এম. আব্দুল হালীম বাচ্চু
শৈশবে দেখা বড়াল নদী ছুটিতে বাড়ি এলেই; কখনও হাত বাড়িয়ে কখনও বা গলা বাড়িয়ে ডাকে আমাকে- ডেকে ডেকে কয়; আরে আসো না কেন আর; দাঁড়াও না কেন আগের মতো আমার তীরে?যখন কাঁচা ঘাট ছিল তখন কাদায় বসে জল ছুঁতে কত- এখন শান বাঁধানো ঘাট হয়েছে অথচ একবারও আসো না, দাঁড়াও না, বসো না, ছুঁয়েও দেখো না কতোকাল!শুনেছি, মাঝে মাঝে ডেমরা আসো; এ-ও শুনেছি, নতুন বাসস্ট্যান্ড থেকেই ফিরে যাও বাড়ি! একবার এলে কী এমন ক্ষতি হয় বলো? আমি বিশুদ্ধ বাতাস খাওয়াই, বিষ খাওয়াই না। এমনকি আমার বাতাসে নাই।
বাজার পুরাতন হয়েছে, নতুন বাসস্ট্যান্ড হয়েছে; তাতে কী? আমি তো যেখানে ছিলাম সেখানেই আছি; যেমন ছিলাম তেমনই আছি বরং আরও আধুনিক হয়েছি। তোমার শৈশবে আমার বুকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলেনি, এখন চলে। দেখেই যাও একবার এসে।প্রতি বছর শীত ও গ্রীষ্মের ছুটি পাও, দুই দুইটা ইদের ছুটি পাও; তবু তোমার সময় হয় না আমাকে দেখার!আমি কারও ঘর ভাঙিনি, কারও ভিটাও কাড়িনি; মনে রেখো আমি রাক্ষুসে নদী নই। বিশ্বাস না হলে একবার এসে দেখেই যাও না; তোমার চেনা রতনপুর গ্রাম,দেখেই যাও না কতগুণ জৌলুস বেড়েছে তার। শুধু কি রতনপুর গ্রাম? জৌলুস বেড়েছে দিঘুলিয়া, মাজাট, গোলকাটাসহ দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সকল গ্রামের।
আগের দিনে আমার বুকে দলবেঁধে কচুরিপানা ভাসত, ছোটো-বড়ো নৌকা চলত; মাঝে মাঝে বে-আক্কেল মাঝিকে ডোবাতে পারতাম; এখন আমি কিছুই পারি না; কারণ আমি এখন স্রোতহীন প্রায় জলশূন্য নদী!আমার বুক ফুঁড়ে ডেমরা-রতনপুর সেতু নির্মাণ চলছে; দেরিতে হচ্ছে বলে; আমার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিয়ো না; কারণ আমি তোমাদের মতো মানুষ নই। তোমাদের মতো রাজনীতির প্যাঁচও বুঝি না! আমি এখন বুঝি কীভাবে কাঁদতে হয়! এখন আমি আগের মতো গর্জনও করতে পারি না; ঢেউয়ের উপর ঢেউ তুলতেও পারি না! কারণ আমার পরান এখন তোমাদের মতো সূধীজনদের কব্জায়! এতক্ষণ বড়ালের স্বগোতক্তি ধাঁ করেই যেনআমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, ভাবছি কোনও এক বিকালে ধাঁ করেই ফিরে যাব শৈশবে, ফিরে যাব বড়ালের তীরে। মিশে যাব বড়ালের ঢেউয়ে।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com