ভেজাল খাদ্য বিক্রি নিরব গণহত্যা নয় কি?

Spread the love

বাবুল হাসান বকুল

 

আমাদের ৫টি মৌলিক চাহিদার মধ্যে প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার খাদ্য। মানুষের খাদ্যের চাহিদা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আর বাঁকীসব চাহিদার কথা মানুষ ভুলে থাকে। কেননা খাদ্য আমাদের দেহে শক্তি যোগায় ও অন্য কাজ করার জন্য দেহকে প্রণোদিত করে। এমনকি খাদ্য জীবন ধারণের অন্যতম মূখ্য উপাদান। প্রাচীনকালের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, মানুষ বনে-বাদারে ঘুরে নিজেদের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করতো। আজ আমরা আধুনিক ব্যস্ততার যুগে এসে পৌছেছি। তাই খাদ্যের জন্য আমাদের সবাইকে একে অন্যের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অর্থনীতির এই যুগে খাদ্য তৈরীর অনেক কলকারখানা, হোটেল-রে¯েঁÍারা, ছোট বড় খুচরা পাইকারী দোকান এর সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলেও আজ টাকা দিলে আমরা সহজেই খাদ্য পাচ্ছি। টাকা দিলে আমরা খাদ্যের চাহিদা পূরণ করতে পারলেও সে খাদ্য দেহের জন্য কতটা উপকারী তা কি নিশ্চিত হতে পেরেছি। আজ আমরা সবাই কোন না কোন ভাবে অর্থ উপার্জনের জন্য উঠে পড়ে লেগেছি। অর্থ উপার্জন এর এই প্রতিযোগিতায় নেমে মানুষ খাদ্যে ভেজাল দিচ্ছে দ্বিগুন লাভের আশায়। আজ ভোক্তা হিসেবে আমাদের নিরাপদ খাদ্য, স্বাস্থ্য সম্মত খাবার পাওয়া যেন সোনার হরিণ প্রাপ্তির সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে আমরা ১৬ মার্চ ভোক্তা অধিকার দিবস পালন করে  আসছি। এই দিবসের  মাধ্যমে এটাই কি প্রমাণিত হয় না আমরা নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির অধিকার কতটা হারিয়ে ফেলেছি। অনেক পাঠক আমার কথা শুনে মুচকি হাঁসতে পারেন। তাদের বলতে চাই যে, অধিকারের জন্য সভা সমাবেশ করতে হয়, দিবস পালন করতে হয়, রাজপথে মিছিল করতে হয়। সে অধিকার কতটা আমরা পাচ্ছি তা দৃষ্টি দিলে বুঝবেন।

যেসব ব্যবসায়ী আর্থিক লাভের আশায় খাদ্যে ভেজাল দিচ্ছেন এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছেন তাদের প্রশ্ন করতে চাই। আপনারা অর্থ উপার্জন করছেন কেন? জবাবে বলবেন- ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য। আমি ও আমরা খাদ্য কিনে খাচ্ছি সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য। আপনারা আমাদের ভেজাল খাদ্য দিয়ে ভাবছেন নিজেরা নিরাপদ আছেন? কিন্তু বন্ধু তা কখনোই সম্ভব নয়। আপনি যেমন লাভের আশায় খাদ্যে ভেজাল দিচ্ছেন অন্য ব্যবসায়ীও আপনার মতো একই কাজ করছে। বলবেন, আপনাকে আমি অন্য ব্যবসায়ীর সাথে তুলনা করছি কেন? খেয়াল করুন বিক্রেতা হিসেবে আপনার একটি খাদ্যে ভেজাল দিচ্ছেন । অপরদিকে আপনার চাহিদার বাকি অন্য খাদ্যও অন্যের কাছ থেকে কিনে খাচ্ছেন বা নিচ্ছেন। আপনার মতো তারাও লাভের আশায় খাদ্যে ভেজাল দিচ্ছে। তাহলে ভেবে দেখুন আপনিও নিরাপদ খাদ্য পাচ্ছেন না।

আপনি যেমন বিক্রেতা তেমন  যুগপৎ আপনি একজন ভোক্তা। আমরা যখন ভোক্তা অধিকার ও স্বাস্থ্যের কথা বলছি ভাববেন আপনার কথাও বলছি। মনে রাখবেন, বিষ বিক্রি করে কখনও ঘি খাওয়া সম্ভব নয়। ভালো ঘি পেতে হলে আপনাকে আগে বিষ বিক্রি বন্ধ করতে হবে। বিশ্বের যেকোন দেশে যখন নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হয় আমরা তখন তাকে গণহত্যা বলি এবং ঐ হত্যাকারীদের শাস্তি চাই। খেয়াল করেছেন কি? আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত নিরব গণহত্যা চলছে। অনেকে বলবেন কীভাবে। আমি বলবো যেসব ব্যবসায়ী খাদ্যে ভেজাল দিচ্ছে এবং যা মানুষের শরীরের ক্ষতি করছে এবং মানুষ দিন দিন মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে তাহলে কি এটা নিরব গণহত্যা নয়। বন্দুকের গুলি বা অন্য কোন ধারালো অস্ত্রদ্বারা আঘাত করলে মানুষ মুহুর্তের মধ্যে মারা যায়। আর ভেজাল ক্ষতিকর খাদ্যে মানুষকে ধিরে ধিরে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাহলে এটা অবশ্যই গণহত্যা। খেয়াল করবেন দিন দিন  হাসপাতালে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। দেখবেন যেখানে সেখানে ঔষধের দোকান গড়ে উঠেছে। এ থেকে পরিস্কার বোঝা যায় ভেজাল খাদ্যের কারণে আমাদের দেশের মানুষ কতটা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং ঔষধের চাহিদাও বেড়েছে। পাঠক উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা ব্যস্ততার কারণে বাড়ীতে খাবার না খেয়ে হোটেলে খায় এবং তাদের দেশে নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় ঔষধের দোকান দেখা যায়। আর আমাদের দেশের ফার্মেসীগুলো গুনে শেষ করা সম্ভব নয়। আমাদের দেশে সকল মানুষ যদি নিয়মিত দুইমাস হোটেলের খাবার খায় তাহলে দেখবেন দেশের অনেক মানুষ রোগে আক্রান্ত হবে। কিন্তু বিদেশে সারা জীবন হোটেলের খাবার খেলেও তারা বড় ধরনের কোন রোগে আক্রান্ত হয় না। তাহলে এটা পরিস্কার আমাদের দেশে ভেজাল খাদ্য কতটা বেড়েছে। মানুষের মাংসের চাহিদা পূরণের জন্য যে ব্রয়লার পালন করা হচ্ছে তাতেও আজ ট্যানারির ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ যুক্ত চামড়ার টুকরো মুরগিকে খাওয়ানো হচ্ছে যা মানুষের দেহের জন্য ক্ষতিকর। মাংস বিক্রেতা ও মুরগি বিক্রেতারাও কম যাচ্ছেন না। অথচ উন্নত-সভ্য দেশে এটা কল্পনাও করা যায় না। ইংলন্ডে একবার হোটেলে পচা ডিম পাওয়ার কারণে সে দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল।

আরটিভির একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজধানীতে যেসব মুরগি যাচ্ছে তার মৃত মুরগিগুলো ফেলে দেওয়ার পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে খাদ্য হিসেবে। রাজধানী কারওয়ান বাজারে ২৫০টি মুরগির দোকান রয়েছে। সেখানে প্রতিদিন গড়ে ২টি করে মুরগি মারা গেলে কারওয়ান বাজারেই ৫০০টি মুরগি মারা যায়। রাজধানীতে মোট ২৫০০ মুরগির দোকান রয়েছে। গড়ে প্রতিদিন ঢাকা শহরে ৫০০০ মুরগি মারা যায়। এই মৃত মুরগিগুলো সিটি কর্পোরেশনের ডাস্টবিনে পড়ে থাকার কথা। কিন্তু সেখানে মুরগির অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। দেখা গেছে এই মুরগি গুলো রাজধানীর ছোট হোটেল থেকে উচ্চ বিলাসী রেস্টুরেন্টগুলোতেও চলে যাচ্ছে। এটা শুনে অনেকে ভাবতে পারেন, এটা শুধু রাজধানী ঢাকার ব্যাপার। কিন্তু বন্ধু আসলে এটা সারা দেশের ব্যাপার। রাজধানী ঢাকার মতো সারা দেশে এভাবেই মৃত মুরগি গরু কিংবা যেকোন মাংস বিক্রি হচ্ছে নিরবে। এটা ধর্ম ও মানবতার পরিপন্থী বটে।

আজ আমরা হাত বাড়ালেই ভেজাল খাদ্য পাচ্ছি। ভালো নিরাপদ খাদ্য পাওয়া যেন কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের নীতিনির্ধারক আইন প্রণেতা  এবং সকল পণ্যদ্রব্য বিক্রেতাদের বলতে চাই, মানুষ সুস্থ বা ভালো না থাকলে বড় বাড়ি  আর কোটি টাকার সুখ টিকে থাকবে না । আমি আপনি সবাই কোন না কোনভাবে ভোক্তা। আর ভোক্তা হিসেবে নিরাপদ খাদ্য পাওয়া আমাদের সকলের অধিকার। তাই লোভের বশবর্তী হয়ে অর্থ লাভের আশায় নিজের পায়ে নিজে কুড়াল না মারি। আর ভেজাল রোধে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার। একইসাথে ন্যায় বিচার ও যথাযথ জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। সম্প্রতি দেশী-বিদেশী কোম্পানীর পাস্তরিত দুধের ক্ষেত্রে মাননীয় হাইকোর্টের নির্দেশনা ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পরিশেষে বলতে চাই নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি ও নির্ভেজাল খাদ্য বিক্রয়ের জন্য আমাদের সবাইকে সচেতন এবং দায়িত্বশীল হতে হবে। তাহলেই সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, সিংড়া, নাটোর। মোবাইলঃ ০১৭১৬-৮৮৪১০৪

Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD