এম.আতিকুল ইসলাম বুলবুল
আমার নিবাস প্রত্যন্ত চলনবিলে। চলনবিলের সর্ব বৃহৎ মাছের আড়ত সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মহিষলুটিতে অবস্থিত। এ আড়তে মাছ চাষীরা যখন তাঁদের উৎপাদিত কষ্টার্জিত মাছ বিক্রি করতে যান, তখন স্থানীয় ভাষায় ‘ধলতার ফাঁদে’ পড়েন। অথাৎ ‘ধলতা’ হলো নির্দিষ্ট পরিমানের চেয়ে মণ প্রতি কিছু বেশি নেওয়া বা দেওয়া। যেমন- এ মাছের আড়তে ক্রেতা সাধারণ বিক্রেতা সাধারণের কাছ থেকে ৪০ কেজি মাছ কিনতে ৪৪ কিংবা ৪৫ কেজিতে এক মণ ধরে মাছ কেনেন। মুল কথা ৪০ কেজিতে এক মণ হলেও এখানে ৪৪ বা ৪৫ কেজিতে মণ ধরা হয়। অতিরিক্ত ৪- ৫ কেজি বেশি মাছ নেওয়াকেই ‘ধলতা’ বলে। যা মাছ চাষীদের ঠকানোর একটি পুরনো কৌশল। এই ‘ধলতা’ দেওয়া- নেওয়ার বিষয়টি মহিষলুটি আড়তের প্রায় ২৫ বছরের পুরনো খবর। এ ছাড়া অবশ্য, আমি ভেবে ছিলাম এটা শুধু মাছের ক্ষেত্রেই করা হয় আসলে তা না নয়। খবর আসছে, আমের জন্য বিখ্যাত উত্তর বঙ্গের রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, পাবনাসহ বিভিন্ন জেলায় আমের ভরা মৌসুমে আড়ত গুলোতে আমের মণ ৪০ কেজির বদলে ধরা হতো ৫৪ কেজিতে। আমি বলতে চাচ্ছি এখানে ‘ধলতা’ প্রথার মাধ্যমে মণে ১৪ কেজি বেশি নেওয়া হচ্ছে। যা অন্যায় ও অতিরঞ্জিত বটে। এ নিয়ে ৫ জুন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে আলোচনায় সর্বসম্মতিক্রমে কেজি দরে আম কেনাবেচার সিদ্ধান্ত হয়। এর তিন দিন পরই আড়তদাররা কেজি প্রতি ৩ টাকা কমিশন দাবি করেন।
এতে গত সোমবার থেকে বন্ধ হয়ে গেছে, রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জসহ এ অঞ্চলের আম কেনাবেচা। মুলতঃ আমের ভরা মৌসুমে আড়তদারদের যে কোন ভাবে আম চাষীদের ঠকানোর অনেক কৌশলের মধ্যে এটিও একটি। আমের আড়তদারদের যে সিদান্তে বিপাকে পড়েছেন চাপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের আম চাষিরা। এরপর আড়তদাররা ভিন্ন কৌশলে কেজিতে ৩ টাকা কমিশন দাবী করছেন। যারা কেজিতে ৩ টাকা বা মণে ১২০ টাকা, আড়তদারদের কমিশন আবদার মেটাতে চাচ্ছেন না, তাঁদের বাধ্য হয়ে বাজারে আম বিক্রিতে হয় আগের মতো ৫৪ কেজিতে মণ ধরে বিক্রি করতে হচ্ছে নতুবা কেজিতে ৩ টাকা কমিশন দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার প্রসিদ্ধ আম বাজার শিবগঞ্জের কানসাট, গোমস্তাপুরের রহনপুর ও ভেলাহাটসহ সব স্থানের চিত্র একই। অথচ রাজশাহী অঞ্চলের শুধু মাত্র চাপাইনবাবগঞ্জে সর্বাধিক ৪ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা আছে। পাশাপাশি আমের রাজা ফজলি আমের সিংহভাগই এ জেলায় উৎপাদিত হয়। এ জেলায় শত বছরের প্রাচিন ফজলি আমের অনেক বাগান এখনও অক্ষুন্ন আছে। ফজলি আম আকারে বড় এবং অধিক ফলন হওয়ার কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জ এখনো শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। এখন আলোচনায় আশি রাজশাহী অঞ্চলের ইতিহাস- ঐতিত্র্যের আমের কথায়। এক সময় ‘নাটোর ম্যাঙ্গো’ নামে পরিচিত ওই আমের জন্য অপেক্ষায় থাকতেন ওপার বাংলা কলকাতার আম প্রিয় মানুষ।
ইতিহাস বলে, রাজশাহীর বাঘা শাহি মসজিদ নির্মাণ করা হয় প্রায় ৫০০ বছর পূর্বে। বাঘা মসজিদের দেয়ালে থাকা টেরাকোটায় আছে আমের মোটিফ। যা দেখে বোঝা যায়, রাজশাহীর আমের ঐতিহ্য সু-প্রাচীন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ওপার বাংলার কলকাতার বাজারে বাঘার ফজলি ও ক্ষীরশাপাতি আম যারপর নাই রসানা বিলাসী অন্যতম ফল ছিল। ১৮১৩ সালের পূর্ব পর্যন্ত রাজশাহী জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ। ওই অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘আহা তিনি দুপুরের খাবারের পর আয়েশ করে আমটা খেতে পারলেন না!’ অর্থাৎ ১২০৫ সালে বখতিয়ার খিলজির আক্রমণের মুখে লক্ষণ সেনের পালানোর অর্থে বোঝানো হয়। এতে হাজার বছর আগেও রাজশাহীর আমের কত কদর ছিল, সেটা বোঝা যায়। ইতিহাস থেকে জানা যায়, রাজশাহীতে আমের প্রচলন করেছিলেন ওই অঞ্চলের তৎকালীন রাজা ও জমিদারেরা। তাঁরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিখ্যাত আমের আঁটি ও চারা গাছ নিয়ে এসে রাজশাহী অঞ্চলে বাগান করতেন। কিন্তু রাজশাহী অঞ্চলের আম বাজারে যুগ যুগ ধরে ‘ধলতা’র নামে যা চলছে এটা বহু বছরের আমচাষী কৃষকদের ঠকানোর কৌশল যা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আড়তদারদের চাতুরতায় মণ প্রতি ১৪ কেজি বেশি নেওয়ার এই প্রবণতার বিরুদ্ধে দেরিতে হলেওও আম অধ্যূষিত উত্তর বঙ্গের রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোরসহ বিভিন্ন জেলায় আমচাষীদের বোধদয় হতে শুরু করেছে। যদিও ‘আড়তদাররা কেজিতে ৩ টাকা কমিশনের দাবিতে আম কেনাবেচা বন্ধ করে দিয়েছেন। এটি অন্যায়। প্রশাসন এ নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।’ যাতে ত্যাক্ত- বিরক্ত আমচাষীরা। আর ‘ধলতার’র নামে ঠকে যাওয়া নাটোরের আমচাষীদের ভাষ্য, তাঁদের জেলায়ও প্রশাসন ‘ধলতা’ প্রথা বন্ধে বার কয়েক সভা করেছেন।
কিন্তু বাস্তবতা হল আম মৌসুমে এ নিয়ে আম ক্রেতা আড়তদাররা বাগড়া ধরলেও সমাধান মেলে না। আবার এমন খবরও আছে যে, চাপাইনবাবগঞ্জের কানসাটের আম ক্রেতা আড়তদারদের অহেতুক ও অযৌক্তিক কমিশন আদায় করার প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার ‘কৃষক সমিতি’ গঠন করেছেন আম চাষিরা। যেটা অনেক আগেই হওয়া উচিৎ ছিল। তারপরও দেরীতে হলেও এই ‘ধলতা’ প্রথা উচ্ছেদে সকল আমচাষীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরী। কেননা, বছরের পর বছর ঠকে যাওয়া আমচাষীদের আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে মৌসুমী আড়তদারদের ‘আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ’- হওয়া ঠেকাতে আমচাষী, স্থানীয় প্রশাসনের ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া আর বিকল্প নেই। হয়ত কোরবানির ঈদে টানা কয়েক দিন আম বিক্রির অধিকাংশ বাজার বন্ধ থাকায় বিক্রি করা যায়নি আম। এতে গাছেই পেকে ঝরতে শুরু করেছে হিমসাগর ও লক্ষণভোগ। এ কারণে মঙ্গলবার রাজশাহীর অধিকাংশ চাষি আম নিয়ে ছোটেন বানেশ্বর হাটে। তবে পাইকার কম থাকায় প্রত্যাশা অনুযায়ী দাম পাননি তাঁরা। তাই বলা বাহুল্য, আম নষ্ট হওয়ার পূর্বেই ‘ধলতা’ ‘কমিশন’ প্রথা বন্ধে কার্যকর প্রশাসনিক সমাধান আশু প্রয়োজন।
লেখক : বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com