বিয়ে: পার্টনারশিপ (শারিকানা) নয়—পোশাকের মতো এক পবিত্র, দৃঢ় ও ইবাদতমুখী সম্পর্ক

Spread the love
পীরজাদা মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ (হাফিজাহুল্লাহ)
বর্তমান সময়ের একটি বহুল প্রচারিত ও আলোচিত ধারণা হলো—“বিয়ে একটি পার্টনারশিপ।”এই কথাটি শুনতে যতটা আধুনিক, যুক্তিনির্ভর ও আকর্ষণীয় মনে হয়, বাস্তবে তা ইসলামী দাম্পত্য দর্শনের সঙ্গে ততটাই সাংঘর্ষিক। কারণ ইসলাম কখনোই বিয়েকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব বা স্বার্থভিত্তিক চুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেনি। বরং বিয়েকে আল্লাহ তাআলা বানিয়েছেন এক অনন্য, পবিত্র ও গভীর সম্পর্ক—যার ভিত্তি ভালোবাসা, দায়িত্ব, ত্যাগ ও আখিরাতমুখিতা।পার্টনারশিপ ধারণার জন্ম ও বিস্তার ‘পার্টনার’ বা ‘শরিক’ শব্দটির উৎপত্তি মূলত পুঁজিবাদী সভ্যতায়। ব্যবসা, বিনিয়োগ, সম্পত্তি, মুনাফা ও লোকসানের হিসাবেই এই শব্দের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। পরবর্তীতে পাশ্চাত্য সমাজে নারী-পুরুষ সমতার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এই শব্দটি পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কেও প্রবেশ করে।
এই ধারণা অনুযায়ী, সম্পর্ক মানে হলো—সমান ক্ষমতা,সমান সিদ্ধান্ত,সমান দায় ও দায়িত্ব,এবং প্রয়োজনে সমানভাবে বিচ্ছেদের অধিকার।
এই দর্শন বস্তুবাদী সমাজে কার্যকর মনে হলেও দাম্পত্য জীবনে এটি শান্তি নয়, বরং সংঘাত ডেকে আনে।বিয়ে যদি পার্টনারশিপ হয়, তাহলে পরিণতি কী যদি বিয়েকে পার্টনারশিপ হিসেবে ধরা হয়, তাহলে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই নিজেকে সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত মালিক মনে করে। এতে পরিবারে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব অনিবার্য হয়ে ওঠে।এর ফল হিসেবে দেখা দেয়—দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতা অধিকার নিয়ে টানাটানি সবকিছুতে হিসাব-নিকাশত্যাগের জায়গায় প্রতিযোগিতাএমনকি সন্তানের লালন-পালনও হয়ে পড়ে মতের দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র। আর বিচ্ছেদের সময় এই সম্পর্ক পরিণত হয় কেবল সম্পদ, অভিভাবকত্ব ও অধিকার ভাগাভাগির এক নিষ্ঠুর অঙ্কে।
এই কারণেই আজ দাম্পত্য জীবন অনেকের কাছে ভালোবাসার আশ্রয় নয়, বরং ক্ষমতার লড়াইয়ের ময়দান। আর এর স্বাভাবিক পরিণতি হলো—তালাক, ভাঙা পরিবার এবং মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সন্তান।ইসলামের দৃষ্টিতে বিয়ে: মিসাকান গলিজাইসলাম এই পুরো চিন্তাধারাকে根মূল থেকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কুরআন কারিমে আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে আখ্যা দিয়েছেন—“মিসাকান গলিজা”অর্থাৎ, এক দৃঢ়, ভারী ও গভীর অঙ্গীকার।চুক্তি আর অঙ্গীকার এক জিনিস নয়।চুক্তি শর্তনির্ভর, সময়সীমাবদ্ধ এবং সহজে ভাঙা যায়।কিন্তু মিসাক হলো এমন এক প্রতিশ্রুতি, যা আল্লাহর সামনে দেওয়া হয়, যা হৃদয় ও জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।আর এই অঙ্গীকারকে কুরআন ‘গলিজা’ বলেছে—অর্থাৎ এটি কোনো হালকা বা সাময়িক বিষয় নয়। এটি দায়িত্বের ভারে ভারী, মর্যাদায় উচ্চ এবং আখিরাতের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।পোশাকের উপমা: দাম্পত্যের শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যা
কুরআনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের যে উপমা দেওয়া হয়েছে, তা ইসলামী দাম্পত্য দর্শনের মূল চাবিকাঠি—“তারা তোমাদের জন্য পোশাক, আর তোমরা তাদের জন্য পোশাক।”সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৭পোশাক মানে কী? পোশাক শরীরকে ঢাকে, রক্ষা করে, সৌন্দর্য বাড়ায়, লজ্জা হিফাজত করে এবং মানুষের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে লেগে থাকে।পোশাক কখনো লাভ-ক্ষতির হিসাব করে না।পোশাক কখনো শর্ত দেয় না।পোশাক নিজের অস্তিত্ব দিয়েই উপকার করে।এই উপমা আমাদের শেখায়— দাম্পত্য মানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং পরিপূরকতা।দাম্পত্য মানে কর্তৃত্ব নয়, বরং দায়িত্ব।দাম্পত্য মানে হিসাব নয়, বরং ভালোবাসা ও আচ্ছাদন।ভালোবাসা, অনুগ্রহ ও প্রশান্ত আবাসকুরআন দাম্পত্য সম্পর্ককে শুধু পোশাকেই সীমাবদ্ধ করেনি। বরং একে আরও গভীর অর্থে ব্যাখ্যা করেছে— ভালোবাসা, অনুগ্রহ ও প্রশান্তির আবাস হিসেবে।স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য মানসিক আশ্রয়। যেখানে ক্লান্ত হৃদয় শান্তি খুঁজে পায়, যেখানে ভুল হলে ক্ষমা পাওয়া যায়, যেখানে দুর্বলতা ঢেকে দেওয়া হয়।
এটাই ইসলামী দাম্পত্যের সৌন্দর্য।ক্বাওয়ামা ও আনুগত্য: ভুল বোঝাবুঝির অবসান ক্বাওয়ামা শব্দটি অনেকের কাছে ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়। ক্বাওয়ামা মানে আধিপত্য বা স্বেচ্ছাচার নয়।ক্বাওয়ামা মানে— পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ,ভরণপোষণ নিশ্চিত করা,সুরক্ষা দেওয়া,এবং কল্যাণকর সিদ্ধান্ত নেওয়া।আর আনুগত্য মানে অন্ধ অনুসরণ নয়। তা হবে মারুফের মধ্যে—অর্থাৎ ন্যায়, মানবিকতা ও আল্লাহর বিধানের সীমার মধ্যে।
এই কাঠামো কোনো পক্ষকে জুলুম করার সুযোগ দেয় না; বরং ভারসাম্য ও ন্যায়ের নিশ্চয়তা দেয়।দাম্পত্য জীবনের প্রকৃত ভিত্তি ইসলামে দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি হলো— বোঝাপড়া,ত্যাগ,সহযোগিতা,এবং আখিরাতের সওয়াবের আশা।বিয়ের শুরুটা কখনোই “আমার অধিকার” ও “তোমার দায়িত্ব” দিয়ে হয় না। শুরুটা হয় ভালোবাসা, বিশ্বাস ও একে অপরকে আপন করে নেওয়ার মাধ্যমে।অধিকার ও কর্তব্যের আলোচনা আসে তখনই, যখন সমস্যা দেখা দেয়। সম্পর্কের মূল সুর কখনোই হিসাব নয়।
আজকের সমাজ ও আমাদের করণীয় আজ সোশ্যাল মিডিয়া, নাটক ও চলচ্চিত্র আমাদের সামনে বিয়ের একটি বিকৃত চিত্র তুলে ধরছে। সেখানেদাম্পত্য মানে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, স্বাধীনতার যুদ্ধ ও জয়-পরাজয়ের প্রতিযোগিতা।এই বিভ্রান্ত ধারণার ফলেই— সংসার ভাঙছে,মানসিক অশান্তি বাড়ছে,তালাক বেড়ে যাচ্ছে।কিন্তু যদি স্বামী-স্ত্রী নিজেদের সম্পর্ককে পোশাকের মতো ভাবত—তাহলে তারা বিয়েতে খুঁজে পেত বরকত, প্রশান্তি ও মানসিক স্বস্তি।উপসংহারবিয়ে কোনো পার্টনারশিপ নয়।বিয়ে কোনো পরীক্ষামূলক চুক্তিও নয়।বিয়ে হলো আল্লাহর দেওয়া এক পবিত্র আমানত, এক দৃঢ় অঙ্গীকার।আসুন, আমরা পাশ্চাত্য ধারণা নয়—কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে বিয়েকে বুঝি। তাহলেই পরিবার হবে শান্তির নীড়, আর দাম্পত্য জীবন হবে ইবাদতের এক সুন্দর মাধ্যম।
লেখক: তরুণ আলোচক ও গবেষক বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব 
ইমাম ও খতিব আটাইল দক্ষিণ পাড়া জামে মসজিদ ভবানীপুর শেরপুর বগুড়া ।
Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD