লেখক: মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ হাফিযাহুল্লাহ
মানবসভ্যতার ইতিহাস বিস্মিত হয়ে স্বীকার করে—ইসলামের পূর্বে নারী ছিল অত্যন্ত অবমানিত, উপেক্ষিত ও পরিত্যক্ত এক শ্রেণি। বহু সমাজে কন্যা সন্তান জন্মালে তা ছিল লজ্জা; নারীর মতামত, অধিকার, সম্মান—কোনোটাই বিবেচনার যোগ্য মনে করা হতো না। ঠিক সেই অন্ধকার যুগে ইসলাম নারীর জন্য খুলে দেয় সম্মান, মর্যাদা, করুণা ও নিরাপত্তার এমন এক দরজা—যা পূর্ববর্তী কোনো জাতি বা ধর্ম নারীদের দেয়নি।
কোরআন নারীকে সম্মান দিয়েছে মা, স্ত্রী, কন্যা ও বোন—প্রত্যেক ভূমিকায়। আর হাদীস শরীফে জান্নাতী নারীর গুণাবলী এমনভাবে বর্ণিত হয়েছে, যা শুধু নারী নয়, পুরো মানবজাতির হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেই আলোকে হৃদয়ছোঁয়া এবং গভীর তাৎপর্যময় ১২টি হাদীস নিচে নান্দনিক ভাষায় উপস্থাপন করা হলো—
১. চারটি আমল—জান্নাতের সব দরজা উন্মুক্ত
হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত—
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে নারী
(১) পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত পড়বে,
(২) রমজানের রোজা রাখবে,
(৩) সতীত্ব রক্ষা করবে এবং
(৪) স্বামীকে মান্য করবে,
কিয়ামতের দিন তাকে বলা হবে—
“যে দরজা দিয়ে ইচ্ছে, সে দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করো।”
—[মিশকাত]
এ যেন চারটি আমল নারীকে জান্নাতের অনন্ত সুখের নিশ্চয়তা দেয়।
২. স্বামী সন্তুষ্ট রেখে মৃত্যু—জান্নাতের অঙ্গীকার
উম্মে সালমা রা. বলেন, নবীজি ﷺ ইরশাদ করেন—
“যে নারী স্বামীকে সন্তুষ্ট রেখে মৃত্যুবরণ করে, সে বেহেশতী হবে।”
—[তিরমিযী]
এ সম্মান শুধু তখনই, যখন স্বামী আল্লাহর নাফরমানিতে কিছু দাবি না করে। দাম্পত্য জীবনের পারস্পরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার এক অপূর্ব ঘোষণা এটি।
৩. ঘরের কাজ—মহান জিহাদের মর্যাদা
কিছু নারী নবীজি ﷺ-কে অভিযোগ করলেন, পুরুষরা জিহাদে অংশ নিয়ে বিশাল সওয়াব অর্জন করছে—তাদের জন্য কী আছে?
নবীজি ﷺ উত্তরে বললেন—
“নারীরা গৃহকর্ম করলে তা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের সমান সওয়াব হয়।”
—[দুররে মনসূর]
এ হাদীস নারীর দৈনন্দিন পরিশ্রমকে ইবাদতের উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছে।
৪. নেক নারী—হূরদের চেয়েও সম্মানিত
হাদীসে এসেছে—
দুনিয়ার সৎ, নেককার নারীরা বেহেশতে হূরদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারিণী হবে।
—[তাযকেরা]
অর্থাৎ আল্লাহর পথে নারীর পরিশ্রম, পর্দা, ইবাদত ও সহনশীলতা তাকে জান্নাতের রাণী বানিয়ে দেয়।
৫. প্রসবকালে মৃত্যু—শহীদের মর্যাদা
হযরত উবাদাহ বিন সামিত রা. থেকে বর্ণিত—
“যে নারী গর্ভাবস্থায় বা প্রসবকালে মারা যায়, সে শহীদের মর্যাদা লাভ করবে।”
—[কানযুল উম্মাল]
অর্থাৎ মাতৃত্বের কষ্ট ইসলাম অত্যন্ত মর্যাদা ও সম্মানের চোখে দেখে।
৬. সর্বোত্তম নারী—পবিত্র ও স্বামীপ্রেমী
নবীজি ﷺ বলেছেন—
“সে নারী সর্বোত্তম, যে সতীত্ব বজায় রাখে এবং স্বামীকে সর্বাধিক ভালোবাসে।”
