তামাক কোম্পানির কৌশল রুখে দিতে হবে

Spread the love

(বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস ২০২৬ স্মরণে)

আবদুর রাজ্জাক রাজু
তামাকজাত দ্রব্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনমানসে প্রতিনিয়ত সচেতনতা বৃদ্ধি পেলেও তামাক কোম্পানির নানাবিধ চটকদার প্রচারণায় আকৃষ্ট হচ্ছে তরুণ সমাজ। এ সকল নিত্য নতুন প্রচারণার মূল্য উদ্দেশ্য ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং বিশেষ করে তরুণ ভোক্তা তৈরি করা। এই লক্ষেই কোম্পানিগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিজ্ঞাপন, নতুন ধরনের নিকোটিন পণ্য বাজারজাতকরণ এবং বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমে তরুণদেরকে সম্পৃক্ত করছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে সম্প্রতি মহান জাতীয় সংসদে পাশকৃত ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন ২০২৬ পাশ করেছে। কিন্তু আইনের সঠিক বাস্তবায়নের অভাবে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রচলিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী সকল প্রকার তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন, প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণকে, বিশেষ করে তরুণদের তামাক ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, তামাক কোম্পানিগুলো সরাসরি বিজ্ঞাপন না দিলেও নানা কৌশলে তাদের ব্র্যান্ডকে দৃশ্যমান রাখার চেষ্টা করে। সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে সকল প্রকার অনলাইন প্ল্যাটর্ফম, সোশ্যাল মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তামাকজাত দ্রব্যের সব ধরনের বিজ্ঞাপন ও প্রচার-প্রচারণা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু আইনের সঠিক বাস্তবায়ন এবং দোষী ব্যক্তিদেরকে আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় কোম্পানিগুলো বিভিন্ন করপোরেট কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিকোটিন পাউচ ও ই-সিগারেটের মতো আসক্তিকর নতুন নিকোটিনজাত পণ্যের প্রচারণা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এসব পণ্যকে প্রায়ই আধুনিক, কম ক্ষতিকর বা নিরাপদ বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এসকল নতুন পণ্য কিশোর ও তরুণদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এঅঞঝ এর সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী দেশে যেখানেই-সিগারেটের ব্যবহারকারীর শতকরা হার ছিলো মাত্র ০.২% তাও সেটি শহরাঞ্চলের প্রাপ্ত বয়স্ক (০.৮%) এবং সর্বোচ্চ সম্পদশালী গোষ্ঠীর (০.৯%) মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। অথচ ২০২৬ সালে ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের করা একটি গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে যে বিভিন্ন সামাজিক ও আর্থিক স্তরের তরুণ ধূমপায়ীদের ৭.৪২% এখন ই-সিগারেট সেবনকারী। আকর্ষণীয় প্যাকেজিং, ডিজিটাল বিপণন এবং আধুনিক জীবন ধারার সঙ্গে এসব পণ্যের সংযোগ তৈরি করে তরুণদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিকোটিন আসক্তি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
একাধিক সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রমেও তামাক কোম্পানির সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত। চাকরি মেলা, ক্যারিয়ার টক, ব্যাবসায়িক প্রতিযোগিতা, নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মসূচি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রবণতা দেখা যায়। যদিও এসব কার্যক্রমে সরাসরি তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করা হয় না তবে এগুলো কোম্পানির ভাবমূর্তি উন্নয়ন এবং তরুণদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে কাজ করে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের কার্যক্রম তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের উদ্দেশ্যের পরিপন্থি।
তামাকনিয়ন্ত্রণে কর বৃদ্ধি একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সব থেকে কার্যকর কৌশল হিসেবে প্রমাণিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য ১০% বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যম-আয়ের দেশে তামাকের ব্যবহার প্রায় ৫% হ্রাস পায়। তরুণদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। এই বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে সরকার নির্ধারিত ৪টি মূল্যস্তর কাঠামোকে লঙ্ঘন করে কোম্পানিগুলো কম দামের একাধিক নতুন ব্র্যান্ডের তামাকজাত দ্রব্য বাজারে আনে। যা ধূমপায়ীদেরকে সুবিধাজনক মূল্যের ব্র্যান্ডে শিফট করার সুযোগ করে দেয় যা আদতে কর-মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবকে দুর্বল করে দেয়। এছাড়া ভোক্তা অধিকার আইনের ধারা ৪০ লঙ্ঘন করে নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের অধিক মূল্যে সিগারেট বিক্রয়ের ফলে বছরে সরকার ৫ হাজার কোটি টাকারও অধিক রাজস্ব হারাচ্ছে। সম্প্রতি বহুজাতিক তামাক কোম্পানি ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি)-এর বিরুদ্ধে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে এটি হবে দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড়ো আর্থিক অনিয়মের ঘটনা।
তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয় বরং আইনের কঠোর প্রয়োগ, নতুন নিকোটিন পণ্যের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তামাক কোম্পানির প্রভাবমুক্ত রাখা খুবই জরুরি। তামাক কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন প্রচারণা, বাজার সম্প্রসারণ কৌশল, রাজস্ব ফাঁকি ও বিতর্কিত কর্মকা- নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

লেখক : উন্নয়ন কর্মী ও সম্পাদক।

 

Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD