যেভাবে আমার দেখা চলনবিল

Spread the love

গাজী সৈয়দ শুকুর মাহমুদ

 

“লাউ তরকারি কদুলি, গৃহিনী ভালো গাধুলি। টাকার অর্ধেক আধুলি, বৈদ্যের ধোকা মাদুলি। ইছামতি আখের গুড়, যমুনার চরে ডাল মশুর। রাজশাহীর ফজলী আম, টাংগাইলের কালো জাম। পান ভালো তাহেরপুর, বানেশ্বরের পাটালীগুড়। দর্শনায় খেজুর গুড়, দৌলতপুরের চানাচুর। পোড়াবাড়ির চমচম, যশোরের কৈ, চাটমহরের বিন্দিমরিচ, বগুড়ার দই। বানেশ্বরের হলুদ ভালো টাংগাইলের শাড়ি, শাহজাদপুরের তাঁতের কাপড় পছন্দ সকল নারীর। মধুপুরের আনারস, কাঁঠাল ময়মনসিহে, যশোর জেলার সবজি ভালো, শেরপুরের ঝিঙ্গে। শাহজাদপুরে দুগ্ধ বেশী মিল্কভিটার ঘি, জয়সাগরের মাছে স্বাদে তুলনা হয় কি? শ্রেষ্ঠ বলদ কৈজুরী, পাত্রী ভালো জামিরতা-গুধিবাড়ি। রসুন চাষ চলনবিলে, পেঁয়াজ বেশি বেড়ায় মিলে। মীর কাদিমের কলা ভাল দিনাজপুরের চিকন চাল, বরিশালের সুপারি ভাল, তাড়াশের মিস্টি তাল। নাটোরের কাঁচা গোল্লা, নোয়াখালির কাঠমোল্লা। খুলনার নারিকেল, পাকশির বেল, কুষ্টিয়ায় তামাক চাষ, প্রশাসন ফেল। দিনাজপুরের লিচু ভাল, বিশাল শিব তালম, গাঁয়ের সেরা  কলম আর বিলের সেরা চলন।”

 

শোলক বলা ময়দান চাচার কাছে এসকল শ্রেষ্ঠত্বের গল্প শুনে কলম গাঁ আর চলনবিল দেখতে বাসনা জাগলো। শ্রাবণের শেষ দিকে অথবা ভর ভাদ্র মাসে বর্ষার পানিতে এলাকার গ্রামগুলো ভাসছে। আমন ধানের জমি থেকে সবুজের রং ছড়াচ্ছে। পাটকাটা ফসলি জমিগুলোতে শাপলা শালুক শেওলা আর জলজ উদ্ভিদে ভরে আছে। মাঝে মধ্যে পাটকাটা জামিতে পানি চক চক করছে। ভাদ্র মাসের দীপ্ত সূর্যের আলো দূরের গ্রামগুলো সোনালী আলোয় জ্বল জ্বল করছিল। দুর-দুরান্তের গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ডিঙ্গি নৌকা, মাঝারি নাও আর বড় বড় মহাজনী নৌকাগুলি ধবল পাখা মেলে পাল উড়িয়ে যাচ্ছে যার যার গন্তব্যে। নানা রং-বেরং এর কাপড় দিয়ে তৈরি বাদাম। তখন এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামের দুরত্ব ছিলো অনেক। গ্রামগুলোর মাঝে ফসলি মাঠ ছিলো বিশাল, যেন তেপান্তরের মাঠ। মাঝখানে ফসলি মাঠ আর বিল, বাওর, নদী-খালের উপর দিয়ে পাল উড়ানো নৌকা, আহ্ কি সুন্দর লাগতো! এতো সৌন্দর্য দেখেও মন ভরছিলো না তখনও। তারুণ্যে ভরা দেহ মন, যৌবনের টগবগানি, উরু উরু মন চায় শুধু উড়াল দিতে। চায় পাখির মত ডানা ঝাপটা দিয়ে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে। শোলক বলা ময়দান চাচার কাছে কলম গাঁও আর চলনবিলের সৌন্দর্যের কথা শুনে আমরা ক’বন্ধু যুক্তি করলাম কলম  গাঁও আর চলনবিল দেখবো।

