সীরাত সিরিজ

Spread the love

সীরাত সিরিজ

 (পর্ব – ১২ )
প্রসঙ্গ : মদিনায় ইসলাম এবং ইসলামের প্রথম মাদ্রাসা
মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ 
🟩 মদিনায় ইসলাম
একটানা দীর্ঘ ১০টি বছর রাসূল (ﷺ) আরবের গোত্রসমূহকে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। আরবের এমন কোনো মজলিস ও সভা নেই, যেখানে গিয়ে সত্যের দাওয়াত দেননি। হজের মৌসুম, উকাজের মেলা এবং জিলমাজাজ ইত্যাদিতে ঘরে ঘরে গিয়ে তিনি মানুষকে সত্যের প্রতি আহ্বান করতে থাকেন। কিন্তু তারা এর প্রতি উত্তরে তাঁকে সর্বপ্রকার কষ্ট দিতে থাকে এবং ঠাট্টা বিদ্রুপের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। তারা বলত, ‘প্রথমে নিজের গোত্রকে মুসলমান বানান, তারপর আমাদের হিদায়াত করতে আসুন।’ এভাবে দীর্ঘ সময় চলে যায়। এরপর আল্লাহ যখন ইচ্ছা করেন, ইসলামের প্রচার ও উন্নতি হোক, তখন তিনি মদিনার আউস গোত্রের কতিপয় লোককে রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে পাঠিয়ে দেন, যাঁদের মধ্যে আসআদ ইবনু জুরারা ও জাকওয়ান ইবনু আবদি কায়েস নামের দুজন সে বছরই ইসলাম গ্রহণে ধন্য হন।
পরবর্তী বছর আউস গোত্রের আরও কিছু লোক আসেন, যাঁদের ছয় বা আটজন ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূল (ﷺ) তখন তাঁদের জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা কি আল্লাহর সত্যবাণী প্রচারে আমাকে সাহায্য করবে?’ তাঁরা জবাব দেন, ‘আল্লাহর রাসুল, বর্তমানে আমাদের আউস ও খাজরাজের(৯৬) মধ্যে গৃহযু/দ্ধ চলছে। আপনি এখন মদিনায় তাশরিফ নিলে আপনার হাতে বায়আতের ব্যাপারে সবাই একমত হবে না। আপনি আপাতত এক বছরের জন্য এ সিদ্ধান্ত মুলতুবি রাখুন। হতে পারে, আমাদের মধ্যে সন্ধি হয়ে যাবে এবং আউস ও খাজরাজ উভয় গোত্র মিলে একসঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করে নেব। আগামী বছর আমরা আবারও আপনার কাছে আসব, তখন এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।। পরে তাঁরা সবাই মদিনায় ফিরে যান। মদিনায় বনু জুরাইকের মসজিদে প্রথম কুরআন তিলাওয়াত করা হয়।
মূলত আল্লাহর অভিপ্রায় ছিল যে, মদিনায় ইসলামের প্রসার ঘটুক। ফলে আউস ও খাজরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে মাত্র এক বছরেই অধিকাংশ ঝগড়ার মীমাংসা হয়ে যায় এবং ওয়াদামতো পরের বছর হজের মৌসুমে ১২ জন লোক মক্কায় রাসূল (ﷺ) এর কাছে যান। এর মধ্যে ১০ জন ছিলেন খাজরাজের; আর দুজন আউসের। তাঁদের মধ্য থেকে যারা গত বছর মুসলমান হননি, তাঁরাও এবার মুসলমান হয়ে যান এবং সবাই রাসূল (ﷺ) এর পবিত্র হাতে বায়আত হন। এই বায়আত যেহেতু প্রথমে আকাবা(৯৭) নামক স্থানের কাছে হয়েছিল, তাই একে ‘বায়আতে আকাবায়ে উলা’ বা আকাবার প্রথম বায়আত নামে অভিহিত করা হয়।(৯৮)
তাঁরা মুসলমান হয়ে ফিরে যাওয়ার পর মদিনার ঘরে ঘরে ইসলামের চর্চা শুরু হয়ে যায় এবং প্রতিটি আসরে-মজলিসে এই একটি কথারই আলোচনা চলতে থাকে।
🟩 ইসলামের প্রথম মাদরাসা
মদিনায় পৌঁছে আউস ও খাজরাজের দায়িত্বশীলগণ রাসূল (ﷺ) এর কাছে চিঠি লেখেন, ❝আল্লাহর মেহেরবানিতে এখানে ইসলামের প্রচার হয়েছে। এখন এমন একজন সাহাবিকে আমাদের এখানে পাঠিয়ে দিন, যিনি আমাদের কুরআন শিক্ষা দেবেন, লোকদের ইসলামের দিকে দাওয়াত দেবেন, শরিয়তের বিধান সম্পর্কে আমাদের অবহিত করবেন এবং নামাজের সময় ইমামতি করবেন।❞
তাঁদের চিঠি পেয়ে রাসূল (ﷺ) তখন মুসআব ইবনু উমায়ের রা.-কে লোকদের কুরআনের শিক্ষা দিতে মদিনায় পাঠান। এভাবে ইসলামের প্রথম মাদরাসার ভিত্তি স্থাপিত হয় মদিনায়।(৯৯)
পরের বছর হজের মৌসুমে মদিনা থেকে বিরাট এক কাফেলা মক্কায় আসে। তাঁদের মধ্যে ৭০ জন পুরুষ ও ২ জন মহিলা ছিলেন। রাসূল (ﷺ) তাঁদের স্বাগত জানান এবং রাতে আকাবার কাছে তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রতিশ্রুতি দেন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মধ্যরাতে সবাই জমায়েত হন। রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গে তাঁর চাচা আব্বাস রা.-ও উপস্থিত ছিলেন। তবে তখনো তিনি ইমান আনেননি।
যখন সবাই সমবেত হন, তখন আব্বাস রা. উপস্থিত সবাইকে সম্বোধন করে বলেন, ‘এ হচ্ছে আমার ভাতিজা মুহাম্মাদ। সর্বদা আপন গোত্রে সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করে আসছে। আপনারা যাঁরা তাঁকে মদিনায় নিয়ে যেতে চাইছেন, তাঁরা ভেবে দেখুন, যদি আপনারা তাঁর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার যথাযথভাবে পালন করতে পারেন এবং শত্রুদের হাত থেকে তাঁকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পারেন, তবে এ দায়িত্ব গ্রহণে এগিয়ে আসুন। অন্যথায় তাঁকে তাঁর নিজের গোত্রেই থাকতে দিন।’
জবাবে মদিনার কাফেলা প্রধান বলেন, ‘নিশ্চয় আমরা এই দায়িত্ব নিচ্ছি এবং তাঁর সঙ্গে কৃত বায়আতের পূর্ণ বাস্তবায়নই আমাদের একমাত্র কাম্য।’ এ কথা শুনে এই অঙ্গীকার ও বায়আতকে দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে আসআদ ইবনু জুরারা রা. দাঁড়িয়ে বলেন, ‘হে মদিনাবাসী, একটু অপেক্ষা করো। তোমরা কি বুঝতে পারছ আজ তোমরা কোন বিষয়ে বায়আত করতে যাচ্ছ? বুঝে নাও, এই বায়আত গোটা আরব ও অনারবের বিরোধিতা এবং মোকাবিলার অঙ্গীকার। যদি তোমরা এটাকে পূরণ করতে পারো, তবেই বায়আত সম্পাদন করো। অন্যথায় নিজেদের অপারগতা প্রকাশ করে দাও।’ এ কথা শুনে সবাই একবাক্যে বলে ওঠেন, ‘আমরা কোনো অবস্থাতেই এ বায়আত থেকে পিছু হটব না।’এরপর তাঁরা বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আমরা যদি এই অঙ্গীকার পূরণ করি, তাহলে আমরা কী প্রতিদান পাব?’ তিনি বলেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত।’ এ কথা শুনে সবাই বলে ওঠেন, ‘আমরা এতেই সন্তুষ্ট আছি। আপনি আপনার পবিত্র হাত বাড়িয়ে দিন, আমরা বায়আত করব।’ তিনি তখন হাত বাড়ান আর সবাই তাঁর বায়আতলাভে ধন্য হন। আল্লাহ ই ভালো জানেন, রাসূল (ﷺ) এর শুভদৃষ্টি আর সামান্য কয়েকটি কথা ওই লোকগুলোর ওপর যে কী পরিমাণ প্রভাব ফেলেছিল, মাত্র কিছু সময়ের সাহচর্যের বরকতেই পার্থিব সকল সম্পর্ক এবং সম্মান ও সম্পদের মোহ অন্তর থেকে বেরিয়ে সেখানে শুধু এক আল্লাহর ভালোবাসার রং এতটাই গাঢ় হয়ে ওঠে যে, জানমাল, মানসম্মান সবকিছু এর বিনিময়ে ত্যাগ করতে তাঁরা প্রস্তুত হয়ে যান। আর এর ছাপ তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
এ প্রসঙ্গে এই বায়আতে উপস্থিত উম্মু আম্মারার সন্তান হুবাইবের ঘটনা প্রাসঙ্গিক। মিথ্যা নবুওয়াতের দাবিদার মুসায়লিমা কাজজাব তাঁকে গ্রেপ্তার করে তাঁর ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে তাঁকে হত্যা করে; কিন্তু এই অঙ্গীকারের বিপক্ষে একটি শব্দও তাঁর মুখ থেকে বের করাতে পারেনি। এই জালিম তাঁকে জিজ্ঞেস করত, ‘তুমি কি এটা সাক্ষ্য দাও যে, মুহাম্মাদ এ আল্লাহর রাসুল?’ তিনি বলতেন, ‘অবশ্যই।’ তখন সে পুনরায় জিজ্ঞেস করত, ‘তুমি কি এ কথারও সাক্ষ্য দাও যে, আমিও আল্লাহর রাসূল?’ উত্তরে বলতেন, ‘কখনো আমি এ সাক্ষ্য দিই না।’ তখন সে তাঁর একটি অঙ্গ কেঁটে ফেলত। এরপর আবারও এভাবে প্রশ্ন করত আর তিনি তার নবুওয়াতের দাবি অস্বীকার করতেন। তখন হতভাগাটি তাঁর আরেকটি অঙ্গ কেঁটে ফেলত। এভাবে একটি একটি করে তাঁর সমস্ত শরীর টুকরো টুকরো করে দিয়েছিল।(১০০)
হুবাইব রা. এভাবে শহিদ হয়ে যান; অথচ শরিয়তের অনুমতি থাকা সত্ত্বেও তিনি ইসলামের অঙ্গীকারের বিপক্ষে একটি শব্দও মুখ থেকে বের করেননি।
তোমার ভালোবাসা যদিও আমার জীবন করেছে ধ্বংস
শপথ তোমার চরণের, আমি করব না প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ।
এই বায়আতে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ছিল ৭৩ জন পুরুষ এবং ২ জন মহিলা। বায়আতটির নাম ‘বায়আতে আকাবায়ে সানিয়া’ বা আকাবার দ্বিতীয় বায়আত। এরপর রাসূল (ﷺ) তাদের মধ্য থেকে ১২ জনকে পুরো কাফেলার দায়িত্বশীল বানিয়ে দেন।(১০১)
টীকা : 
(৯৬) তখন মদিনার অধিবাসীরা মুশরিক ও আহলে কিতাব নামে দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। মুশরিকরা আবার বিরাট দুটি গোত্রে বিভক্ত ছিল-১. আউস ২. খাজরাজ। গোত্র দুটি সবসময় পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত থাকত এবং প্রায় ১২০ বছর পর্যন্ত তাদের পারস্পরিক এই যু/দ্ধের ধারা চলে আসছিল। সিরাতে হালবিয়া : ১/৪০। এভাবে আহলে কিতাবি বা ইয়াহুদিরাও দুই ভাগে বিভক্ত ছিল-বনু কুরায়জা ও বনু নাজির। এ দুটি গোত্রও পারস্পরিক যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত ছিল। বায়জাবি টীকাসহ।
(৯৭) জামরায়ে আকাবা, যা মিনার প্রথম অংশে অবস্থিত। হজ পালনকারীরা এখানেই কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। পরে এখানে একটি মসজিদও নির্মাণ করা হয়, যা ‘মসজিদে বায়আত’ নামে পরিচিত ছিল। সিরাতে হালবিয়া : ১/৪২। 
(৯৮) সিরাতে হালবিয়া : ১/৪২।
(৯৯) প্রাগুক্ত : ১/৪০৩।
(১০০) সিরাতে হালবিয়া : ১/৪০৯।
(১০১) প্রাগুক্ত : ৪১১।
লেখা : বই – সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া ﷺ ; পৃষ্ঠা : ৫৯-৬২
লেখক : মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)
অনুবাদক : ইলিয়াস মশহুদ
চলবে ইনশাআল্লাহ …
Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD