সাঈদ সিদ্দিক, নাটোল প্রতিনিধি
নাটোরের :লালপুরের কাঁসারী পল্লীর ধাতব ঝংকার আজ প্রায় থেমে গেছে। এক সময় ভোর থেকে সন্ধ্যা অবদি—হাতুড়ির তাল-লয়ে মুখর থাকত বাজার; কারিগরের ঘামে ঝলমল করত আগুনের ধুলো, নতুন তৈজস পত্রের উজ্জ্বল রূপ। এখন সে শিল্প যেন নীরব, ক্লান্ত ও পথ হারানো। পেশাদার কারিগরেরা বলছেন—তামা ও রাং-এর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, মালয়েশিয়া থেকে আমদানির বাড়তি ব্যয়, কয়লার দাম বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম বা মেলামাইনের সস্তা পণ্যের সঙ্গে আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না বহু প্রজন্মের এই ঐতিহ্য।
একটা সময় ছিল—গৃহস্থালির থালা, কলস, গ্লাস, বর প্লেট—সবই কাঁসার। এখন সাধারণ মানুষ সস্তা বিকল্পেই ঝুঁকছেন। কাঁসা যতটা শিল্প, ততটাই আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে কারিগরদের জন্য।ইতিহাস বলছে—নবাবী আমলে বর্গীদের অত্যাচারে ভারতের মুর্শিদাবাদ থেকে বহু কাঁসা বণিক ও শ্রমিক এসে আশ্রয় নেন লালপুর, সিংড়ার কলম ও নবাবগঞ্জে।কোনো এক সময় লালপুরেই ৫০টির মতো কারখানা ছিল। চার শতাধিক কারিগর দক্ষ হাতে তৈরি করতেন বগি থালা থেকে পানদানি—সবই। কাঁসার সামগ্রীর সে চাহিদা ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো উত্তরবঙ্গে।বর্তমানের খাদের ধারে দাঁড়িয়ে আজ পরিস্থিতি ভিন্ন।৫০টি কারখানার জায়গায় টিকে আছে মাত্র ৪–৫টি।যে বাজারে সকাল-বিকাল দরদাম নিয়ে মাতামাতি হতো, এখন সেখানে স্তব্ধতা।কারিগররা অভিযোগ করেন—ভারতে কাঁসার দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদিত কিছু মাল চোরাই পথে পাচার হয়। অন্যদিকে, বিনিয়োগে ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহ, দক্ষ শ্রমিকের অভাব, আর আধুনিক প্রযুক্তির অনুপস্থিতি শিল্পটিকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে।এখনো গ্রামীণ সমাজে, বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন পূজা-অর্চনা ও গৃহস্থালিতে কাঁসার পাত্রের আলাদা আবেদন আছে। বিদেশেও কিছু চাহিদা রয়ে গেছে।কিন্তু সে চাহিদা ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ ,শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা, রপ্তানি–বান্ধব নীতিমালাএবং আধুনিকায়নের সুযোগকারিগরদের মনোবেদনা স্পষ্ট—যদি এখনই উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে মসলিনের মতোই লালপুরের কাঁসা হারিয়ে যাবে ইতিহাসের পাতায়; হাতুড়ির সেই সুর শুধু গল্প হয়ে থাকবে।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com