—মুফতি খোন্দকার আমিনুল আবদুল্লাহ
(তরুণ আলোচক ও গবেষক, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব)
বর্তমান যুগ প্রযুক্তির যুগ। ডিজিটাল মাধ্যম আজ আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু প্রযুক্তির এই আশীর্বাদ, যদি নৈতিকতা ও বিবেকহীনভাবে ব্যবহার করা হয়, তবে তা ভয়ংকর অভিশাপে পরিণত হতে বেশি সময় লাগে না। আজকের সমাজে সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক রিল ও কনটেন্ট সংস্কৃতি আমাদের সামনে এমন এক অন্ধকার বাস্তবতা তুলে ধরেছে, যা কেবল লজ্জাজনকই নয়—অন্তরে জাগায় ভয়।
দিন দিন বাড়ছে এমন তরুণের সংখ্যা, যারা নিজের স্ত্রীকে দিয়ে অশালীন অঙ্গভঙ্গির ভিডিও বানিয়ে, তা সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করছে। অনেকে আবার গর্ব করে বলেন—‘আমরা দম্পতি কনটেন্ট ক্রিয়েটর!’ অথচ সেই কনটেন্টে আছে প্রকাশ্য শরীর প্রদর্শন, পর্দাহীনতা, এবং লজ্জাহীনতা—যা ইসলামী মূল্যবোধ তো বটেই, মানবিক শালীনতার সঙ্গেও যায় না।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না—স্ত্রীকে দিয়ে শরীর প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা আর দেহ ব্যবসার মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য কি আদৌ রয়েছে? পার্থক্য আছে শুধু রূপে; মূলনীতিতে নয়। একটিতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিক্রি হয় শরীর, আরেকটিতে মোবাইল ক্যামেরার সামনে। উদ্দেশ্য ও চরিত্র উভয়ই প্রায় অভিন্ন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন:
“তোমরা ব্যভিচারের ধারে-কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই এটা অশ্লীলতা এবং খুবই নিকৃষ্ট পথ।”
—(সূরা বনী ইসরাঈল: ৩২)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
“যখন কেউ লজ্জা বোধ হারিয়ে ফেলে, তখন সে যা ইচ্ছা তাই করে।”
—(সহিহ বুখারি)
স্ত্রী একজন পুরুষের সম্মানের অংশীদার, হৃদয়ের সাথি, জীবনের নির্ভরতা। তাকেই যদি অর্থ আর ভাইরাল ভিডিওর মোহে জনসমক্ষে শরীর প্রদর্শনের হাতিয়ার বানানো হয়—তবে তা কেবল এক নারীর অবমাননা নয়, বিবাহ ও পরিবার নামক পবিত্র প্রতিষ্ঠানেরও চরম অবক্ষয়। সন্তানদের সামনে এমন উদাহরণ রেখে কীভাবে আশা করা যায় একটি নৈতিক প্রজন্ম?
এসব রিল দেখে যে তরুণরা ভবিষ্যৎ গড়বে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে? তারা কি স্ত্রীকে শ্রদ্ধার আসনে বসাবে, নাকি তাকে দেখবে কনটেন্ট পার্টনার হিসেবে? এ এক ভয়ংকর স্লিপার এজেন্ট—যা বিনোদনের ছদ্মবেশে আমাদের সমাজকে গ্রাস করছে।
অথচ ইসলাম নারীকে দিয়েছে শ্রেষ্ঠ সম্মান। পর্দা, মর্যাদা ও নিরাপত্তার এমন সৌন্দর্যমণ্ডিত কাঠামো আজও পৃথিবীর কোনো সভ্যতায় নেই। আর আমরা নিজেরাই সেই নারীদের নিক্ষেপ করছি অনিরাপত্তা আর লজ্জাহীনতার গহ্বরে।
এই অবক্ষয় কেবল ব্যক্তির পাপ নয়—এটি সামাজিক এক ব্যাধি। কারণ একবার এই রিল ভাইরাল হলে, তা ছড়িয়ে পড়ে হাজারো মানুষের হৃদয়ে। নৈতিকতা নামের সংবেদনটুকু মুছে গিয়ে জায়গা করে নেয় ভিউয়ের নেশা। এটি ফিতনা, এটি অন্তর্জালের পর্দায় লুকিয়ে থাকা নীরব বিষ।
তবে আশার কথা হলো—প্রত্যাবর্তনের পথ এখনো খোলা।
সোশ্যাল মিডিয়াকে আমরা চাইলে জ্ঞান, ধর্ম, শিক্ষা, সাহিত্য কিংবা মানবিকতা ভিত্তিক গঠনমূলক কাজে ব্যবহার করতে পারি।
তরুণ প্রজন্ম চাইলে ইসলামি স্কিট, কার্টুন, দীনবিষয়ক আলোচনা, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষামূলক ভিডিও বানিয়ে অর্থ উপার্জন করতে পারে। এতে যেমন হালাল রিজিক আসে, তেমনি নিজের আত্মাও রক্ষা পায়।
উপসংহার:
ভিউ, লাইক, ফলোয়ার—এসবের পেছনে ছুটতে ছুটতে আমরা যেন আত্মার সৌন্দর্য, লজ্জার আবরণ, আর সম্পর্কের পবিত্রতা হারিয়ে না ফেলি।
কারণ, একবার পর্দা নামলে শুধু শরীর নয়—সঙ্গে সঙ্গে পড়ে যায় মর্যাদার পর্দাও।
আসুন, অশ্লীলতার এই বিকৃত সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। বিবেককে জাগিয়ে তুলি। পর্দা ও পবিত্রতার পথে সমাজকে ফিরিয়ে আনি।
এই দায় শুধু লেখকের নয়—আপনার, আমার, আমাদের সকলের।
পরিশেষে আমরা এ দোয়াই করি:
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে এই ধ্বংসাত্মক সংস্কৃতি থেকে হেফাজত করুন।
আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে হিদায়াতের আলোতে পরিচালিত করুন,
প্রযুক্তির ব্যবহার হোক হালাল, কল্যাণকর ও মানবতার উপকারে।
আমিন।
|
ReplyForward
|
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com