মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ
ইসলামী বর্ষপঞ্জির অষ্টম মাস শা‘বান—একটি অবহেলিত অথচ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মাস। রমজানের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে এই মাস। অনেকেই রমজানের প্রস্তুতির কথা বলেন, কিন্তু প্রস্তুতির প্রকৃত ক্ষেত্র যে শা‘বান—তা আমরা প্রায় ভুলেই যাই। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আমল, সাহাবায়ে কেরামের জীবনচর্চা এবং হাদিসের ভাষ্য গভীরভাবে চিন্তা করলে স্পষ্ট হয়—শা‘বান হলো আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের প্রশিক্ষণ মাস।
হজরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) বলেন—আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি আপনাকে অন্য কোনো মাসের তুলনায় শা‘বান মাসে এত বেশি রোজা রাখতে দেখি কেন?
তিনি বললেন—“এটি এমন এক মাস, যা রজব ও রমজানের মাঝখানে অবস্থিত। মানুষ এ মাসের গুরুত্ব ভুলে যায়। অথচ এ মাসেই আমলসমূহ আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। আমি চাই, আমার আমল এমন অবস্থায় পেশ হোক যখন আমি রোজাদার।”
— নাসায়ী শরিফ
শা‘বান মাসের তাৎপর্য
শা‘বান মাস মূলত রমজানের প্রস্তুতিপর্ব। যেমন একজন কৃষক বীজ বপনের পর জমি পরিচর্যা করে ফসল তোলার জন্য প্রস্তুত হয়, তেমনি একজন মুমিন শা‘বান মাসে নিজের আত্মাকে পরিচ্ছন্ন করে রমজানের জন্য প্রস্তুত করে।
একটি প্রসিদ্ধ উক্তিতে বলা হয়—
“রজব হলো বীজ বপনের মাস, শা‘বান হলো সেচ ও পরিচর্যার মাস, আর রমজান হলো ফসল তোলার মাস।”
শা‘বান মাসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য
এই মাসের মধ্যরাত্রি হলো শবে বরাত—যে রাতে আল্লাহ তাআলা অগণিত বান্দাকে ক্ষমা করেন, তাকদিরের গুরুত্বপূর্ণ ফয়সালা হয় এবং দোয়ার দরজা খুলে দেওয়া হয়। এ মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি নফল ইবাদতে মশগুল থাকতেন, যেন উম্মত রমজানের জন্য মানসিক ও আত্মিকভাবে প্রস্তুত হয়।হজরত আয়েশা (রা.) বলেন—“আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে শা‘বান মাসের চেয়ে বেশি কোনো মাসে নফল রোজা রাখতে দেখিনি।”— বুখারি ও মুসলিম
শা‘বান মাসের করণীয় আমল
১. বেশি বেশি নফল রোজা রাখা
পুরো মাস কিংবা অধিকাংশ দিন রোজা রাখা সুন্নাহসম্মত। বিশেষ করে শবে বরাতের পরদিন রোজা রাখা ফজিলতপূর্ণ।
২. নফল নামাজ ও রাতের ইবাদত
শা‘বান মাসে তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশতসহ নফল নামাজে অভ্যস্ত হওয়া রমজানে নিয়মিত ইবাদতের পথ সুগম করে।
৩. কুরআন তিলাওয়াত বৃদ্ধি করা
রমজানে কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়তে হলে শা‘বান থেকেই তিলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
৪. তওবা ও ইস্তিগফার
শা‘বান হলো আত্মসমালোচনার মাস। অতীতের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দরবারে ফিরে আসার শ্রেষ্ঠ সময়।
৫. দরুদ শরিফ ও দোয়ার প্রতি গুরুত্ব
এই মাসে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা হৃদয়কে নরম করে এবং রাসুল (সা.)-এর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করে।
৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক জোড়া লাগানো
শবে বরাতের হাদিস থেকে জানা যায়, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীরা আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে। তাই শা‘বান মাসে সম্পর্ক মেরামতের বিশেষ চেষ্টা করা জরুরি।
শা‘বান মাসের বর্জনীয় বিষয়
১. গাফিলতিতে সময় নষ্ট করা
এই মাসকে সাধারণ মাস মনে করে অবহেলায় কাটানো আত্মিক ক্ষতির কারণ।
২. বিদআত ও কুসংস্কার
ইবাদতের নামে ভিত্তিহীন আমল, বাড়াবাড়ি ও লোকদেখানো কাজ পরিহার করা আবশ্যক।
৩. পাপের উপর অটল থাকা
তওবার সুযোগ পেয়েও গুনাহে লিপ্ত থাকা চরম দুর্ভাগ্যের পরিচয়।
৪. অহেতুক আনন্দ-উৎসব ও অপচয়
বিশেষত শবে বরাতের রাতে আতশবাজি, হৈ-হুল্লোড় ইবাদতের পরিবেশ নষ্ট করে।
শা‘বান—আত্মশুদ্ধির সেতুবন্ধন
শা‘বান মাস হলো রমজান ও আমাদের মধ্যকার একটি সেতু। যে ব্যক্তি এ মাসে নিজেকে সংশোধন করতে পারল না, তার জন্য রমজানও অনেক সময় কেবল রোজা রাখা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
অতএব, আসুন—শা‘বান মাসকে ইবাদতের প্রস্তুতির মাস হিসেবে গ্রহণ করি,গুনাহ ছেড়ে নেক আমলের পথে ফিরে আসি,এবং একটি পরিবর্তিত হৃদয় নিয়ে রমজানকে স্বাগত জানাই।মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শা‘বান মাসের যথাযথ কদর করার তৌফিক দান করুন।রমজানের জন্য পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি গ্রহণের শক্তি দান করুন।
আমীন।
লেখক তরুণ আলোচক ও গবেষক
ইমাম ও খতিব আটাইল দক্ষিণ পাড়া জামে মসজিদ ভবানীপুর শেরপুর বগুড়া ।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com