গাজী সৈয়দ শুকুর মাহমুদ,
মানব জাতির সৃষ্টিলগ্নে আদিতম ভাষা আরবী। এ ভাষা থেকে মানুষের বংশ বৃদ্ধি পেয়ে ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তরে। মানুষ বসবাসের অঞ্চল ভেদে সৃষ্টি হয়েছে মানুষের নতুন নতুন ভাষা। সে সূত্রে বাংলা ভাষাও অন্যতম একটি ভাষা। এ ভাষাটি কখন কবে থেকে সৃষ্টি হয়েছে তার কোন সঠিক নির্দেশনা না থাকলেও প্রায় দেড় হাজার বছর আগের সূত্র ধরে ভারত উপমহাদেশের শাসক স¤্রাট বাবর ভাষাটির বর্ষ পুঞ্জিকা সৃষ্টি করেছেন। তখন থেকে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব পৃথিবীতে স্থান পায়। বর্ষ পুঞ্জিকার সূত্র ধরে বৈশাখ মাসের ১ম তারিখ বাংলা নব বর্ষ। আমরা বাঙালি জাতি। আমাদের জাতীয় ভাষা বাংলা। যে সকল এলাকায় যে সব ভাষার সৃষ্টি হয়েছে সে সব ভাষার সূত্র ধরেই সৃষ্টি হয়েছে ভাষার জাতি। পরবর্তীকালে আরব দেশ বা আরবি ভাষাভাষির মানুষ যখন অন্যান্য অঞ্চলে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছে তাদের ভাষাও বদলে গিয়ে হয়েছে নতুন নতুন ভাষা। তারই সূত্র ধরে আমাদের বাংলা ভাষা আরবি ভাষার পরেই প্রাচীনতম বাংলা ভাষা। বর্তমানে যে সকল ভাষা রয়েছে তার মধ্যে বাংলা ভাষা অন্যতম। তবে সৃষ্টিকাল থেকে এ ভাষার উল্লেখযোগ্য কোন নামকরণ ছিল না। এ অঞ্চলের মানুষ ছিল অত্যন্ত সাদাসিদে, সরল মনের মানুষ। এক সময়ে পারসীয়রা নৌপথে এদেশে এসে সাদাসিদে মানুষদের উপর রাজত্ব করতে শুরু করে। তারা এ দেশের মানুষদের বোঙ্গা বলে ডাকত। সে সূত্রে এদের ভাষার নামকরণ করা হয় বোঙ্গালা ভাষা। তখন এ ভাষার কোন বর্ণমালা বা অক্ষর ছিল না। এরও অনেক পর দক্ষিণ আরব থেকে দ্রাবিড় জাতির আগমন ঘটে। এদেশে তারা কিছু শিলালিপি এনেছিল। সে সকল শিলালিপি কখন কোন সময়ে কে কি প্রয়োজনে পাথরে খোদাই করেছিল তার কোন সূত্র পাওয়া যায়নি। পাথরে খোদাইকৃত নকশাগুলোকে বাংলা বর্ণমালা হিসেবে পরিচয় করানো হয়। সেই থেকে বাংলা ভাষার বর্ণমালা সৃষ্টি হয়েছে। গোড়ার দিকে অপরিশুদ্ধ বা দূর্বল থাকলেও ধীরে ধীরে এ ভাষাটি পরিশুদ্ধ হয়ে উঠে। তখন থেকে এ ভাষার প্রথমে নামকরণ করা হয় বোঙ্গালা, বাঙ্গালা, বঙ্গ পরিশেষে বাংলা ভাষা। বাংলা ভাষাভাষি মানুষেরা বাঙালি জাতি। বাংলা ভাষার বসতি স্থান বাংলা, বর্তমানে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের বাসিন্দা। উল্লেখ্য বাঙালি জাতি পৃথিবীর অন্যান্য জাতির মত ধূর্ত চালাক বা ঠকবাজ ছিল না। এরা সাদাসিদে জীবন যাপন করত। এ অঞ্চলটি উর্বরা, সুজলা-সুফলা, পাহাড়ী ঝর্ণা ও নদ-নদী, খাল-বিলে বেষ্টিত। যে কারণে এ অঞ্চলটিতে বছরে দু’মাস পর পর ঋতু বদলায়। দেশটিকে বলা হয় ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। বাংলা ভাষাভাষি ও বাঙালি জাতি সাড়া বছরের ব্যবসায়িক হিসেব নিকেশ চুকে নিত ৩০শে চৈত্রে। তখন থেকে ৩০শে চৈত্রকে হালখাতা দিবস বলা হত। পহেলা বৈশাখে নতুন উদ্যোমে নতুন খাতা খুলে পুনরায় ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করা হয়েছে।
আমাদের ছোটবেলায় বন্ধুদের সাথে তামাশা বশতঃ বলা হতো এক বছরের ভাত অন্য বছরে খেতে পারবে কী? তখন অন্য বন্ধু বিভ্রান্ত হয়েছে। বিভ্রান্তির সমাধানের জন্য বলা হতো গতকাল ছিল অন্য একটি বছর আজকে আর একটি বছর। গতকালের ভাত পানি ভাত করে রেখে আজকে খেয়েছি। এটাই ছিল তখনকার সময়ে পান্তা প্রচলন। আজকে বাঙালি সংস্কৃতিতে নববর্ষের উৎসবের শ্রেষ্ঠ অংশ হয়েছে পহেলা বৈশাখে পান্তা খাওয়া। তাও আবার মাটির থালায় বটমুলে বসে। সারা বছর যারা ইউরোপীয়ান পোশাক প্যান্ট শার্ট গেঞ্জি পড়ে থাকেন এবং বাঙালি নারীরাও সারা বছর স্যালোয়ার, কামিজ, ওড়না পড়ে থাকে তারাও ঐ দিন শাড়ী পড়ে বাঙালি সাজে এবং পুরুষেরাা লুঙ্গি পড়ে গামছা মাথায় দিয়ে পান্তা খাওয়ার নাটক করে। এটি বাঙালি জাতির উৎসবে পরিণত হয়েছে। এতে মনে হয়ে বিশ্ববাসিকে দেখানো হচ্ছে এই দেশে বাঙালি নামক একটি জাতি ছিল যা বহুবছর আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। তাদের সংস্কৃতি ছিল পানি ভাত খাওয়া, লুঙ্গি পড়া আর গামছা কাধে নিয়ে চলা। শুধু পহেলা বৈশাখে বাঙালি না সেজে সাড়া বছর বাঙালি হতে শিখি।
আসুন, আমরা বাঙালি জাতিকে উচ্চ আসনে বসাতে শিখি। এসকল আদিতম কাল্পনিক সংস্কৃতি থেকে আধুনিক সংস্কৃতির চর্চা করে বাঙালি জাতিকে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দার করাই।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট ,শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com