ইসলামি জিহাদ ও পাশ্চাত্যের যুদ্ধ
মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ ।
ইসলামি জি/হা*দ তথাকথিত সভ্যতার দাবিদার ইউরোপীয় জাতিসমূহের মতো পৃথিবী- বিধ্বংসী যু*দ্ধ ছিল না, যাতে শুধু নিজেদের কুপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করতে নারী-পুরুষ, দোষী- নির্দোষ নির্বিশেষে শহর-নগর অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার সঙ্গে ধ্বংস করা হয়। কবি আকবর ইলাহাবাদি চমৎকার বলেছেন,
ধ্বংসবীণা বেজে উঠেছে,
বিনাশ করেছে ঘর-দোর আর মানুষের প্রাণ
গোলার আঘাতে কেঁপে উঠেছে মাঠঘাট
জ্বলেপুড়ে সবকিছু ভস্ম হয়ে যাবে এবার।
তবে বাস্তব সত্য এটাই যে, মানুষ অন্যের চোখে সামান্য জিনিস পড়লেও তা দেখতে পায়; কিন্তু নিজের চোখে যদি কাঠের টুকরোও এসে পড়ে, সেটা দেখে না। কবি আকবর ইলাহাবাদি যথার্থই বলেছেন,
নিজের দোষ দেখে না, শুধু অন্যের ওপর মিথ্যা অভিযোগ দেয় ইসলাম নাকি তরবারির জোরে ছড়িয়েছে, এমন কুৎসা রটায় এতকিছু বলে, তবু এটা বলে না- তোপ কামান তবে কী ছড়ায়?
মোটকথা, আত্মরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক উভয় প্রকার জি*হা/দের উদ্দেশ্য ছিল শুধু উত্তম চরিত্রের ব্যাপক প্রসার ঘটানো, ইসলামের নিরাপত্তা বিধান এবং ইসলাম প্রচারের পথে যেসব প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হতো, সেগুলোর অপসারণ।(১২৫)
এসব ঘটনার প্রতি দৃষ্টিপাতের পর যেভাবে ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ ড্যাভিড স্যামুয়েল মারগোলিয়াথ (David Samuel Margoliouth) ও অন্যদের এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয় যে, ইসলামি জি*হা/দের উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে জোর-পূর্বক মুসলমান বানানো এবং লুটতরাজের মাধ্যমে নিজেদের জীবিকার সংস্থান করা, তেমনি ইসলামের ইতিহাস- ঐতিহ্য এবং সাহাবিদের দীর্ঘদিনের আচার-অভ্যাস ও কাজসমূহ একত্রিত করলে আর কোনো সন্দেহ থাকে না যে, ইসলামে যেমন নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে আত্মরক্ষামূলক জি/হা*দ ফরজ করা হয়েছে, তেমনি ভবিষ্যৎ-নিরাপত্তা ও ইসলামপ্রচারের বাধাগুলো দূর করতে আক্রমণাত্মক জি/হা*দও কিয়ামত পর্যন্ত ফরজ করা হয়েছে। আত্মরক্ষামূলক জি/হা*দের উদ্দেশ্য যেমন মানুষকে বলপূর্বক মুসলমান বানানো নয়, তেমনি আক্রমণাত্মক জি/হা*দের উদ্দেশ্যও কখনো তা হতে পারে না। বিশেষ করে যেখানে উপস্থিত যু/দ্ধ ময়দানেও ইসলাম কা/ফিরদেরকে নিজের আশ্রয়ে স্থান দিতে এবং কু/ফরির ওপর বহাল থাকা সত্ত্বেও তাদের জানমাল ও সম্ভ্রম রক্ষায় গুরুত্ব দিয়েছে, যেভাবে একজন মুসলমানকে রক্ষা করা হয়ে পৃথিবীতে প্রকৃতশা আত্মরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক উভয় জি/হা*দই সমান। এ ছাড়া পৃথিবীতে প্রকৃত শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা এবং অত্যাচারীদের হাত থেকে দুর্বলদের রক্ষা করা ইত্যাদি, যা জি/হা*দের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, এতেও উভয় প্রকার জি/হা*দেরই ভূমিকা সমান।
অতএব, সন্দেহের কোনো কারণ নেই যে, ইসলামি ঐতিহ্যের বিকৃতি ঘটিয়ে আক্রমণাত্মক জি*হা-দ/কে অস্বীকার করতে হবে, যেমনটি আমাদের কোনো কোনো মুক্তবুদ্ধির অধিকারী ও স্বাধীন চিন্তাবিদরা করেছেন। এই সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর আমরা আমাদের মূল আলোচনায় চলে যাচ্ছি।
হিজরতের পর জি*হা/দ বা গাজওয়াসমূহের ধারাবাহিকতা শুরু হয়। সেগুলোর কোনো কোনোটিতে রাসূল (ﷺ) সশরীরে উপস্থিত ছিলেন; আর কোনোটিতে বিশেষ বিশেষ সাহাবির নেতৃত্বে বাহিনী পাঠিয়েছেন। ইতিহাসবিদদের পরিভাষায় প্রথম প্রকার জি/হা*দকে ‘গাজওয়া’ এবং দ্বিতীয় প্রকার জি/হা*দকে ‘সারিয়া’ বলা হয়। গাজওয়ার মোট সংখ্যা ২৩টি। এর মধ্যে ৯টিতে যুদ্ধ হয়েছিল; আর সারিয়ার সংখ্যা ৪৩টি। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এসব গাজওয়া ও সারিয়ার মধ্যে মুসলিমদের যু/দ্ধাস্ত্রের অপ্রতুলতা আর সেনা-স্বল্পতা সত্ত্বেও বিজয় সর্বদা তাঁদের পক্ষেই ছিল। অবশ্য উহুদযুদ্ধে প্রথমে বিজয় লাভের পর মুসলমানরা সাময়িকভাবে পরাজিত হন। তা-ও এ জন্য যে, সেনাদের একটি অংশ রাসূল (ﷺ) এর আদেশ পুরোপুরি পালন করেনি।
এসব গাজওয়া ও সারিয়াকে আরও সুস্পষ্ট করে বর্ণনার জন্য আমরা একটি ছকে সনভিত্তিক ধারাবাহিক উল্লেখ করছি। তবে গাজওয়া ও সারিয়াসমূহের তারিখ ও সংখ্যার ব্যাপারে যেহেতু মতভেদ রয়েছে, তাই আমরা সেসব মতভেদ পরিহার করে সব বর্ণনায় হাফিজুল হাদিস আল্লামা মুগলতাই রাহ. রচিত সিরাতের ওপরই নির্ভর করেছি।
গাজওয়া ও সারিয়াসমূহ
প্রথম হিজরিসারিয়া : এ বছর দুটি সারিয়া পাঠানো হয় :
১. সারিয়ায়ে হামজা রা. ও ২. সারিয়ায়ে উবায়দা রা.।
কোনো গাজওয়া সংঘটিত হয়নি।
দ্বিতীয় হিজরিগাজওয়া : এ বছর পাঁচটি গাজওয়া সংঘটিত হয় :
১. গাজওয়ায়ে আবওয়া। এটাকে গাজওয়ায়ে ওয়াদ্দানও বলা হয়। ২. গাজওয়ায়ে বুওয়াত। ৩. গাজওয়ায়ে বদরে কুবরা। ৪. গাজওয়ায়ে বনি কায়নুকা। ৫. গাজওয়ায়ে সাবিক।
সারিয়া : এ বছর তিনটি সারিয়া পাঠানো হয়: ১. সারিয়ায়ে আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ রা.। ২. সারিয়ায়ে উমায়ের রা.। ৩. সারিয়ায়ে সালিম রা.। এ বছরের গাজওয়াসমূহে গাজওয়ায়ে বদরই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয় হিজরিটীকা :(১২৫) ইউরোপীয়দের হাতে সংঘটিত সেই র/ক্তাক্ত ইতিহাসের পৃষ্ঠাগুলো যদি সামনে রাখা হয়, যে ইতিহাস স্পেনের উত্থান-পথনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাহলে তাদের কথিত সভ্যতা-সংস্কৃতির মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যাবে। খোদ ইউরোপীয় ইতিহাসবিদদের বর্ণনা ও স্বীকারোক্তি অনুযায়ী দেখা যায়, নবম থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত স্পেনে হ/ত্যা, গু/ম, অ/পহরণসহ এমন কোনো অত্যাচার-নির্যাতন নেই, যা তারা করেনি এবং এর মাধ্যমে জোরপূর্বক মুসলমানদের খ্রি/ষ্টধর্মগ্রহণে বাধ্য করা হয়নি। হাজার হাজার মুসলমানকে আ/গুনে পুড়িয়ে মা/রা হয়েছে, হ/ত্যা করা হয়েছে। অসংখ্য মুসলমানকে বন্দি করে তাদের চোখের সামনে তাদের সন্তানদের জ/বাই করে হ/ত্যা করা হয়েছে। লাখ লাখ মুসলমান দ্বীন হিফাজতের লক্ষ্যে হিজরত করতে বাধ্য হয়েছেন। গ্রানাডার ময়দানে মুসলিম মনীষীদের লেখা ৮০ হাজার গ্রন্থের মূল্যবান পান্ডুলিপি জ্বালিয়ে ছাই করা হয়েছে। এ ছাড়া ষোড়শ শতাব্দীতে সম্রাট ফিলিপ তার সাম্রাজ্যে আরবি ভাষায় একটি শব্দ উচ্চারণকেও অপরাধ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল। সেখানে মুসলিম স্থাপত্যনিদর্শনসমূহ নিশ্চিহ্ন করা হয়। কর্ডোভার অনন্য সুন্দর জামে মসজিদে একাধিক গি/র্জা তৈরি করা হয়। বিশ্ব বিখ্যাত স্থাপত্যনিদর্শন আল-হামরা ও আজ-জুহরা প্রাসাদ, যাতে ১২ হাজার গম্বুজ ছিল এবং সেখান থেকে প্রতিদিন পাঁচবার আজানের ধ্বনি গুঞ্জরিত হতো, তাতে গির্জা তৈরি করা হয়, যা আজও বিদ্যমান। দ্র. গাবিবুল উনস ও হাজিবুহা, মুহাম্মাদ করদ আলি।
(১২৬) সিরাতে মুগলতাই : ৪০। কোনো কোনো বর্ণনায় রয়েছে, এই অভিযান দ্বিতীয় হিজরির শাওয়ালে রওনা হয়েছিল। এ ছাড়া অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে, এ সারিয়া গাজওয়ায়ে আবওয়ার পরে পাঠানো হয়েছিল।
বই – সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া ﷺ ; পৃষ্ঠা : ৭৫-৮১
লেখক : মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)
অনুবাদক : ইলিয়াস মশহুদ
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com