—[কানযুল উম্মাল]
সতীত্ব ও দাম্পত্য ভালোবাসা—ইসলামে নারীর গুণমালার সেরা দুটো রত্ন।
৭. প্রথম জান্নাতী নারী—দ্বীনে অগ্রণী নারীরা
হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা. বলেন—
“আমার উম্মতের মধ্যে প্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবে সেই নারীরা, যারা দ্বীনের বিষয়ে সাহসী ও অগ্রণী।”
—[মুসনাদে আহমদ]
অর্থাৎ দ্বীনের কল্যাণে এগিয়ে যাওয়া নারীরা আল্লাহর বিশেষ প্রিয়।
৮. সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—ঈমানদার স্ত্রী
হযরত সাওবান রা. বর্ণনা করেন—রাসূল ﷺ বলেছেন—
“সর্বোৎকৃষ্ট জিনিস তিনটি:
(১) যিকিরকারী জিহ্বা,
(২) কৃতজ্ঞ হৃদয়,
(৩) এবং সেই ঈমানদার স্ত্রী—যে স্বামীকে দ্বীনের ক্ষেত্রে সহায়তা করে।”
—[তিরমিযী, ইবনে মাজাহ]
দাম্পত্য জীবনে প্রকৃত সৌভাগ্য হলো—একজন ঈমানদার, দীনদার স্ত্রী।
৯. কন্যার প্রতি ভালোবাসা—জান্নাতের নিশ্চয়তা
হযরত আয়েশা রা. একটি ঘটনায় বলেন—
দরিদ্র এক মা তার দুই মেয়েকে এক খেজুরও ভাগ করে দিলেন।
নবীজি ﷺ বললেন—
“আল্লাহ তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব করেছেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন।”
—[কানযুল উম্মাল]
কন্যাসন্তানকে লালন—জান্নাতের সহজতম পথে পৌঁছে দেয়।
১০. কন্যা সন্তান—সৌভাগ্যের নিদর্শন
হযরত ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন—
নবীজি ﷺ বলেছেন—
“নারীর সৌভাগ্যের নিদর্শন হলো তার প্রথম সন্তান কন্যা হওয়া।”
—[দুররে মনসূর]
ইসলামে কন্যা কখনোই বোঝা নয়—বরং রহমত ও বরকতের দরজা।
১১. রাতের ইবাদতে স্বামীকে জাগানো—রহমতের দরজা খোলে
আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেছেন—
নবীজি ﷺ বলেন—
“যে স্ত্রী রাতে নামাজ পড়ে এবং স্বামীকে জাগায়, এমনকি পানি ছিটিয়ে দিলেও—আল্লাহ তার উপর বিশেষ রহমত নাজিল করেন।”
—[আবু দাউদ]
পরিবারের ইবাদত জীবন নারীর হাতেই প্রাণ ফিরে পায়।
১২. স্বামীর সাথে উত্তম ব্যবহার—তার মধ্যেই জান্নাত অথবা জাহান্নাম
এক নারী নবীজি ﷺ-র কাছে এলেন। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন—
“স্বামীর সাথে কেমন আচরণ কর?”
তিনি বললেন—
“সাধ্যমতো সর্বোত্তম আচরণ করি।”
নবীজি ﷺ বললেন—
“স্বামীই তোমার জান্নাত এবং তিনিই তোমার জাহান্নাম।”
—[তারগীব]
অর্থাৎ দাম্পত্য আচরণ নারীর জান্নাতের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
ইসলাম নারীকে ইজ্জত দিয়েছে, সম্মান দিয়েছে, নিরাপত্তা দিয়েছে।
নারীকে করেছে মানবিক মর্যাদার শিখর। মা হিসেবে জান্নাত রেখেছে তার পায়ের নিচে, কন্যা হিসেবে বানিয়েছে বরকতের উৎস, স্ত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে দাম্পত্য জীবনের শান্তির কেন্দ্রবিন্দু।
ইসলাম নারীকে এক অপূর্ব ঘোষণা দিয়েছে—
“তুমি ইবাদতের পথচলায় পিছিয়ে নেই; বরং তোমার ধৈর্য, তোমার ইমান, তোমার সতীত্ব ও তোমার দাম্পত্য দায়িত্বই তোমাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দেয়।”
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com