 

পাকিস্তান শাসনের শেষ দিকে ১৯৬৮ সাল।  পঞ্জিকার নিয়মে বর্ষাকালের শেষ দিক হলেও চারিদিকে পানি আর পানি থৈ থৈ করছে। আমরা ক’বন্ধু ঘাটের মাঝারি ডিঙ্গী নৌকা নিলাম। নায়ের মাঝখানে ছৈ বানিয়ে প্রয়োজনীয় কাথা বালিশ বিছানা পত্র নিলাম। চাল-ডাল, হাড়ি-পাতিল, সবজি, শুকনো খড়ি নিলাম। বড় ভাই একটা কানোজ টিন কেটে অস্থায়ী চুলো বানিয়ে দিলেন। মায়েরা কিছু শুকনো খাবারও দিলেন। সে সময়ে নিরাপদ বিশুদ্ধ পানি পানের যথাযথ ব্যবস্থা ছিলো না। কুপ থেকে পানি তুলে মাটির কলসে দিলেন আর বললেন নদীর পানি খেওনা। পানি শেষ হলে কোন ঘাটে নৌকা ভিড়ায়ে পানি চেয়ে নিও।

 

সেদিন ছিলো মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। পুবালী বাতাস বইছিলো। দুপুরের আগেই নিজ গ্রাম চর-বেলতৈল এর ঘাট থেকে নৌকা ছেড়ে দিয়ে পাল তুলে দিলাম। খাল-বিল, নদী-নালা আর ফসলী মাঠ বর্ষার পানিতে একাকার হয়ে গেছে। বাড়ি থেকে আমাদের গন্তব্য পশ্চিম দিকে। গ্রাম থেকে পূর্ব দিকে উত্তাল তরঙ্গবাহি খরস্রোতা সর্বগ্রাসী যমুনা নদী। এদিকে আমরা অতিক্রম করছি এক সময়ের তাকব্বরী বহনকারী মরা হুড়াসাগর নদী। ডানে বামে কোনাই নদী- সোনাই বিল। সামনে ফরিদপাঙ্গাসী ধুলাউড়ি, নারুয়া অতিক্রম করে করতোয়া নদী পাড়ি দিলাম। সামনে শাহজাদপুরের খোনকারের জোলা। নায়ের পাল নামিয়ে দিয়ে দাঁড়ের বৈঠা বেয়ে খোনকারের জোলা পাড়ি দিয়ে পুনরায় পাল তুলে দিলাম। ডানে বাড়াবিল বামে কাকিলামারি। রাউতারা-পোতাজিয়া কোথায় তার কোন হিসেব নেই। রেশমবাড়ী-ভাইমারা গ্রাম ডানে রেখে চলছি সামনের দিকে। সামনে শুধু ধু-ধু পাথার কোন গ্রাম দেখা যায় না। বন্ধুরা কেউ কেউ ভয়ে আতঙ্কিত পাাথারের রূপ দর্শনে। আমিও ততোটা সাহসী নই। তবুও সাহসিকতার অভিনয় দেখিয়ে ওদের সাহস দিলাম। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। পাথারের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া বলেশ্বর, ধলেশ্বর আর গোহালা নদী বর্ষার পানিতে একাকার হয়ে গেছে। বোঝার উপায় নেই কোনটা নদী আর কোনটা পাথারের গোচারণ ভূমি। ধু-ধু পাথার হলেও অসংখ্য পাল উড়ানো নৌকা দেখে ভালো লাগছে। পাথারের মাঝ পথে একটি বাড়ি দেখা যাচ্ছিলো। আগেই শুনেছিলাম বাড়িটির নাম খাদিওয়ালার বাড়ি।

 

বড় ভাই বলেছিলেন, ঐ বাড়ি থেকে অনেক দুর দিয়ে যেতে। বাড়িটি জলদস্যূ (মহিলা ডাকাতের বাড়ি)। আল্লাহকে ভরসা করে কোন বিপদ আপদ ছাড়াই পাথার পাড়ি দিলাম। সামনে বিলচান্দক গ্রামের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছি। এদিকে পশ্চিম আকাশের সূর্য গোধুলি অতিক্রম করছে, সন্ধ্যা আগত। ততক্ষণে দিঘুলিয়া গ্রামের পাশ দিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ এক বৃদ্ধ ডাক দিলেন এই…পাল উড়ানো নায়ের লোকেরা তোমাদের বাড়ি কোথায়? এই অবেলায় কোথায় যাবে? বাদাম নামিয়ে দাও দু’টো কথা শুনে যাও। বৃদ্ধের ডাক শুনে আমাদের কেউ কেউ বলল ডাকাত না তো! কি বা মতলব বৃদ্ধের। বন্ধুদের বললাম, মতলব যাই হোক ডাকাত হবে না। কারণ ডাকতেরা কখনই নিজ বাড়ি থেকে ডাকাতি করে না। কথায় বলে ডাকাতের ঘাটে নাও দিয়েছি ক্ষতি হবে না। নায়ের পাল নামিয়ে তার ঘাটে নিসংকোচে নাও ভিড়িয়ে দিলাম। বৃদ্ধ আমাদের পরিচয় ও যাবার উদ্দেশ্য জেনে নিলেন। তিনি বললেন, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, সামনে নাগডেমরা গ্রাম। ঐ গ্রামের নিশি পাড়ার লোকেরা ভালো না, ওরা তোমাদের ক্ষতি করবে। আজ রাত আমার ঘাটেই থেকে যাও। তার ঘাটে আমাদের নাও বেধে ফেললাম। বৃদ্ধের সাথে কথা বলতে বলতে বাড়ির ভিতর থেকে একজন বৃদ্ধা এগিয়ে এসে বললেন, কোন গায়ের ছেলে, কোন দ্যাশে থাইকা আইলারে বাবা? উত্তর দিলাম, আমরা পুব দেশের মানুষ, গায়ের নাম চর-বেলতৈল। আমাদের কথা শুনে বৃদ্ধা কেঁদে ফেললেন। তিনি বললেন, আমার বাবার দ্যাশের মানুষ তোরা, আজ রাত আমার এহানেই খাবি, আমার ঘাটেই থাকবি। কতকাল বাবার দ্যাশের মানুষের মুখ দেহিনা। সে রাত তার আতিথেয়তা রক্ষা করে ওখানেই রাত কাটিয়ে দিলাম। পরদিন ভোর বেলায়ই আমাদের খাবার তৈরি করে বৃদ্ধা ডাকছে, বাবারা হকাল বেলা দু’মুটো খেয়েই যাও। সকালের খাবার খেয়ে নৌকা ছেড়ে দিলাম। পুনরায় পাল উড়িয়ে গন্তব্যের দিকে যাচ্ছি। বড়াল নদী পেরিয়ে আত্রাই নদীর মাঝ দিয়ে উজান পথে পাল উড়িয়ে যাচ্ছি। নদীর দু’পাশের গ্রামগুলোর বানের জলে ভাসছে।

 

