বিশেষ প্রতিনিধি: “ও আল্লাহরে, টাকা কোথায় পাবো! আদালতে গেলেও টাকা, যেখানে যাব টাকা লাগবে। এত টাকা কোথায় পাবো? একমাত্র সম্বল সোয়া বিঘা কৃষি জমি বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছি। আমার ছেলে বহু কষ্টে উপার্জিত টাকায় দেশে দের বিঘা জমি কিনেছে। সেই জমি দলিল লেখক নিজের নামে রেজিস্ট্রেশন করে নিয়েছেন। ছেলে বিদেশে থাকে, আমরাও পড়ালেখা জানি না। আমাদের অজ্ঞতা ও সরলতার সুযোগ নিয়ে দলিল লেখক গুরুতর প্রতারণা করেছেন আমাদের সাথে। এই দের বিঘা জমি ছাড়া আমাদের কিছুই নেই। আমি জমি ফেরত চাই, দলিল লেখক মির্জা আব্দুর রবের শাস্তি চাই।”
বিলাপ করে এসব কথা বলছিলেন, সিরাজগঞ্জের নুরুল ইসলাম (৭৭)। তার বাড়ি তাড়াশ উপজেলার পৌর এলাকার কহিত গ্রামে।তিনি আরও বলেন, বিদেশে ছেলের রোজগার খুবই কম। ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারে না। রমজান মাসে পান্তা ভাত খেয়ে রোজা থেকেছি। টাকা না থাকায় বাজার করতে পারি না। জমি ফেরত না পেলে শোকে হয়তো মারাই যাব আমি!এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে দলিল লেখক মির্জা আব্দুর রবের বিরুদ্ধে সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আমিনুল ইসলাম বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন নুরুল ইসলাম ও তার ছেলে ফরহাদ আলী। বিদেশ থেকে পাঠানো ছেলের স্বাক্ষরিত অভিযোগ লিপিতে পক্ষে স্বাক্ষর করেছেন ফরহাদ আলীর মা ফিরোজা খাতুন। একই অভিযোগ জেলা রেজিস্ট্রার শরীফ তোরাফ হোসেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান ও উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার সিফাত মাহমুদকে দেওয়া হয়েছে। অনুলিপি দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে।
মির্জা আব্দুর রব তাড়াশ দলিল লেখক অফিসে কর্মরত দলিল লেখক। নুরুল ইসলাম ও মির্জা আব্দুর রবের বাড়ি একই গ্রামে।
লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২২ তারিখে ৭ লাখ ২৬ হাজার টাকা মূল্যে কহিত মৌজায় দের বিঘা কৃষি জমি ক্রয় করেন ফরহাদ আলী। তাড়াশ পৌর এলাকার কহিত তেতুলিয়া গ্রামের মৃত সোলেমানের দুই ছেলে মো. বাবলু, কালাম ও দুই মেয়ে শামীমা, সুমি খাতুন জমি বিক্রি করেন। ক্রেতা ফরহাদ আলীর বাবা নুরুল ইসলাম জমি রেজিস্ট্রেশন করতে দেন দলিল লেখক মির্জা আব্দুর রবের কাছে। ফরহাদ আলী দুবাই থাকেন। তার বাবা নিজের নামের স্বাক্ষর করতে পারেন না। এসবের সুযোগ নিয়ে দলিল লেখক মির্জা আব্দুর রব ফরহাদ আলীর কেনা জমি নিজের নামে রেজিস্ট্রেশন করে নেয়। দলিল নং-৭৮২/২১।
ফরহাদ আলী বলেন, দলিল লেখক মির্জা রবের কাছে জমির জাবেদা নকল চাওয়া হয়। তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষেপণ করেন। নিরুপায় হয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসের ২৬ তারিখে অন্য মাধ্যমে জমির নকল তোলা হয়। কিন্তু ৫ আগস্টের পর ভূমি সেবা কার্যক্রমের স্থবিরতা দেখা দেয়। সম্প্রতি খাজনা-খারিজের জন্য ভূমি অফিসে গেলে বলা হয়, দলিল অনুযায়ী জমি দলিল লেখক মির্জা আব্দুর রবের! আমাদের কোনোভাবেই বুঝতে দেওয়া হয়নি দলিল লেখক আব্দুর রবের প্রতারণা। কারণ জমির ভোগ দখলে রয়েছি আমরাই। কোহিত গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ও উলিপুর পাচান দাখিল মাদ্রাসার ইবতেদায়ী বিভাগের প্রধান মৌলভী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, জমি বিক্রেতা মো. বাবলু, কালাম, শামীমা ও সুমি খাতুন সম্পর্কে আমার ভাগ্নে-ভাগ্নি। তারা নুরুল ইসলামের ছেলে ফরহাদ আলীর কাছে জমি বিক্রি করেছেন। জমি রেজিস্ট্রেশনের দিন আমিও উপস্থিত ছিলাম। দলিল লেখক আব্দুর রব ও আমরা একই গ্রামে বসবাস করি। আমাদের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে প্রতারণা করেছেন দলিল লেখক আব্দুর রব। সম্ভাবত এ ধরনের প্রতারণা বাংলাদেশে প্রথম।জমি বিক্রেতা মো. বাবলু, তার দুই বোন শামীমা ও সুমি খাতুন বলেন, আমাদের জমি কহিত গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে ফরহাদ আলীর কাছে বিক্রি করেছি। এ বিষয়ে তারা লিখিত স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।
কহিত গ্রামের প্রধান মো. হাফিজ উদ্দীন বলেন, গ্রামের প্রায় সব মানুষ জানেন কহিত তেতুলিয়া গ্রামের বাবলুদের জমি নুরুল ইসলামের ছেলে ফরহাদ আলী কিনেছেন। এখন শোনা যাচ্ছে আব্দুর রব কিনেছেন। এ নিয়ে গত সোমবার সালিশ বৈঠক বসার কথা ছিলো গ্রামে। আব্দুর রব অসুস্থতার কথা বলে দিন পিছিয়ে শুক্রবার দিন বসার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি মূলত সময় ক্ষেপন করছেন। গ্রামের এ প্রধান আরও বলেন, গ্রাম্য সালিশ করে জমি ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়, যদি দলিল লেখক আব্দুর রব নিজে থেকে না দেয়।দলিল লেখক মির্জা আব্দুর রব বলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার জমি নুরুল ইসলামের ছেলে ফরহাদের কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছে।তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত জাহান বলেন, সাব-রেজিস্ট্রারের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার সিফাত মাহমুদ বলেন, এ দুর্নীতি ২০২১ সালের। তখন আমি তাড়াশে সাব-রেজিস্ট্রার ছিলাম না। ফরহাদ আলীর বাবা নুরুল ইসলাম লিখিত অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন। আমি অভিযোগের কপিতে লাল কালিতে লিখে দিয়েছি, বিধি মোতাবেক আইনি সহায়তা পাবেন।জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, অভিযোগটি জেলা রেজিস্ট্রার শরীফ তোরাফ হোসেনকে দেওয়া হয়েছে।এ প্রসঙ্গে জেলা রেজিস্ট্রার শরীফ তোরাফ হোসেন বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই-পূর্বক বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com
