উপমহাদেশের অবিস্মরণীয় সংগ্রামী জননেতা এম সেরাজুল হক

Spread the love

এম. রহমত উল্লাহ্

“লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান”। যুদ্ধ করেই পাকিস্তান আদায় করা হবে। চলনবিল অঞ্চলে স্বাধীনতা সংগ্রামের বার্তা বাহক-মাওলানা সেরাজুল হক তাড়াশের মোরশেদগুনা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। পরবর্তি সময়ে তাঁর নামেই তাঁর জন্মভূমির(গ্রামের) নাম রাখা হয় সেরাজপুর। বর্তমানে এই নামেই গ্রামটি পরিচিত। বৃটিশ ভারতের অন্ধকারাচ্ছন্ন চলনবিলের এক অজ পল্লীতে ১৯০৩ সালের ১লা নভেম্বর এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে সেরাজুল হকের জন্ম। তাঁর পিতার নাম মরহুম মেছের শেখ মাতার নাম মরহুমা সবজাহান নেছা। তিনি ১৯৬৩ সনের ১৫ নভেম্বর নিজ বাড়ীতে ইন্তেকাল করেন। তাড়াশ সদরের অদূরে ভাদাস কবরস্থানে ছায়া ঘেরা মায়া ভরা সুশীতল কবরে শায়িত রয়েছেন। তার বিশাল কর্মময় জীবনে  একসময় মাধাইনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। শিশুকালে তাঁর পিতা তাঁর অশেষ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পান। নিজ সন্তানের প্রতিভার প্রতি লক্ষ্য রেখে নামকরণ করেন চেরাগ আলী। চেরাগ শব্দের অর্থ আলো। সেরাজুল হক নাম ছাড়া কখনও কেউ কেউ তাকে  চেরাগ আলী বলেও ডাকতো। সেরাজুল হক যে একদিন চেয়ারে বসার উপযুক্ত সম্মানীয় হবেন  বা জাতির উচ্চ স্থানে সমাসীন হবেন সে আশাই ছিল তাঁর। এ জন্য তাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করেছিলেন। কিন্তু তার দাপুটে মনোভাব তাকে শান্তভাবে  শিক্ষা লাভ করতে দেয় নাই। চারি পাশে সমাজের মানুষের দুরাবস্থা জমিদারদের অন্যায় আচরণ তাকে প্রতিবাদী করে তোল্।ে সিরাজগঞ্জের ইসমাইল হোসেন সিরাজী ,বরাত আলী মিয়া ও রায়গঞ্জের আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ প্রভৃতি বড় মাপের রাজনৈতিক নেতাদের সংস্পর্শে এসে তিনি রাজনৈতিক ডামাডোলে মেতে ওঠেন । ফলে তার শিক্ষা জীবন মাঝ পথেই থেমে যায়। একবার জমিদারদের ঝোলন মেলায় যাত্রা গানের আসরে নামাজ পড়াকে বিকৃত করে কৌতুক (জোকিং) দেওয়ার সময় কতিপয় যুবককে সঙ্গে নিয়ে গানের আসরে হৈহুল্লোড় বাধিয়ে দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ করেন। তাঁর এহেন কাজের ফলে যাত্রা দল পালিয়ে যায় এবং জমিদারদের মাস ব্যাপী ঝোলন মেলা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। এলাকার সাধারণ মানুষ তাকে বাহবা দিয়ে মাথায় তুলে নেয়। এরপর সলঙ্গা বিদ্রোহের সময় রায়টের নেতৃত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ হক সাহেব উপাধি প্রাপ্ত হন। এরপর থেকে তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নাই। যেখানেই গেছেন হক সাহেব এসেছেন বলে লোক সমাগম বেড়ে যেতো আর তাকে ঘিরে অনুষ্ঠানদি চাঙ্গা হয়ে উঠতো। এরপর  তিনি কলিকাতার আজাদী পত্রিকায় লিখতে শুরু করেন। কবি নজরুলের লাঙ্গল পত্রিকায়ও লিখতেন। শুধু তাই নয় নজরুলের আহবানে সাড়া দিয়ে লাঙ্গল পতিকোর সহ-সম্পাদক হিসেবে কিছুকাল তিনি কাজ করেছেন। হক সাহেব বাংলার ৬১/৬২ সনের বন্যার খবর পত্রপত্রিকায় সংবাদ-নিবন্ধ লিখে প্রচার করেন। এতে তার পরিচিতি,সাহস ও পেরণা অনেক গুন বেড়ে যায়। শেরে বাংলা ফজলুল হকের ঋণ শালিশী বোর্ডের চাচকৈড় কৃষক প্রজা সম্মেলনের আয়োজকদের প্রথম কাতারে থেকে স্বেচ্ছা সেবক হিসেবে সমগ্র চলনবিল অঞ্চলে গণসংযোগ করে মানুষের মাঝে আরও পরিচিতি লাভ করেন । এবং চলনবিলের তর্কবাগীশের সঙ্গে তার  ঘনিষ্ঠ সখ্যতা গড়ে ওঠে। এ সময় তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে মেতে ওঠেন। পাকিস্তান ১৯৪৭ সনে ১৪ই আগষ্ট প্রতিষ্ঠা লাভ করলে চলনবিল অঞ্চলের একনিষ্ঠ নেতা হিসেবে জনগনের কাছে পরিচিতি  ও খ্যাতি লাভ করেন। মাথায় টুপি,  আলখাল্লা পাঞ্জাবী, পরনে লুঙ্গি, মুখে সুন্দর লম্বা দাঁড়ী সবার কাছেই একজন আদরের সম্মানের পাত্র হয়ে ওঠেন। লেখালেখির জগতেও তার প্রথম সারির স্থান লক্ষ্য করা যায়। তার রচিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- পাকিস্তানী গজলগীতি, সিরাজী চরিত, অমর জীবন কাহিনী ইত্যাদি। এছাড়াও অনেক অপ্রকাশিত গ্রন্থও রয়েছে। সেগুলোর অধিকাংশ পান্ডুলিপি এখন মনে হয় উদ্ধার করা দুরূহ হবে।সেকালে অসংখ্য  পত্রপত্রিকায়  তার  বিচিত্র ধরনের লেখা প্রকাশিত হয়। অন্ধকার চলনবিলের আলোকবর্তিকা সেরাজুল হক দেশ ও দেশের মানুষের জন্য এক স্মরণীয় বরণীয় ব্যক্তিত্ব। চলনবিলে তার মত এত বড় রাজনীতিক, লেখক ও সমাজসেবক আজো দেখা যায় না। তার লেখা বাংলা সাহিত্যের অমর গ্রন্থ “সিরাজী চরিত”  একদা বিশ^বিদ্যালয়ের পাঠ্য বইরুপে গৃহীত হয়েছিল। এই বই লেখা হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিদ্রোহী কবি, সাহিত্যিক ও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্ব ইসমাইল হোসেন শিরাজীর জীবনী কেন্দ্র করে। বিশেষ উল্লেখ্য, এই অমূল্য গ্রন্থ গবেষণা করে  উল্লাপাড়া উপজেলাধীন স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ভূতপূর্ব অধ্যাপক গোলাম সাকলায়েন ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। তবে দু:খের বিষয়, চলনবিল তথা তাড়াশবাসী এই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের স্বরণে ও সম্মানে বলা যায় কিছুই করে নাই। এমনকি কোন স্মারক নাম চিনহ পর্যন্ত নাই। আমরা  সমাজের গুণীজনকে কদর না করলে এখনকার গুণীদের কদর দেখাবার কেউ থাকবে না আগামীতে।   আজ ১৫ নভেম্বর  এই কীর্তিমান বাঙ্গালীর ৫৬তম  মৃত্যু দিবসে তাঁর বিদায়ী আত্মার মঙ্গল কামনা করছি।

লেখক: সম্পাদকমন্ডলীর সভাপিতি, সাপ্তাহিক চলনবিল বার্তা।

Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD