তরুণরা। মুক্তিযুদ্ধের খবর জানতে সে সময় বিবিসি বাংলা বেতার ছিল সবচেয়ে অধিক জনপ্রিয় এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদ মাধ্যম। তখনো গ্রাম-পল্লীতে টেলিভিশনের প্রচলন শুরু হয় নাই, পত্র-পত্রিকাতো দূরের কথা। গ্রামে তো কল্পনা বটে, এমনকি থানা সদরেও তখনো বিদ্যুৎ আসে নাই। তাই দেশ-বিদেশের খবর জানতে ব্যাটারী চালিত রেডিও একমাত্র ভরসা। সেখানে মুক্তিফৌজের বিচিত্র কৌশলে গেরিলা যুদ্ধের সংবাদ শোনা যাচ্ছিল প্রতিদিন। মার্ক টালি ছিল বিবিসি’র প্রখ্যাত নির্ভিক সাংবাদিক যিনি প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের খবর পরিবেশন করেছেন অধিকাংশ সময় ভারতের দিল্লী থেকে, তা আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনতাম। যে কোনো রেডিওর শর্ট ওয়েভে তা শোনা যেত। সে উদগ্রীব আর কৌতুহলের তুলনা হয় না।
যাহোক, রাত বারোটা তখন পেরিয়ে গেছে মনে হয়। আমি ঘুমের মধ্যেই মৃদু পায়ের শব্দ ও ফিসফিসানি কথার আওয়াজ টের পাচ্ছিলাম দেয়াল ঘরের মধ্যে। একটু নড়েচড়ে চোখ মেলে দেখি আমার বাজান (আমরা পরিবারে ভাইবোন সবাই পিতাকে “বাজান” বলে ডাকতাম) কি যেন বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আবার আসছে , পুনরায় নিয়ে যাচ্ছে হাতের উপর ধরে। প্রথমে কানাঘুষা শুনে বুঝতে পারি নি বাড়িতে কি ঘটছে। তবে সেকালের গ্রাম-পল্লীতে অন্ধকার রাতে এমনিতেই ভূতের ভয় পাওয়া ছিল খুব স্বাভাবিক। তাই প্রথমে গা ছমছম করছিল। একবার ভাবলাম, চোর-ডাকাতের কোন ঘটনা কি না। আবার কখনো ভুতুরে কল্পনাও করে চলেছি অবচেতন মনে। বড় কথা হঠাৎ নিদ্রা ভাঙ্গার পর কোন মানুষের চিন্তা-চেতনায় ধোয়াশা থাকে কিছুক্ষণ। সেজন্য সঠিক কিছু বুঝে উঠতে সময় লাগে। একটু পরে অবশ্য টের পেলাম , কোনো অতিথির জন্য খাবার নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ঘরের ভেতর থেকে বাইরে। গন্তব্য স্থান যে নৌকা তা একটু পরে বুঝলাম।খেয়াল করলাম বড় মা বসে আছে। আর ছোট মা ভাত তরকারী ইত্যাদি বাটিতে সাজিয়ে বাবার হাতে ধরিয়ে ও এগিয়ে দিচ্ছে নৌকায় নিয়ে যেতে। তবে বাবা-মার চোখ মুখের চেহারা দেখে জিঞ্জেস করতে সাহস হল না যে কাদের জন্য এসব বয়ে নিচ্ছে। কেননা পুরো ব্যাপারটায় কঠোর নিশব্দতা ও সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রাখা হচ্ছে বলে মনে হল। কোন সাড়া শব্দ যেন না হয় সেদিকে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। সে জন্য প্রথমে আমি কিছুটা হলেও অজান্তে মনের ভেতরে ভয় পেয়েছিলাম। তবুও গাঁ শিউড়ে উঠলো অজানা আশংকায়। যা তরুণ মন-মানসে হওয়ায় খুব স্বাভাবিক এই রকম পরিস্থিতিতে। ততক্ষণে ঘুম থেকে উঠে খালি গায়ে ধীর পায়ে নৌকার কাছাকাছি গেলাম। নৌকা হতে ঘর পর্যন্ত কয়েকজন জোয়ানকে বন্দুক কাঁধে সেন্ট্রির ন্যায় পাহাড়া দিতে দেখলাম। ঘাটে বাঁধা মাঝারি সাইজের গুদামের নৌকা। আকাশে সামান্য মেঘ ছিল। তাই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না নৌকার ভেতরে কারা বসে আছে। কয়েকজন জোয়ানকে বাড়ীর মধ্যে ঢুকতে ও বের হতে দেখে মনে হল তারা প্রাকৃতিক কাজ সারার জন্য এসে থাকতে পারে বা অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল কি না তা জানা যায় নি।
ইতোমধ্যে ভাত তরকারি নৌকায় দেবার পালা শেষ। জলের ধারে নৌকার গোলুয়ের সামনে দু’তিন জন দাঁড়িয়ে আমার পিতার সাথে কানাঘুষা করে কথা বলছেন। আমার স্মৃতিতে এখনো উজ্জল তাদের একজন আতাউর রহমান, অন্যজন আব্দুর রহমান এবং তৃতীয় ব্যক্তি মোবারক হোসেন। তাদের পরনে ছিল সেন্ডু গেঞ্জি, খাকি ফুল প্যান্ট , মাথা ও মুখ কাপড়ে বাধা। বেশ কয়েকজন জোয়ান যে নৌকার ভেতর বসে তা খেয়াল করলাম। ওরা সম্ভবত রাতের খাবার সংগ্রহ করেছে আমাদের বাড়ী থেকে ততক্ষণে তা আরো স্পষ্ট বোধগম্য হল। তবে এখানে তারা মনে হয় খাবার খায় নি। হয়তো অন্য কোথাও বা চলার পথে তারা খেয়ে নিবে। যারা গুদামের নিচে বসে তাদের হাতে আগেকার দিনের ছোট বড় ব্যাটারী লাইট চোখে পড়লো। মাঝে মাঝে তারা এদিক ওদিক আলো মারছে। তাদের পাশে রাখা দেশী বন্দুকগুলো নজর এড়ালো না। আরো কত রকম অস্ত্র তাদের সাথে ছিল তা জানা সম্ভব ছিল না। নৌকার সামনে ১ জন লগি দিয়ে ঠেলার কাজ করছে। আরেকজন পেছনে গুদামের ওপর বসে হাল ধরে আছে। এরপর নিশব্দে নৌকাটি ছেড়ে গেল। পাল তোলা মাস্তুলও চোখে পড়ল।
একেবারে শেষ অব্দি আমি নিশ্চিত উপলব্ধি করলাম, ওরা সবাই মুক্তি ফৌজ। আমার পিতা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রবল সপক্ষ এবং সমর্থক। বিশেষ করে বৈদ্যনাথপুরের আতাউর রহমান, তাড়াশের আ: রহমান ও মোবারক হোসেন তিন শীর্ষ নেতাই আমার মরহুম পিতা বয়েন উদ্দিন সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে বন্ধু প্রতিম ছিলেন। আতাউর মামাকে তো দীর্ঘ দিন আমার বাবার সাথে হাসি রহস্য করতে দেখেছি স্বাধীনতার পর, যখন তিনি আমাদের গ্রামে থেকে তাড়াশ হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। মামা আমার বাবাকে নানা বলে ডাকতেন। যাহোক ওই সখ্যতা,সুসম্পর্ক ও স্বাধীনতা যুদ্ধের একনিষ্ঠ সমর্থক বলেই হয়তো রাতের গভীরে এসব মুক্তিফৌজ খাবারের সন্ধানে ও সংগ্রহের লক্ষ্যে আমাদের বাড়ীতে এসেছিল। গভীর বর্ষামুখর রাত ও বড় ধরণের বন্যার জন্য আমাদের গ্রামের মানুষ কেউ জানতে পারেনি যে মুক্তিফৌজের দল ওই রাতে আমাদের বাসায় এসেছিল। তথাপি আমি ঘুমুতে যাবার আগে পিতা আমায় বললো, তুই যা দেখলি কাল সকালে বা কখনো কাউকে এব্যাপারে কিছু বলিস না যেন- সাবধান।
এরপর অবশিষ্ট রাত আমার চোখে তেমন আর ঘুম এলো না। মাথার মধ্যে কেবলি ঘুরপাক খাচ্ছিল মুক্তিফৌজদের যাযাবর জীবনের ছবি। যে জীবন তারা দেশ মাতৃকার জন্য উৎসর্গ করে আপন নিবাস ও পরিবাবর-পরিজন ত্যাগ করেছেন। জীবন বাজি রেখে রাতের ঘুম হারাম করে জনপদের নানা প্রান্তে অপরেশন করে চলেছেন। তাদের এই নিবেদন ও আত্মত্যাগ কত মহৎ, কত অনন্য। সে মুহুর্তে এ প্রত্যয়ও দৃঢ় হলো যে, আমার জনক যদিও তিনি আক্ষরিক অর্থে লেখা পড়া জানতেন না। তার জ্ঞান ভান্ডার ছিল প্রাকৃতিক জ্ঞান-প্রজ্ঞায় ভরপুর। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দেওয়া আমাদের একমাত্র মুক্তির উপায় যা বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন গোটা জাতির উদ্দেশ্যে। তাই তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সাধ্যমতো ভূমিকা রেখেছেন। প্রতিবেশী গ্রাম্য সেবকদের ও মাতবর-প্রধানদের সাথে কথা বার্তা ও আলাপ আলোচনায়ও তিনি স্বাধীনতার সপক্ষে যুক্তি তুুলে ধরতেন। আর রেডিওতে মুক্তিযুদ্ধের খবর শুনে তা নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করা ছিল তার নিত্যদিনের রুটিন। আমার আপন গর্ভধারীনিসহ দুজন মা ছিলেন। অর্থাৎ পিতার ছিল দুই বউ। এক পর্যায়ে তিনি পরিবারে ও প্রতিবেশীদের মধ্যে অনেকটা মত প্রকাশ করে ছাড়লেন যে, রাজ্জাককে মুক্তিফৌজে নাম লেখাতে হবে। এবং প্রয়োজনে বাড়ী থেকে চলে গিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়ে কাজ শুরু করতে হবে। তার গভীর অভিলাষ ছিল সেটাই। কেননা,মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়াকে তিনি বড়বেশী প্রয়োজন ছাড়াও মর্যাদা এবং গৌরবের বিষয় বলে মনে করতেন। যদিও দু:খজনক হল আমার দ্বারা তার সেই আশা পূরণ হয়নি যার জন্য তিনি আমৃত্যু আমাদের পরিবারের ও প্রতিবেশী লোকদের কাছে এ নিয়ে আফসোস ও অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন। আমার এক ছোট ভাই আজও গল্পচ্ছলে প্রসঙ্গক্রমে তা বলে থাকে।
পরে আমার ধারণা হল, যে রাতে আব্বা মুক্তি সেনাদের খাবার সরবরাহ করেন তখনই তাদের সাথে আলাপে এ প্রসঙ্গ আলোচিত হয়। ওই সময় আমি নতুন দশম শ্রেণীর ছাত্র। বয়স ১৪/১৫ হবে, তরুণ আর কি।। আর হাইস্কুল জীবন থেকেই আমি কিছুটা সাহিত্য-সাংস্কৃতিক মনা ছিলাম। অধিকন্তু ১৯৬৯-১৯৭০ সালের গণ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরী আমরা স্বচোক্ষে দেখেছি, পড়েছি, জেনেছি ও শুনেছি। বিশেষত: তাড়াশে স্বাধীনতার উত্তাল দিনগুলিতে তৎকালীন তাড়াশ কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে (আজকের তাড়াশ বাজার) যত জনসভা হয়েছে ও তদানীন্তন যেসব স্থানীয় এবং বহিরাগত বিখ্যাত-প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতৃবর্গ ভাষণ দিয়েছেন তা আমরা সশরীর উপস্থিত হয়ে প্রত্যক্ষ করেছি। আমাদের কাজই ছিল নাওয়া খাওয়া ভুলে সেই কর্মসূচীতে যোগ দেওয়া ও উপভোগ করা। কারণ একজন মাধ্যমিক শিক্ষার্থী হিসেবে লেখাপড়ার বাইরে আমার কোন কাজও ছিল না।তাই মনের অজান্তেই আমিও বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষন, স্বাধীনতার ডাক ও মুক্তিযুদ্ধের আহবানে মুগ্ধ হয়ে এর একান্ত দৃঢ় ভক্ত, অনুরক্ত ও সমর্থক বনে গিয়েছিলাম চেতনাগত দিক থেকেই। এমনি করে বর্ষাকালে মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকায় পিতা কর্তৃক ভাত-তরকারি সরবরাহ করে খাওয়ানোর সে স্মৃতি কখনই ভোলার নয়। দেশ স্বাধীনের পরে আমি আমার মায়েদের সাথে এ নিয়ে তাদের জীবনকালে বহুবার আলাপ করেছি। পাশাপাশি আমার পিতার প্রগতিশীল চেতনা ও আদর্শের স্মৃতি মন্থন করে বার বারই মুগ্ধ হয়েছি। তার জীবনের বড় যে দিক লক্ষ্য করেছি, তাহল – আমার পিতা অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মানুষ হওয়া সত্বেও ধর্মান্ধ ছিলেন না। যে কারণে তিনি সবসময় স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলেছেন ও কাজ করেছেন।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com