একটিমাত্র আয়াত বদলে দিতে পারে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র

Spread the love
 মুফতি খোন্দকার আমিনুল আবদুল্লাহ (হাফিযা হুল্লাহ)
একটি জাতির উত্থান কিংবা পতন কেবল তার অর্থনীতি, সামরিক শক্তি বা প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে তার নৈতিক ভিত্তি কতটা সুদৃঢ় তার ওপর। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে জাতি ন্যায়বিচার হারায়, সে ধীরে ধীরে তার বিবেক হারায়; আর যে সমাজ অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়, সেখানে একদিন সত্যের কণ্ঠস্বরও স্তব্ধ হয়ে যায়।
এই বাস্তবতার মাঝেই পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত যুগে যুগে মানবজাতির জন্য আলোর দিশারি হয়ে আছে। ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, সূরা আন-নাহলের ৯০ নম্বর আয়াত কেবল একটি নির্দেশ নয়; এটি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার এক পূর্ণাঙ্গ নৈতিক সনদ।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ এবং আত্মীয়স্বজনকে তাদের প্রাপ্য প্রদান করার নির্দেশ দেন। আর তিনি অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।”
— (সূরা আন-নাহল, ১৬:৯০)
মাত্র একটি আয়াত। অথচ এই একটি আয়াতের মধ্যেই এমন এক জীবনদর্শন নিহিত রয়েছে, যা অনুসরণ করলে ব্যক্তি গড়ে ওঠে, পরিবার সুসংহত হয়, সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্র ন্যায়ভিত্তিক রূপ লাভ করে।
আজ আমরা যে দুর্নীতি, বৈষম্য, পারিবারিক ভাঙন, সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক সংঘাত এবং নৈতিক সংকটের মুখোমুখি—তার অধিকাংশের মূল সমাধান এই আয়াতের শিক্ষার মধ্যেই নিহিত।
ন্যায়বিচার—সভ্যতার প্রথম ভিত্তি
আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম ন্যায়বিচারের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ ন্যায়বিচারই একটি সভ্য সমাজের প্রাণ। যেখানে বিচার বিকৃত হয়, সেখানে মানুষের আস্থা নষ্ট হয়; আর যেখানে আস্থা নষ্ট হয়, সেখানে শান্তি কখনো স্থায়ী হতে পারে না।
আজ আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলি, কিন্তু নিজের স্বার্থের প্রশ্নে অনেক সময় ন্যায়ের পথ থেকে সরে যাই। আমরা দুর্নীতিকে ঘৃণা করি, অথচ নিজের সুবিধার জন্য নিয়ম ভাঙতে দ্বিধা করি না। অন্যের ভুল সহজেই চোখে পড়ে, কিন্তু নিজের ভুলকে নানা যুক্তিতে বৈধ প্রমাণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। এই আত্মপ্রবঞ্চনাই একটি সমাজকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা আরও ঘোষণা করেছেন—
“কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করতে প্ররোচিত না করে। ন্যায়বিচার করো; এটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।”
— (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৮)
এ আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয়—ন্যায়বিচারের পাল্লা কখনো ব্যক্তি, দল, আত্মীয়তা কিংবা ক্ষমতার প্রভাবে ঝুঁকে পড়তে পারে না।
ইহসান—মানুষের হৃদয় জয়ের শিক্ষা
ন্যায়বিচারের পর আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন ইহসান বা সদাচরণের।
ন্যায় মানুষকে তার অধিকার দেয়, কিন্তু ইহসান মানুষের হৃদয় জয় করে। ন্যায় সমাজকে টিকিয়ে রাখে, আর ইহসান সমাজকে ভালোবাসায় আবদ্ধ করে।
একটি সমাজে যখন দয়া, ক্ষমাশীলতা, সহমর্মিতা, বিনয় এবং মানবিকতা বৃদ্ধি পায়, তখন বিদ্বেষ কমে, বিভেদ দূর হয় এবং সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে ওঠে।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যার চরিত্র সর্বোত্তম।”
