তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
চলনবিল অঞ্চলের নয়টি উপজেলা এলাকায় চলতি রবিশস্য মৌসুমে প্রায় ৪০- ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে টরি- ৭, বারি- ১৪, ১৭ সহ বিভিন্ন জাতের সরিষার আবাদ করা হয়েছে। এরইমধ্যে হলুদ সরিষা ফুলে একাকার হয়ে গেছে চলনবিলের ফসলি মাঠ। পাশাপাশি বিলপাড়ের সরিষার জমিতে বিশুদ্ধ মধু সংগ্রহে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের প্রায় ২৭০- ৩০০ মৌচাষি মৌবাক্স নিয়ে প্রত্যন্ত বিলের সরিষার মাঠে অস্থায়ী আস্তানা গেড়ে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
কিন্তু বিরুপ আবহাওয়ার কারণে বিশেষ করে গত তিন- চার দিন ধরে তীব্র শীতে হাজার, হাজার মৌবাক্সে রাখা লাখ লাখ মৌমাছি মারা যাচ্ছে। এতে করে চরম বিপাকে পড়েছেন মৌচাষিরা। তাঁরা বলছেন, শীতের তীব্রতা বেশি সময় অব্যহৃত থাকলে মধূ সংগ্রহের পরিমান কমবে। কারণ হিসেবে তাঁরা আরো বলেন, যত মৌমাছি তত মধু। শীতের তীব্রতায় মৌমাছি যত মারা যাবে মধুর উৎপাদন তত কমবে।
তাড়াশ উপজেলা কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, গত কাল বুধবার দুপুর ১২টায় চলনবিলঅঞ্চলে গড় তাপমাত্রা ছিল ১২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে রোববার ১৩ দশমিক ২, সোমবার ১৩ দশমিক ৪, মঙ্গল বার ছিল ১২ দশমিক ৮। পাশাপাশি গত চার দিনে বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশের মধ্যে। একই সঙ্গে চলনবিল অঞ্চলে আরো দুই ডিগ্রি তাপমাত্রা কমে চলমান শীতের তীব্রতা আরো দুই দিন থাকার সম্ভবনা রয়েছে।
তাড়াশের সগুনা গ্রামের মাঠে ২০০ মৌবাক্স নিয়ে মধু সংগ্রহে এসেছেন সাতক্ষীরার শ্যাম নগর এলাকার বাসিন্দা মৌচাষি ইসমাইল হোসেন। তিনি জানান, পূর্ণ বা পরিণত মৌমাছির তাপমাত্রা সহ্য করার ক্ষমতা ১০ থেকে ৫০ ডিগ্রি ্রপর্যন্ত। আর অপরিণত মৌমাছির লার্ভা বা শূককীটের ঠান্ডা- শীত সহ্য ক্ষমতা একেবারে কম। শীতকালে কৌশলে মৌচাকের তাপমাত্র সহনীয় রাখে মৌমাছি। কিন্তু পৌষের চলমান এ সময়ে এর ব্যত্যয় ঘটছে। ফলে ঘন কুয়াসা, কনকনে শীত এবং উত্তরের হিমেল হাওয়ায় মৌচাকবা মৌবাক্সের ভেতরের তাপমাত্রা কমেছে। এ কারণে ঠান্ডায় মারা যাচ্ছে বিপুল সংখ্যক মৌমাছি। বিশেষ করে অপরিণত মৌমাছির লার্ভা বা শূককীটের ঠান্ডা-শীত সহ্য করতেনা পেরে নষ্ট হয়ে মৌমাছির বংশ বিস্তারে ছন্দপতন ঘটছে।বর্তমানে শুধু মাত্র চলনবিলে সিরাজগঞ্জের তাড়াশে এ অঞ্চলের ২২- ২৫ জন, নাটোরের গুরুদাসপুরে ৩৫- ৪০ জন, সিংড়ার ১৫- ২০ জনসহ নয়টি উপজেলার শতাধিক মৌচাষি মধু সংগ্রহ করছেন। এর সঙ্গে রয়েছে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়াসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আরও ২০০- ২৫০ মৌচাষি।
মৌচাষিরা জানান, পুরো মৌসুমে প্রতি ২০০ মৌবাক্সের একজন মৌচাষী গড়ে ২৫ থেকে ৩০ টন মধু সংগ্রহ করতে পারেন। অবশ্য এ জন্য অনুকুল আবহাওয়া থাকাটাও জরুরী এমন ভাষ্য, নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর এলাকার মৌচাষী গাজী সালাউদ্দিনের। তিনিও তাড়াশের বনবাড়ীয়া এলাকায় সরিষার মাঠে প্রায় ১৫০ টি মৌবাক্স নিয়ে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
স্থানীয়রা জানান, টানা চার দিন উত্তরের হিমেল হাওয়ার সঙ্গে অনুভূত হচ্ছে কনকনে ঠান্ডা। গুরুদাসপুরের কাছিকাটা এলাকার মাঠে মধু সংগ্রহ করতে আসা চাষি লিখন মিয়া জানান, শীতের সময় মৌমাছি চাক বা বাক্স থেকে বের হয়না। এতে করে খাবার না খাওয়ায়ও মৌমাছি মারা যায়। তারপরও যেগুলো বের হচ্ছে, সে গুলো বেশির ভাগ বাঁচতে পারছেনা।
বাগেরহাট থেকে মধু সংগ্রহ করতে আসা চাষি সোলায়মান খান জানান, ২০০ থেকে ৪০০ চাক কেটে মধু সংগ্রহ করার পর প্রতি বাক্সে ২০০ থেকে ২৫০ মৌমাছি মারা যাচ্ছে। আরো মারা যাচ্ছে কীটনাশক দেওয়া সরিষার জমিতে মৌমাছি মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে। যার সংখ্যাও নেহাৎ কম নয় বলে মন্তব্য করেন, খুলনা থেকে মধু সংগ্রহ করতে আসা মৌচাষি মো. ফরিদুলইসলাম।তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শমিষ্ঠা সেন গুপ্তা বলেন, প্রকৃতির উপর কারো হাত নেই। আর তীব্র শীতে গাছ বা বাক্সের মৌচাক কেটে মধু সংগ্রহ করা যাবেনা। সেই সাথে ফুল আসা সরিষার জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ না করলে এতে ‘মৌমাছির মৃত্যুহার কমবে।’
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com