মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি
এম.এ সালাম
শুক্রবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন। কলিজার টুকরা সন্তানেরা বায়না ধরে আম্মু আজ স্কুল ছুটি, চলো কোথাও ঘুরতে যাই।বাবাকে বলে,তুমি না বলেছিলে বাবা আজ পার্কে বেড়াতে নিয়ে যাবে।চলোনা আম্মু ছুটির দিনে বিকেলে মার্কেটে যাই।কলিজার টুকরো সন্তানরা এমনি হাজারো বায়না ধরতো ।এমনি স্মৃতির পাতায় মনে পড়ে অঝোরে কাঁদছে সোমবার মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক বিমান বিধ্বস্ত ঘটনায় প্রাণ হারানো স্বজনরা।তাজা ফুল ৭ বছরের জুনায়েদ বলেছিল,আম্মু আজ স্কুলে যাব না।মা তার সন্তান জুনায়েদকে আশ্বস্ত করেছিল,বাবা চলো স্কুল থেকে ঘুরে এসে বিকেলে তোমাকে নিয়ে ঘুরতে যাব।জুনায়েদ হাসিমুখে রেডি হয়ে স্কুলে গেল।কিন্ত ফিরে এলো নিথর দেহ।নিজের নাড়ি ছেড়া বাছাধন মিরসাদ মায়ের চোখের সামনে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে প্রাণ হারালো।সন্তান হারানোর কষ্টে স্ট্রোক করে চির বিদায় নিলেন মিরসাদের মা।একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক দম্পতির ছেলে সায়ান মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পায়নি।যে ক্যাম্পাস কেড়ে নিল তাদের আদরের সন্তান।চাকরি করবেনা,এ দেশেও থাকবেনা বলে অস্রুসিক্ত নয়নে কাঁদেন বাবা।১৮ বছরের বন্ধ্যাত্ব জীবন শায়লা-নাসিরের আদরের ধন শয়ন।ঐ দিন ছিল তার ১৪তম জন্মদিন।স্কুলে না গিয়ে আনন্দ করবে, জন্মদিন পালন করবে বলে মাকে বলেছিল। তবুও জোর করে মা পাঠিয়ে দিল স্কুলে।দুর্ঘটনার খবর পেয়ে চিৎকার করতে করতে ছুটে গেল স্কুলে।সারা শরির ঝলসানো ছেলেকে কোলে নিয়ে হাসপাতালে গেলে ডাক্তার বললো ইন্না লিল্লাহ।বলুন তো কি শান্তনা দিবেন শায়লাকে?১০ বছর বয়সী নিষ্পাপ আরিয়ান।আগুনের লেলিহান থেকে বাঁচার জন্য ছুটাছুটি করছিল।কিন্ত আরিয়ান রেখে গেল শুধুই স্মৃতি আর বাবা- মার সারা জীবনে চোখের জল।
লেলিহান শিখায় গলে গেছে আরেক মা ও মেয়ে।ঘটনার দিন প্রাণ হারালো বড়বোন নাফিয়া।পরের দিন জীবন যুদ্ধে হার মেনে সেই পথেই পাড়ি দিল ছোট ভাই নাফি।একই পরিবারে ২ সন্তানের চির বিদায়।কাকে বুকে নিবে পাগলপ্রায় বাবা-মা?দুর্ঘটনায় ফরিদপুরের রাইসা নিখোঁজ ছিল। অবশেষে সিএমএইচ হসপিটালে সনাক্ত হলো রাইসার মৃতদেহ।একটি পরিবারে একই বাবা-মার ভাগ্যবান ৩ টি সন্তান,সবাই পড়াশোনা করত মাইলস্টোন স্কুলে। ভাগ্যের পরিহাস,৩ টি কফিনে উঠলো ২ ভাই,১ বোন ফুলের মত পবিত্র ৩ টি সন্তান।নিজেররহাতে দাফন করালেন নির্বাক বাবা।