যেতে যেতে এক সময় পৌছে গেলাম কাঙ্খিত কলম গাঁয়ে যা রাজশাহী বৃহত্তর জেলার সিংড়া থানায় অবস্থিত। শোলকবলা ময়দান চাচার গল্পে শুনেছি ‘গায়ের শ্রেষ্ঠ কলম’ অথচ বাস্তবে এসে শ্রেষ্ঠ গায়ের শ্রেষ্ঠত্ব খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আত্রাই নদীর পাড় ঘেঁষে বিশাল লম্বা একটি গাঁ। হয়তোবা রাজশাহী বিভাগের মধ্যে এতোবড় লম্বা গাঁ আর কোথাও নেই। ঐ গাঁয়ে বিচ্ছিন্নভাবে হেথায় হোথায় দু’একটি করে কৃষি বাড়ি। পুরো গ্রামটি বাঁশ বাগানে বেষ্টিত। গাঁয়ে তেমন কোন ফল ফলাদির গাছ নেই, শুধু বাঁশ আর বাঁশ। সারাদিন গাঁ’টি ঘুরে ঘুরে  দেখলাম। ওখানেই রাত্রিযাপন করে পরদিন চলনবিলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। এবারে আর পাল উড়িয়ে নয় নদীর স্রােতে নৌকা ভাটা দিয়ে দ্বারের বৈঠা বেয়ে পূর্বমূখি আসতে লাগলাম। একসময় চলনবিলে প্রবেশ করলাম। বিলের মাঝে ঢুকেই দেখলাম পাথার অঞ্চলের মতই দেখতে। বিলের দৃশ্য শুধু পানি আর পানি। বিভিন্ন দিকে নৌকা যাতায়াত করছে। আর মৎস্য জীবিদের মাছধরা নায়ের সমাহার। ভাদ্র মাসের রৌদ্রে বিলের পানি স্বর্ণে রূপান্তরিত হয়েছে। মনে হচ্ছে দূরের গ্রামগুলো সোনার জলে ভাসছে। মাঝে মধ্যে কচুরি পানা আর কোথাও কোথাও শাপলা শালুক। মাছ শিকারি পাখিরা আশ্রয় নিয়েছে শাপলা পাতার উপর। ধিরে ধিরে এসে পৌছিলাম চলনবিলের একপ্রান্তে। নাও ভিড়িয়ে দিলাম তাড়াশ বাজারের ঘাটে। সকলেই নৌকা বেয়ে ক্লান্ত। দুপুর গড়িয়ে বিকেল প্রায়। আমাদের খাবার রান্নার সুযোগ হয়নি। মায়েদের দেয়া শুকনো খাবার খেয়ে পানি পান করে শুধু নৌকা বাইতেই ব্যস্ত ছিলাম। ক্ষুধায় পেট জ্বলছে। তাড়াশের বাজারে নেমে খুঁজলাম কোন খাবার পাওয়া যায় কি না? আমাদের দুর্ভাগ্য, তাড়াশ একটি থানা শহর হলেও বাজারে একটি খাবারে দোকানও পাইনি।

 

চলনবিল এলাকার মানুষের মানবেতর জনজীবন দেখলাম। এলাকার মানুষগুলো কৃষিতে নিরর্ভশীল আর মৎস্য আহরণ করা তারে পেশা। এলাকায় কোন রাস্তা ঘাট ছিলো না। জোলা-খাল-হালট দিয়ে শুকনো মৌসুমে চলতো গরু/মহিষের গাড়ি আর  বর্ষা মৌসুমে চলতো নৌকা। তখনকার সময়ে কোন যানবাহন চলাচলের উপযোগী ভালো কোন রাস্তা ছিল না। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি উচ্চ বিদ্যালয় ব্যতিত ভালো কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখা যায়নি। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোও ছিল খুবই অনুন্নত। সেগুলোও জাতীয় প্রতিষ্ঠান হওয়ায় ব্যক্তি উদ্যোগে কেউ তার মেরামত ও পরিচর্যায় এগিয়ে আসেনি। ফলে অনেক বিদ্যালয়রই ছাউনি উড়ে গিয়ে বেহাল দশা দেখেছে। বিদ্যালয়গুলোতে যথাযথ ছাত্র-ছাত্রী উপস্থিতি নেই। তৎকালিন সময়ে বৃহত্তর পাবনা জেলার কোন সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারি অপরাধি প্রমাণিত হলে শাস্তিস্বরূপ তাকে বদলি করা হতো তাড়াশে। এ ছিল সে সময়ের চলনবিল এলাকার জীবনযাত্রা। সম্প্রতি অর্ধশত বছর পরে দেখলাম চলনবিল এলাকার পুরা রূপটাই বদলে গেছে। দেশের উন্নয়নের সাথে প্রতিযোগিতা করে শহরে অসংখ্য ভবন আধুনিক রূপে রূপান্তরিত হয়েছে। গড়ে উঠেছে বিভিন্ন এলাকায়, পাড়া, মহল্লায় আধুনিক মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাড়াশের যোগাযোগ ব্যবস্থা আর শহরের উন্নয়ন হলেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি তাড়াশবাসি সাধারণ মানুষের গায়ে। এই ছিল যেভাবে আমার দেখা চলনবিল।

Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD