সরেজমিন প্রতিবেদন.
লুৎফর রহমান, বিশেষ প্রতিনিধি : সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বিষমডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের কতিপয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের ধারাবাহিক যৌন হয়রানীর অভিযোগে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা অসন্তোষ প্রকাশ করে বলছেন, অভিযুক্তদের বাঁচাতে দুজন নিরীহ শিক্ষককে ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে দায় মুক্তি দিতে দ্রুততম সময়ে প্রশাসন গণশুনানি শেষে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়। শিক্ষার্থীরা গণশুনানির ওই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখান করে মানববন্ধন করলে, উপজেলা প্রশাসন কৃষি কর্মকর্তাকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এ সংবাদ লেখা পর্যন্ত সর্বশেষ গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে অভিযুক্ত অন্যান্য শিক্ষক একাডেমিক সকল কার্যক্রম থেকে বিরত থাকলেও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো: আব্দুল আলিম রয়েছেন বহাল তবিয়তে। তিনি দায়িত্বে থাকলে তদন্তকার্য প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে মর্মে অভিযোগকারী ছাত্রীদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এ ঘটনায় একজন ভিকটিমের পরিবারের পক্ষ থেকে রায়গঞ্জ থানায় একটি মামলাও দায়ের করা হয়েছে। অবশ্য তদন্ত কমিটির উপর আস্থা রাখার কথা জানিয়ে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার নুসরাত জাহান বলেন, প্রকৃত দোষীদেরই শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
অভিযোগ থেকে জানা যায়, সম্প্রতি বিষমডাঙা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সহ একাধিক শিক্ষককের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করে ওই প্রতিষ্ঠানের অধ্যায়নরত ৯ম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী। ঘটনাটি জানাজানি হলে অভিযুক্ত শিক্ষকদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে গত ২৩ জুন বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করে শিক্ষার্থীরা সহ এলাকার বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ।
মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, বিষমডাঙা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল আলিম, সহকারী শিক্ষক জহুরুল ইসলাম খোকনসহ তিনজন শিক্ষক ধারবাহিকভাবে যৌন হয়রানি ও সহায়তা করে আসছেন। এ নিয়ে কেউ মুখ খুললে তাদেরকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। সম্প্রতি কয়েকজন ছাত্রী এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুললে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এ ঘটনায় গত ২২ জুন বিষমডাঙা স্কুল এন্ড কলেজে তাড়াশ উপজেলা প্রশাসন, তাড়াশ থানা পুলিশ ও সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয়ের নারী তদন্ত টিমের নেতৃত্বে সরেজমিনে একটি গণ শুনানি পরিচালিত হয়। সেখানে ছাত্রীরা সরাসরি কতিপয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে তাদের আনা অভিযোগের সত্যতা মৌখিকভাবে প্রকাশ করে মর্মে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার নুসরাত জাহান সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন।
তবে গণশুনানির প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। গণশুনানির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিষমডাঙা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রীদের ধারাবাহিক যৌন হয়রানি ও অনাকাক্সিক্ষত স্পর্শের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাড়াশ উপজেলা প্রশাসন, তাড়াশ থানা পুলিশ ও জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের বিশেষ নারী তদন্ত টিমের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠানে একটি সরেজমিন গণশুনানি পরিচালিত হয়।ওই তদন্তে উপস্থিত কর্মকর্তাদের সন্মুখে ছাত্রীবৃন্দ সরাসরি কতিপয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে তাদের আনা অভিযোগের সত্যতা মৌখিকভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রকাশ করে। ওই তদন্ত প্রতিবেদনে প্রভাষক মো: জহুরুল ইসলাম খোকন,সহকারী শিক্ষক সুজন কুমার মাহাতো ও সহকারী শিক্ষক (বাংলা) বিকাশ সরকারকে অভিযুক্ত করে তাদের কে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে সাময়িক বরখাস্তের সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া তাদেরকে কেনো চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না তা ৭ কর্মদিবসের মধ্যে জানতে চেয়ে প্রধান শিক্ষককে নির্দেশ দেয়া হয়।
ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখান করে সংক্ষুদ্ধরা বলেন, এটি একটি সাজানো প্রতিবেদন। যে তিনজন শিক্ষককে অভিযুক্ত করা হয়েছে তাদের মধ্যে প্রভাষক মো: জহুরুল ইসলাম খোকন ছাড়া অন্য দুই শিক্ষক কোনোভাবেই জড়িত নয়। এদের মধ্যে শিক্ষক সুজন কুমার মাহাতো ঘটনার প্রায় একমাস আগে চিকিৎসার জন্য ভারতে অবস্থান করছিলেন। এ ছাড়া ছাত্রীরা মানববন্ধনে সরাসরি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো: আব্দুল আলিমকে অভিযুক্ত করলেও অদৃশ্য কারণে তার নাম বাদ দেয়া হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিষমডাঙা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার। তিনি তদন্ত কমিটিরও প্রধান। অভিযোগ রয়েছে গণশুনানিতে অভিযোগকারী ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ডাকা হয়নি। তাদের অভিযোগ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো: আব্দুল আলিম ঘটনা ভিন্নখাতে নিতে ওইদিন ইচ্ছে করেই ৯ম শ্রেণীর অভিযোগকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানে আসতে বলেননি।
এ প্রসঙ্গে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার নুসরাত জাহান বলেন, অভিযোগ উঠার সময় গত ২১ জুন তিনি সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ২২ জুন গণশুনানিতে অংশ নিতে বিষমডাঙা স্কুল অ্যান্ড কলেজে যান। তিনি অবশ্য স্বীকার করেন উপস্থিত যে সকল শিক্ষার্থীদের পেয়েছেন, তাদের কথা শুনেছেন। সে অনুসারে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করে লিখিত অভিযোগ করলে, উপজেলা কৃষি অফিসার শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তাকে প্রধান করে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। বর্তমানে সে তদন্ত চলমান রয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে অভিযোগকারী শিক্ষার্থীরা জানায়, তারা বেশিরভাগ যৌনহয়রানির শিকার হয়েছে প্রভাষক মো: জহুরুল ইসলামের খোকনের দ্বারা । এ বিষয়ে তারা প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো: আব্দুল আলিমকে জানালে তিনি প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুন্ন হবে বলে সবাইকে ঘটনাটি চেপে যেতে বলেন। তিনি প্রতিষ্ঠানের আরো দুজন শিক্ষককে সাথে নিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে কয়েকজন শিক্ষার্থীর পরিবারকে ম্যানেজ করে লিখিত নেন। যারা তার কথা শুনেনি তাদের কে ভয়ভীতি দেখানো হয়।
অবশ্য ওই প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন এক ছাত্রী ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো: আব্দুল আলিমের বিরুদ্ধেও যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে তার মুঠোফোনে পাঠানো বিভিন্ন কুরুচিপূর্ণ ম্যাসেজের স্কিনশর্ট প্রদর্শন করলে তাড়াশ কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এর পরিচালক নাজমুল হাসান মেহেদি লাইভে এসে তা দেখান। যা সংরক্ষিত রয়েছে। এ নিয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো: আব্দুল আলিমের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলমান। এ কারণে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হোননি। এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা বলেন, তদন্ত কমিটি লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তদন্ত সম্পন্ন করেছেন। সে আলোকেই প্রতিবেদন দেয়া হবে। তবে লিখিত অভিযোগের বাইরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রদর্শিত কোনো কিছু তিনি আমলে নেননি ।
সিরাজগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটির প্রধান দায়িত্ব নিরেপেক্ষ, গোপনীয়তা ও সংবেদনশীলতা। তারা ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করবেন। তবে অপরাধের প্রমাণক তাদের আমলে নিতে হবে। তারা তা না নিলে সংক্ষুদ্ধ ব্যক্তি আদালতে স্মরণাপন্ন হলে ন্যায় বিচার পাবেন। এ ছাড়া যৌন হয়রানির মতো স্পর্শকাতর একটি বিষয়ে সহায়তা করা অথবা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাও একটি ফৌজদারী অপরাধ।

Weekly Chalonbeel Barta chalonbeelbarta.com