আগামী প্রজন্ম,কোলের আলো নিভে গেল শোকে পাথর মায়ের।অগ্নি আর বিষাক্ত ধুম্র থেকে অনায়াসে বেরিয়ে আসতে পারতো,কিন্ত ২০ জন শিক্ষার্থীকে অগ্নিকান্ড হতে বাঁচাতে গিয়ে শেষে নিজেই দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চির বিদায় নিলেন মমতাময়ী মা, শিক্ষিকা মাহেরিন চৌধুরী।অনুরুপ ভাবে কবরে শায়িত হলেন মানুষ গড়ার কারিগর, সম্মানিত শিক্ষিকা মাসুকা বেগম।
স্কুলে শিক্ষা নিতে গিয়ে তারা “একঝাঁক স্বপ্ন” হয়ে ফিরলো। এভাবেই নিভে গেল বহুপ্রাণ।কুষ্টিয়ার গৃহবধু রজনী মেয়ে জুমজুমকে আনতে গিয়ে চির বিদায় নিলেন।বরিশালের সামিউল কেড়ে নিলো নির্মম আগুন। গাজীপুরের সায়মা আক্তারের ডা: হওয়ার স্বপ্ন কেড়ে নিল নিয়তি। টাঙ্গাইলের সখিপুরের হুমায়রার কফিনে শোকাহত বাবা বারবার চুমু দিয়ে জানায় শেষ শ্রদ্ধা।নিষ্ঠুর আগুনের লেলিহান থেকে বাদ পড়েনি রাঙামাটির সন্তান উক্যসাইন মারমা।এভাবে আর কয়জনের কথাই বা তুলে ধরবো?তাই ফিরে আসবেনা আর কখনও ওরা।বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তিকৃতরা যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে।বার্ণ ইউনিটে দগ্ধদের আর্তনাদে নীরবে চোখের পানি মুছছেন অভিভাবকরা।তাই তো বলছি,কিভাবে শান্তনা দেব এমন বুক খালি হওয়া মা ও স্বজনদের !প্রত্যেক বাবা-মার কাছেই তার সন্তান পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে প্রিয়।এমন ঘটনায় ৪/৫ দিন ধরে সারা দেশের শোকাহতদের মতই আমিও নিস্তব্ধ, বাকরুদ্ধ।যতবার মোবাইল খুলি,এমন লোমহর্ষক দৃশ্য আর আহাজারিতে কার না চোখে অশ্রু আসে?এমন ঘটনা দেখলেই বুকের ভেতরে কম্পন শুরু হয়।যার চলে যায়,সেই বুঝে সন্তান হারানোর বেদনা।এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণ,যারা এক সময় দেশের সুর্য সন্তান হতো।সব থেমে গেল এক অনাকাঙ্খিত/নিষ্ঠুর দুর্ঘটনায়।যা ভাবতেই অবাক লাগে।তাই তো ভাবছি,স্বজনরা এই শোক কীভাবে সহ্য করবে? তাদের সান্ত্বনা দেয়ার মতো কোনো ভাষা তো আমি খুজে পাচ্ছি না।
তবুও বলি,হে মহীয়ান,অসীম দয়াময় আল্লাহ!আমাদের সঠিক বুঝ ও বিবেক দান করুন। মাইল স্টোন স্কুল এন্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্ত ট্র্যাজেডিতে যারা কাতরাচ্ছে,তাদেরকে শেফা দান করো, সুস্থ্যতা করে মায়ের কোলে ফিরে দাও। আর নিহত নিষ্পাপদের বিনা হিসেবে বেহেস্ত নসীব করিও।আর এই কঠিন ও দু:সময়ে সকল শোকাহত বাবা-মা,পরিবারকে শোক সইবার মত ধৈর্য,শক্তি ও সাহস দান করিও।আমিন…
লেখক : শিক্ষক ও সমাজ কর্মী।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com