মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ (হাফিযাহুল্লাহ)
মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন চারপাশের সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে যায়। স্বপ্নগুলো ভেঙে পড়ে, আশা মলিন হয়ে যায়, পথগুলো বন্ধ হয়ে আসে। তখন মনে হয়, আর কিছুই বাকি নেই। সব শেষ। কিন্তু একজন মুমিনের জীবনদর্শন ভিন্ন। কারণ তিনি এমন এক মহান রবের প্রতি ঈমান রাখেন, যিনি মৃত জমিনে সবুজের সমারোহ ফিরিয়ে আনেন, অন্ধকারের বুক চিরে আলোর জন্ম দেন এবং মৃত্যুর পর সমগ্র মানবজাতিকে পুনরায় জীবিত করবেন।
পবিত্র কুরআনের দীর্ঘতম সূরা, সূরা আল-বাকারা, আল্লাহ তাআলার এই অসীম কুদরতের এক অনন্য দলিল। এ সূরার প্রতিটি অধ্যায়ে রয়েছে ঈমান, হিদায়াত, শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির অমূল্য উপদেশ। বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ সূরায় একাধিকবার মৃতকে জীবিত করার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, যা মানুষের হৃদয়ে আখিরাতের বিশ্বাসকে দৃঢ় করে এবং আল্লাহর সীমাহীন ক্ষমতার প্রতি গভীর আস্থা সৃষ্টি করে।
পুনর্জীবনের পাঁচটি ঐশী নিদর্শন
সূরা আল-বাকারায় পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর পুনর্জীবিত করার ক্ষমতা মানুষের সামনে স্পষ্ট করে তুলেছেন।
প্রথম ঘটনা হলো বনী ইসরাঈলের সেই হত্যাকাণ্ড, যেখানে এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছিল। আল্লাহ তাআলার নির্দেশে একটি গাভী জবাই করা হয় এবং তার একটি অংশ দ্বারা মৃত ব্যক্তিকে স্পর্শ করা হলে তিনি জীবিত হয়ে হত্যাকারীর পরিচয় প্রকাশ করেন। এরপর আল্লাহ ঘোষণা করেন—
“এভাবেই আল্লাহ মৃতকে জীবিত করেন এবং তোমাদেরকে তাঁর নিদর্শনসমূহ দেখান, যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পার।” (সূরা আল-বাকারা: ৭৩)
দ্বিতীয় ঘটনা সেইসব লোকদের, যারা মৃত্যুভয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ তাদের মৃত্যুবরণ করালেন এবং পরবর্তীতে পুনরায় জীবিত করলেন।
তৃতীয় ঘটনা হযরত ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর। তিনি আল্লাহর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কীভাবে মৃতকে জীবিত করা হয়। আল্লাহ তাআলা চারটি পাখির মাধ্যমে তাঁকে সেই বাস্তব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করান।
চতুর্থ ঘটনা সেই ব্যক্তির, যিনি একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদ দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। আল্লাহ তাঁকে একশ বছর মৃত রাখার পর পুনরায় জীবিত করেন এবং তাঁর সামনে নিজের কুদরতের নিদর্শন প্রকাশ করেন।
পঞ্চম ঘটনা বনী ইসরাঈলের একটি দলের, যারা আল্লাহকে প্রকাশ্যে দেখতে চেয়েছিল। তাদের ওপর বজ্রপাত নেমে আসে এবং তারা মৃত্যুবরণ করে। অতঃপর আল্লাহ তাদের পুনর্জীবিত করেন, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
সূরা আল-বাকারার প্রকৃত শিক্ষা
এই ঘটনাগুলো পড়ে অনেকেই আবেগপ্রবণ হয়ে মনে করতে পারেন, সূরা আল-বাকারা যেন কেবল অলৌকিক পরিবর্তনের জন্যই অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর আলোকে বিষয়টি বুঝতে হবে আরও গভীরভাবে।
সূরা আল-বাকারার মূল শিক্ষা হলো—আল্লাহর কুদরতের প্রতি বিশ্বাস, আখিরাতের পুনরুত্থানের সত্যতা, তাকওয়া, আনুগত্য এবং মানবজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় বিধানাবলি।
এই সূরা আমাদের শেখায়, কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। মানুষের চোখে যা অসম্ভব, আল্লাহর কাছে তা অত্যন্ত সহজ।
সূরা আল-বাকারার ফযীলত
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
“তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না। যে ঘরে সূরা আল-বাকারা পাঠ করা হয়, শয়তান সেই ঘর থেকে পালিয়ে যায়।”
(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৭৮০)
আরেক হাদীসে এসেছে—
“সূরা আল-বাকারা পাঠ করো। কারণ তা গ্রহণ করা বরকত এবং তা পরিত্যাগ করা আফসোসের কারণ।”
(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৮০৪)
আজকের মানুষের জন্য বার্তা
আজ অসংখ্য মানুষ হতাশা, ব্যর্থতা, পারিবারিক অশান্তি, অর্থনৈতিক সংকট এবং মানসিক অবসাদের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকে মনে করেন, তাদের জীবনে আর কোনো সম্ভাবনা অবশিষ্ট নেই। কিন্তু সূরা আল-বাকারা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—যে আল্লাহ মৃতকে জীবিত করেন, তাঁর জন্য কোনো সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়।
তবে সেই পরিবর্তন আসে ঈমান, তাওবা, দোয়া, ধৈর্য, আমল এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতার মাধ্যমে। কুরআন মানুষকে অলস আশাবাদ শেখায় না; বরং শেখায় আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে।
উপসংহার
সূরা আল-বাকারা কেবল একটি সূরার নাম নয়; এটি আশা, ঈমান, ধৈর্য এবং আল্লাহর কুদরতের এক মহান ঘোষণাপত্র। এ সূরা আমাদের শিক্ষা দেয়, জীবন যখন থেমে গেছে বলে মনে হয়, তখনও আল্লাহর রহমতের দরজা বন্ধ হয় না। মানুষ যখন সব সম্ভাবনা শেষ দেখে, তখনও আল্লাহ নতুন সম্ভাবনার সূচনা করতে সক্ষম।
তাই হতাশার অন্ধকারে নয়, আশার আলোয় বাঁচতে শিখি। নিরাশার ভাষায় নয়, ঈমানের ভাষায় কথা বলি। কারণ একজন মুমিন জানে—যিনি মৃতকে জীবিত করেন, তিনি ভগ্ন হৃদয়েও নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সূরা আল-বাকারার শিক্ষা উপলব্ধি করার, তার আলোকে জীবন পরিচালনা করার এবং তাঁর অসীম কুদরতের ওপর অটল বিশ্বাস রাখার তাওফীক দান করুন। আমীন।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com