সারিয়ায়ে মুতা
মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ ।
মুতা(১৬৩) অঞ্চলটি শামের বালকা শহরের পার্শ্ববর্তী একটি এলাকা। বায়তুল মাকদিস থেকে প্রায় দুই মঞ্জিল দূরে। এখানেই মুসলমান ও রোমানদের মধ্যে প্রথম যু*দ্ধ সংঘটিত হয়।
এই যু*দ্ধের কারণ ছিল, রোম সম্রাট কায়সারের পক্ষ থেকে শামের বালকায় নিযুক্ত বসরার গভর্নর ছিল আমর ইবনু শুরাহবিল। সে রাসূল (ﷺ) এর দূত হারিস ইবনু উমায়ের রা.-কে হ/ত্যা করে। আর দূত হ/ত্যা ছিল তখনকার রীতিনীতির সম্পূর্ণ বিরোধী। এটা ছিল যু*দ্ধ ঘোষণার নামান্তর। ফলে মুসলিমদের যু*দ্ধ করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।
রাসূল (ﷺ) যখন হারিস ইবনু উমায়ের রা. এর শহিদ হওয়ার সংবাদ পান, তখন জায়েদ ইবনু হারিসা রা. এর নেতৃত্বে ৩ হাজার সেনার এক বাহিনী তার বিরুদ্ধে পাঠান। জায়েদ রা. এর বাহিনী যখন মুতা অঞ্চলে পৌঁছায়, তখন রোমানরাও এ সম্পর্কে জানতে পারে। ফলে তারা দেড় লাখ সেনার এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মুসলিমদের মোকাবিলায় যু*দ্ধ করতে এগিয়ে আসে।
কয়েকদিন যু*দ্ধ চলার পর আল্লাহ তাআলা দেড় লাখ কা/ফিরের বিশাল বাহিনীর অন্তরে মাত্র ৩ হাজার মুসলিমের এমন ভীতি সঞ্চার করেন যে, যু*দ্ধ থেকে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় তারা খুঁজে পায়নি।
মক্কা বিজয়হুদায়বিয়ার সন্ধিপত্রে যেসব শর্ত লেখা ছিল, মুসলিমরা তাঁদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সেগুলো পূর্ণ নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করছিলেন। কিন্তু অষ্টম হিজরিতে কুরাইশরা সেই সন্ধি ভঙ্গ করে বসে। রাসূল (ﷺ) একজন দূত পাঠিয়ে চুক্তিনামা নবায়নের জন্য কুরাইশদের সামনে তখন কয়েকটি শর্ত দেন এবং শেষের দিকে লিখে দেন যে, এ শর্তগুলো তাদের মনঃপুত না হলে হুদাবিয়ার সন্ধি ভেঙে গেছে বলে মনে করতে হবে। ফলে কুরাইশরা সন্ধি ভঙ্গের প্রস্তাবই গ্রহণ করে।
এরপর রাসূল (ﷺ) যু*দ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন এবং অষ্টম হিজরির ১০ রমজান মঙ্গলবার আসরের নামাজের পর ১০ হাজার সাহাবির বিশাল এক বাহিনী সঙ্গে নিয়ে মদিনা থেকে রওনা হন। তারপর ‘কুদায়বিয়া’ নামক স্থানে মাগরিবের সময় হলে সবাই সেখানে ইফতার করেন। মক্কার উপকণ্ঠে পৌঁছার পর খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. কে মুসলিম বাহিনীর একটি অংশসহ উপর দিকের রাস্তা দিয়ে মক্কায় প্রবেশের জন্য পাঠান। তাঁদের এটাও বলে দেন যে, ‘কেউ তোমাদের সঙ্গে সংঘর্ষে না জড়ালে তোমরাও তরবারি উন্মুক্ত করবে না।’
এদিকে রাসূল (ﷺ) নিজে অপর প্রান্ত দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন এবং সাধারণ ঘোষণা দেন- ‘যে মসজিদে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ। যে আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, সে-ও নিরাপদ। যে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখবে, সে-ও নিরাপদ।’ অবশ্য তিনি ১১ জন পুরুষ আর চারজন মহিলার রক্ত ক্ষমা করেননি। কারণ, তাদের অস্তিত্বই ছিল যাবতীয় বিশৃঙ্খলার মূল। কিন্তু তারা সবাই এদিক-সেদিক ছড়িয়ে পড়ে। পরে তাদের অধিকাংশই মক্কা বিজয়ের পর মদিনায় পৌঁছে ইসলাম গ্রহণ করে।
২০ রমজান শুক্রবার রাসূল (ﷺ) তাওয়াফ সম্পন্ন করেন। তখন পর্যন্ত কাবার আশপাশে ৩৬০টি মূর্তি যথারীতি বিদ্যমান ছিল। এ সময় রাসূল (ﷺ) এর হাতে একটি কাঠের টুকরো ছিল। তিনি যখন একটি মূর্তির পাশ দিয়ে যেতেন, তখনই কাঠ দ্বারা সেদিকে ইঙ্গিত করতেন আর মূর্তিটি মুখ থুবড়ে পড়ে যেত। তখন তাঁর পবিত্র মুখে উচ্চারিত হচ্ছিল :
وَ قُلۡ جَآءَ الۡحَقُّ وَ زَهَقَ الۡبَاطِلُ ؕ اِنَّ الۡبَاطِلَ کَانَ زَهُ
অনুবাদ : সত্য এসে গেছে আর মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে, মিথ্যা তো বিলুপ্ত হওয়ারই। [সুরা বনি ইসরাইল : ৮১]
মক্কা বিজয়ের পর কুরাইশদের সঙ্গে মুসলিমদের আচরণতাওয়াফ সমাপ্ত করে রাসূল (ﷺ)। কাবা শরিফের চাবি রক্ষক উসমান ইবনু তালহা শাইবির কাছ থেকে কাবার চাবি নিয়ে কাবার ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখান থেকে বেরিয়ে মাকামে ইবরাহিমে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে তিনি মসজিদে তাশরিফ নেন। এদিকে লোকজন গভীর উৎকণ্ঠায় এ অপেক্ষা করছিল যে, রাসূল (ﷺ) কুরাইশদের ব্যাপারে আজ কী নির্দেশ জারি করেন। কিন্তু সব দ্বিধা, সংশয় আর উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে রাসূল (ﷺ) কুরাইশদের সম্বোধন করে বলেন, ‘তোমারা সব দিক থেকে স্বাধীন ও নিরাপদ!’ তারপর তিনি কাবা ঘরের চাবিও তাদের হাতে ফেরত দিয়ে দেন।(১৬৪)
রাসূল (ﷺ) চরিত্র মাহাত্ম্য ও আবু সুফিয়ান (রা.) এর ইসলাম গ্রহণআবু সুফিয়ান (রা.)- যিনি রাসূল (ﷺ) এর বিরুদ্ধে কুরাইশদের সর্বাপেক্ষা বড় নেতা ছিলেন এবং তাদের পরিচালিত প্রায় সব যু*দ্ধে তিনি প্রধান সেনাপতির ভূমিকা পালন করে আসছিলেন- মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে গোপনে মুসলিম বাহিনীর সংবাদ সংগ্রহ করতে তিনি মক্কা থেকে বেরোলে সাহাবিরা তাঁকে গ্রেপ্তার করেন। বন্দি অবস্থায় তাঁকে রহমতে আলম রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে আনা হলে তিনি তাঁকে ক্ষমা করে দেন। রাসূল (ﷺ) এর মহত্ত্ব ও উদারতার ফলে আবু সুফিয়ান রা. তখনই কালিমা পড়ে মুসলমান হয়ে যান। ফলে আজ তাঁর নামের সঙ্গে ‘রাজিআল্লাহু আনহু’ উচ্চারণ করা হয়।
মক্কা বিজয়ের দিন এক ব্যক্তি ভীত হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে রাসূল (ﷺ) এর দরবারে উপস্থিত হয়। করুণার নবি (ﷺ) তাকে বলেন, ‘শান্ত হও, আমি কোনো রাজা-বাদশাহ নই, আমি তো একজন সাধারণ মায়ের সন্তান।’
মক্কা বিজয়ের পর ১৫ দিন(১৬৫) রাসূল (ﷺ) সেখানে অবস্থান করেন।
এ সময় মদিনার আনসাররা এ কথা ভেবে মনে কষ্ট পাচ্ছিলেন যে, এখন হয়তো রাসূল (ﷺ) মক্কায় থেকে যাবেন; আর আমরা তাঁর থেকে দূরে থেকে যাব। কিন্তু রাসূল (ﷺ) যখন তাঁদের এই সংশয় আঁচ করতে পারেন, তখন বলেন, ‘এখন তো আমার জীবন-মরণ তোমাদেরই সঙ্গে জড়িত।’
এরপর রাসূল (ﷺ) আত্তাব ইবনু উসায়েদ রা. কে মক্কার গভর্নর মনোনীত করে মদিনার উদ্দেশে রওনা হন।
হুনাইন যু*দ্ধমক্কা বিজয়ের পর সাধারণভাবে আরবের লোকেরা বিপুল সংখ্যায় ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। কেননা, তাঁদের মধ্যে এমন অনেক লোক ছিলেন, যাঁরা ইসলামের সত্যতা সম্পর্কে নিঃশ্চিন্ত হওয়া সত্ত্বেও কুরাইশদের ভয়ে ইসলাম গ্রহণে দেরি করছিলেন এবং মক্কা বিজয়ের অপেক্ষায় ছিলেন। এখন তাঁদের সবাই দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করেন। বাকি আরবদের তখন এমন শক্তি বা সাহস ছিল না যে, তারা ইসলামের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। কিন্তু হাওয়াজিন ও সাকিফ গোত্র দুটি নিজেদের আত্মসম্মানবোধ থেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যু*দ্ধের জন্য মক্কার দিকে এগোয়।
রাসূল (ﷺ) এ ব্যাপারে অবগত হয়ে ১২ হাজার সেনার এক বিশাল বাহিনী তাদের মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করেন। এঁদের মধ্যে ১০ হাজার ছিলেন আনসার ও মুহাজির, যাঁরা মক্কা বিজয়ের সময় মদিনা থেকে রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গে ছিলেন, আর ২ হাজার ছিলেন নওমুসলিম, যাঁরা মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এ সংখ্যাটি তখন পর্যন্ত মুসলিম বাহিনীর সবচেয়ে বড় সংখ্যা ছিল।
অষ্টম হিজরির ৬ শাওয়াল আল্লাহর এ বাহিনী রওনা হয়। তাঁরা যখন হুনাইন প্রান্তরে পৌঁছান, তখন পাহাড়ের ঘাঁটিতে আত্মগোপনকারী শত্রুরা অতর্কিতভাবে তাদের ওপর হামলা চালিয়ে বসে। যেহেতু তখনো সেনাদের সারি-বিন্যাসই সম্পন্ন হয়নি, তাই মুসলিম বাহিনীর সম্মুখভাগ পিছু হটা শুরু করে।
এই পিছু হটার বাহ্যিক কারণ সারি-বিন্যাসের অপূর্ণতা আর মক্কার নওমুসলিমদের ভয় বলা হলেও প্রকৃত কারণের ইঙ্গিত পবিত্র কুরআনে এভাবে রয়েছে যে- অর্থাৎ, মুসলিমরা তখন নিজেদের চিরাচরিত অভ্যাসের বিপরীতে নিজেদের সংখ্যাধিক্য এবং সাজ-সরঞ্জাম দেখে গর্ববোধ করছিলেন। কোনো কোনো সাহাবি, এমনকি আবু বকর রা.- এর মতো ব্যক্তির মুখ থেকে এ ধরনের কথা উচ্চারিত হয়েছিল যে, ‘আজ আমরা পরাজিত হতে পারি না।’ এ জন্য আল্লাহ তাঁদের সতর্ক করতে এ ব্যবস্থা নেন, যেন মুসলিমরা বুঝতে পারেন, জয়-পরাজয় আমাদের হাতে নয় এবং এটা তীর- তরবারির ওপরও নির্ভরশীল নয়। বদর যু*দ্ধে নিরস্ত্র হওয়া সত্ত্বেও এত বড় বিজয়; আর হুনাইন যু*দ্ধে এত বিপুল সাজসরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক পরাজয়ের এটাই সেই নিগূঢ় রহস্য।
রাসূল (ﷺ) তখন দুটি বর্ম পরে দুলদুলে বসা ছিলেন। নিজের বাহিনীকে পিছু হটতে দেখে তাঁর নির্দেশে আব্বাস রা. মুসলিমদের এক বীরত্বপূর্ণ আওয়াজ দ্বারা দৃঢ় থাকার আহ্বান জানান। এতে নড়বড়ে ও টালমাটাল বাহিনী পুনরায় সুদৃঢ় হয়ে যায় এবং উভয় দলের মধ্যে তুমুল যু*দ্ধ শুরু হয়।
একমুঠো মাটি দ্বারা শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করাএদিকে রাসূল (ﷺ) একমুঠো মাটি নিয়ে শত্রু বাহিনীর ওপর নিক্ষেপ করেন। আল্লাহর কুদরতে এই একমুঠো মাটি শত্রু বাহিনীর প্রত্যেক সেনার চোখে গিয়ে পড়ে। এমনকি একটি সেনাও তা থেকে রক্ষা পায়নি।(১৬৬) শেষ পর্যন্ত শত্রুবাহিনী ভীত হয়ে পালায় এবং পরাজিত হয়।
এই যুদ্ধে মুসলিমদের পক্ষে মাত্র চারজন এবং ৭০ জনের চেয়ে বেশি শত্রুসেনা নিহত হয়। মুসলমানরা তখন প্রতিশোধ স্পৃহায় শিশু ও মহিলাদের প্রতি আক্রমণে উদ্যত হলে রাসূল (ﷺ) তাঁদের এ কাজ থেকে বিরত রাখেন।
তায়েফ যু*দ্ধএরপর রাসূল (ﷺ) তায়েফের দিকে দৃষ্টি দেন। তায়েফ ছিল বনু সাকিফ ও বনু হাওয়াজিনের কেন্দ্র। প্রায় ১৮ দিন তাদের অবরুদ্ধ রাখার পরও বিজয় অর্জিত হয়নি। ফলে অবরোধ তুলে ফেরার সময় জিইররানা নামক স্থানে যখন পৌঁছান, তখন তায়েফের হাওয়াজিনের একটি প্রতিনিধিদল রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে এসে আবেদন করে, হুনাইন যু*দ্ধে মুসলিমদের হাতে তাদের যে সকল লোক বন্দি রয়েছে, তাদের যেন মুক্তি দেওয়া হয়। রাসূল (ﷺ) তাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে বন্দিদের মুক্ত করেন। এরপর তিঁনি (ﷺ) যখন তায়েফ থেকে মদিনায় ফিরে আসেন, তখন তায়েফের একটি প্রতিনিধিদল তাঁর খিদমতে এসে ইসলাম গ্রহণ করে।(১৬৭)
উমরায়ে জিইররানাযু*দ্ধ শেষে ফেরার পথে জিইরিরানা নামক স্থানে অবস্থানের সময় রাসূল (ﷺ) উমরা পালনের ইচ্ছা করেন। ফলে এখান থেকেই ইহরাম বেঁধে মক্কায় পৌঁছান। এরপর উমরা আদায় করে মদিনার উদ্দেশে রওনা দেন। অষ্টম হিজরির ৬ জিলকদ তিনি মদিনায় ফিরে আসেন।
টীকা :
(১৬৩) ‘মুতা’ জর্দানের বালকা এলাকার নিকটবর্তী একটি জনপদ। এই জায়গা থেকে বায়তুল মাকদিসের দূরত্ব মাত্র দুই মনজিল। এখানেই মুতার যু*দ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।
(১৬৪) তালখিসুস সিরাত।
(১৬৫) সিরাতে মুগলতাই। সহিহ বুখারির সপ্তম পৃষ্ঠার বর্ণায় আরও কয়েকটি মত পাওয়া যায়।
(১৬৬) সিরাতে মুগলতাই : ৬৭।
(১৬৭) প্রাগুক্ত : ৭২।
লেখা : বই – সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া ﷺ ; পৃষ্ঠা : ১০৮-১১২
লেখক : মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)
অনুবাদক : ইলিয়াস মশহুদ
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com