— (সহিহ আল-বুখারি, কিতাবুল আদব)
দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ শিক্ষার হার বাড়লেও উত্তম চরিত্রের চর্চা অনেক ক্ষেত্রেই কমে যাচ্ছে। অথচ চরিত্রহীন জ্ঞান সমাজকে আলোকিত করতে পারে না।
আত্মীয়তার বন্ধন—একটি শক্তিশালী সমাজের ভিত্তি
এই আয়াতে আত্মীয়স্বজনের হক আদায়ের নির্দেশও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে।
আজকের ব্যস্ত জীবনে অনেকেই আত্মীয়তার সম্পর্ককে গুরুত্বহীন মনে করেন। কিন্তু ইসলাম আত্মীয়তার বন্ধনকে ইবাদতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কারণ পরিবার শক্তিশালী হলে সমাজ শক্তিশালী হয়, আর পরিবার ভেঙে গেলে সমাজও দুর্বল হয়ে পড়ে।
তিনটি ধ্বংসাত্মক বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা
আল্লাহ তাআলা একই সঙ্গে তিনটি বিষয় থেকে বিরত থাকতে বলেছেন—
অশ্লীলতা,
অসৎকাজ,
সীমালঙ্ঘন ও জুলুম।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পারিবারিক পরিবেশ এবং জনজীবনের নানা ক্ষেত্রে আমরা ভাষার অশালীন ব্যবহার, মিথ্যা প্রচার, অপবাদ, গীবত, বিদ্বেষ, চরিত্রহনন এবং বিভাজনের সংস্কৃতি দেখতে পাই।
একজন মুমিনের পরিচয় হওয়া উচিত সত্যবাদিতা, সংযম, শালীনতা এবং দায়িত্বশীল আচরণে।
পরিবর্তনের শুরু নিজের ভেতর থেকেই
আমরা প্রায়ই বলি—সমাজ বদলাতে হবে।
কিন্তু সমাজ তো আমাদের বাইরে কোনো আলাদা সত্তা নয়। আমি, আপনি, আমাদের পরিবার, আমাদের প্রতিষ্ঠান—এসবের সমষ্টিই সমাজ।
যদি একজন ব্যবসায়ী সততার সঙ্গে ব্যবসা করেন, একজন শিক্ষক ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে শিক্ষা দেন, একজন অভিভাবক সন্তানকে নৈতিকতার শিক্ষা দেন, একজন প্রশাসক আমানতদার হন এবং একজন নাগরিক নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন—তবে সমাজের পরিবর্তন অনিবার্য।
জাতির পুনর্জাগরণ কখনো কেবল আইন প্রণয়নের মাধ্যমে আসে না; আসে মানুষের বিবেক জাগ্রত হওয়ার মাধ্যমে।
আজকের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন
আমাদের প্রয়োজন শুধু নতুন সড়ক, উঁচু ভবন কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; বরং নৈতিকতার পুনর্জাগরণ।
কারণ নৈতিকতাহীন উন্নয়ন বাহ্যিক জৌলুস সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু স্থায়ী শান্তি, নিরাপত্তা এবং মানবিক সমাজ গড়তে পারে না।
সূরা আন-নাহলের এই মহান আয়াত আমাদের চারটি মৌলিক শিক্ষা দেয়—
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করো।
মানুষের প্রতি সদাচরণ করো।
আত্মীয়তার হক আদায় করো।
অন্যায়, অশ্লীলতা ও জুলুম থেকে দূরে থাকো।
এই চারটি নীতিই একটি সভ্য, মর্যাদাবান, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জাতি গঠনের মূল ভিত্তি।
উপসংহার
আসুন, আমরা কুরআনের এই মহান নির্দেশনাকে শুধু তিলাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনের প্রতিটি স্তরে বাস্তবায়নের আন্তরিক চেষ্টা করি।
কারণ একটি জাতির প্রকৃত পরিবর্তন শুরু হয় মানুষের অন্তর থেকে। আর সেই অন্তরের পরিবর্তনের সর্বশ্রেষ্ঠ দিশারি হলো আল্লাহর কালাম।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার, উত্তম চরিত্র গঠনের, আত্মীয়তার হক আদায় করার এবং সব ধরনের অন্যায়, অশ্লীলতা ও সীমালঙ্ঘন থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন।
লেখক দাঈ ও গবেষক 
Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD