সীরাত সিরিজ

Spread the love

(পর্ব – ছয় )
প্রসঙ্গ : খাদিজা (রা.) সঙ্গে রাসূল (ﷺ) এর বিয়ে এবং খাদিজা (রা.) এর গর্ভে রাসূল (ﷺ) এর সন্তানাদি)

মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ ।

🟩 খাদিজা (রা.) সঙ্গে রাসূল (ﷺ) এর বিয়ে

খাদিজা (রা.) ছিলেন বুদ্ধিমতি ও বিচক্ষণ মহিলা। তখনকার আরবের ধনাঢ্য এক নারী। রাসূল (ﷺ) এর উত্তম চরিত্রমাধুর্য আর উন্নত বৈশিষ্ট্য দেখে তাঁর অন্তরে রাসূল (ﷺ) এর প্রতি অন্যরকম এক ভালোলাগা অনুভূত হয়। তৈরি হয় প্রগাঢ় বিশ্বাস ও পবিত্র ভালোবাসা। ফলে তাঁকে তিনি নিজের করে পেতে চাইলেন। এ জন্য নিজ থেকেই তিনি তাঁর কাছে সংবাদ পাঠান যে, রাসূল (ﷺ) রাজি হলে তাঁর সঙ্গে তিনি বিয়ে-বন্ধনে আবদ্ধ হতে চান।

রাসূল (ﷺ) খাদিজা (রা.) এর প্রস্তাবে সম্মত হয়ে তাঁর সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। তখন তাঁর বয়স ছিল ২১। (২৯)

আর খাদিজা (রা.) এর ৪০ বছর। তবে অনেকের মতে, খাদিজা রা. তখন ৪৫ বছরের পৌঢ় নারী ছিলেন।

রাসূল (ﷺ) এর বিয়ে অনুষ্ঠানে চাচা আবু তালিব এবং বনু হাশিম ও বনু মুজারের নেতৃস্থানীয় প্রায় সবাই উপস্থিত ছিলেন। বিয়ের খুতবা পাঠ করেন আবু তালিব। সে খুতবায় তিনি রাসূল (ﷺ) সম্পর্কে যেসব কথা বলেন, সেগুলো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আবু তালিব বলেন,
“এ হচ্ছে আবদুল্লাহর ছেলে মুহাম্মাদ। সহায়-সম্পদ কম থাকলেও সে উন্নত স্বভাব-চরিত্র এবং অনন্য গুণ-বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। ফলে সমাজের আর দশজনের চেয়ে সে এতটাই উপরে অবস্থান করছে যে, যদি কাউকে তাঁর বিপরীত দাঁড় করানো হয়, তাহলে সে তার থেকে অনেক উচ্চমর্যাদার অধিকারী প্রমাণিত হবে। কেননা, অর্থসম্পদ হচ্ছে ছায়ার মতো এবং প্রত্যাবর্তনশীল বস্তু; আর এই মুহাম্মাদ-যাঁর বংশমর্যাদা ও আত্মীয়তা সম্পর্কে আপনারা সবাই অবগত-সে খুওয়াইলিদের মেয়ে খাদিজাকে বিয়ে করতে যাচ্ছে। তাঁর বিয়ের মোহর থেকে নগদ যা দেবে এবং যা পরে পরিশোধযোগ্য, এর সব আমি প্রদান করব এবং এই দায়িত্ব আমি নিলাম। আল্লাহর কসম, ভবিষ্যতে সে বিপুল সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হবে।”

উপর্যুক্ত খুতবায় আবু তালিব রাসূল (ﷺ) সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন, তা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কেননা, রাসূল (ﷺ) এর বয়স তখন মাত্র ২১ বছর। এ বয়সেই তিনি চাচার কাছ থেকে তাঁর অনন্য ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে স্বীকৃতি লাভ করেন। এ ছাড়া তখনো তাঁর কাঁধে নবুওয়াতের গুরুভার অর্পিত হয়নি। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, আবু তালিব তখনো সেই পুরানো ধর্মমত ও বাপ-দাদার রীতি-বিশ্বাসে অটল ছিলেন, যে ধর্মমত ও রীতি নির্মূল করতে রাসূল (ﷺ) তাঁর সারাটি জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, সত্য কখনো গোপন রাখা যায় না, কোনো না কোনোভাবে একসময় তা প্রকাশ হবেই।

মোটকথা, খাদিজা রা. এর সঙ্গে রাসূল (ﷺ) এর বরকতময় বিয়ে সম্পন্ন হয়। তিনি রাসূল (ﷺ) এর সান্নিধ্যে দীর্ঘ ২৪ বছর অতিবাহিত করেন। এর মধ্যে কিছু সময় ওহি নাজিলের আগে এবং কিছু সময় পরে। বরকতময় দাম্পত্যজীবনের দীর্ঘ এ সময়ে রাসূল (ﷺ) অন্য কোনো মহিলাকে বিয়ে করেননি।

🟩 খাদিজা (রা.) এর গর্ভে রাসূল (ﷺ) এর সন্তানাদি

খাদিজা রা.-এর গর্ভে রাসূল (ﷺ) এর ছয়জন সন্তান জন্ম নেন। তন্মধ্যে দুজন ছেলে আর চারজন মেয়ে। ছেলে দুজনের নাম কাসিম ও তাহির। কাসিমের নামানুসারেই রাসূল (ﷺ) এর উপনাম ছিল ‘আবুল কাসিম’। আর তাহির সম্পর্কে বলা হয়, তাঁর প্রকৃত নাম আবদুল্লাহ।(৩০)

মেয়ে চারজনের নাম : ১. ফাতিমা রা.), ২. জায়নাব (রা.), ৩. রুকাইয়া (রা.) এবং ৪. উম্মু কুলসুম (রা.)। তাঁদের মধ্যে সবার বড় ছিলেন জায়নাব (রা.)।(৩১)

রাসূল (ﷺ) এর সকল সন্তানই খাদিজা (রা.) এর গর্ভজাত। তবে ইবরাহিম নামে তাঁর তৃতীয় একজন ছেলে ছিলেন, যিনি মারিয়া কিবতিয়া রা.(৩৩) -এর গর্ভে জন্মান। তাঁর এই তিন পুত্রসন্তানের সবাই শৈশবে ই/ন্তে*কাল করেন। তবে কাসিম সম্পর্কে কোনো কোনো বর্ণনায় জানা যায় যে, তিনি বাহনে চড়ার বয়সে উপনীত হয়েছিলেন।(৩৩)

🟩 রাসূল (ﷺ) এর চার কন্যা

১. ফাতিমা (রা.)
এ বিষয়ে উম্মাহর সবাই একমত যে, নবিকন্যাদের মধ্যে ফাতিমা রা. মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন। খোদ রাসূল (ﷺ) তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে বলেন, ‘ফাতিমা জান্নাতি মহিলাদের সরদার।'(৩৪)

দ্বিতীয় হিজরির জিলহজে আলি রা.-এর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়েতে ৪৮০ দিরহাম বা প্রায় ১৫ ভরি ওজনের রুপার সমান মোহর হিসেবে ধার্য করা হয়েছিল। ফাতিমা রা. এর বিয়ের সময় রাসূল (ﷺ) তাঁর সঙ্গে যেসব জিনিসপত্র দিয়েছিলেন, সেগুলো হচ্ছে: একটি চাদর, খেজুরের ছালভরতি একটি বালিশ, চামড়ার একটি গদি, দড়ির একটি খাট, চামড়া নির্মিত একটি পানির পাত্র এবং আটা পেষার একটি চাক্কি।(৩৫)
ফাতিমা রা. ঘরের সব কাজকর্ম নিজ হাতেই করতেন।

এই হচ্ছে জান্নাতি মহিলাদের সরদার, নবি দুলালি ফাতিমা রা.-এর বিয়ে, মোহর, জাহিজ বা উপহারের(৩৬) বিবরণ এবং তাঁদের দীনতাপূর্ণ জীবনের বাস্তব চিত্র। এসব দেখে কি সে-সকল নারী লজ্জিত ও কুণ্ঠিত হবে না, যারা বিয়ে-শাদিতে অনৈসলামিক বিভিন্ন প্রথা পালন করতে গিয়ে নিজেদের দীন ও দুনিয়া উভয়টাই নষ্ট করে দেন।
রাসূল (ﷺ) এর তিনজন পুত্র সন্তানের কেউ-ই বেঁচে থাকেননি। এতে হয়তো আল্লাহর অপার কোনো রহস্য রয়েছে। ফলে শুধু কন্যা সন্তানের মাধ্যমেই রাসূল (ﷺ) এর বংশধারা বিস্তৃত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আবার শুধু ফাতিমা রা.-এর সন্তানরাই দীর্ঘজীবন লাভ করেন। অন্য কারও কোনো সন্তানই হয়নি বা হলেও বেঁচে থাকেননি। ফাতিমার গর্ভে তিনজন ছেলে ও দুজন মেয়ে জন্মান-  হাসান (রা.), হুসাইন (রা.) ও মুহসিন। মুহসিন ছোট থাকতেই মা/রা যান। ফলে হাসান রা. ও হুসাইন রা. এর মাধ্যমে রাসূল (ﷺ) এর বংশধারা বিস্তার হয়েছে। তাঁর মেয়ে দুজন ছিলেন- উম্মু কুলসুম ও জায়নাব।

ফাতিমা রা. নবিজির মৃত্যুর ছয় মাস(৩৭) পর অর্থাৎ, ১১ হিজরির জামাদিউল উলার ১৩ তারিখে, ওয়াকিদির মতে ৩ রমজান; কারও মতে জামাদিউস সানির ৩ তারিখে ই/ন্তে*কাল করেন।

২. জায়নাব (রা.)
রাসূল (ﷺ) এর বয়স যখন ৩০ বছর (৬০১ খ্রিষ্টাব্দ), তখন তিনি জন্মান।(৩৮) রাসূল (ﷺ) তাঁকে আবুল আস ইবনু রাবির সঙ্গে বিয়ে দেন। তাঁর গর্ভে আলি নামে এক ছেলে আর উমামা নামে এক মেয়ে হয়। তবে আলি অল্পবয়সেই মা/রা যান। ফাতিমা রা.-এর ই/ন্তে*কালের পর আলি রা. উমামাকে বিয়ে করেন। তবে উমামার গর্ভে কোনো সন্তান হয়নি। জায়নাব রা. অষ্টম হিজরিতে ই/ন্তে*কাল করেন।

৩. রুকাইয়া (রা.)
রাসূল (ﷺ) এর বয়স যখন ৩৩ বছর, তখন রুকাইয়া রা. জন্মগ্রহণ করেন। উসমান রা.-এর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।(৩৯) উসমান রা. যখন হাবশায় হিজরত করেন, তখন রুকাইয়া রা.- ও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। দ্বিতীয় হিজরিতে বদরের যুদ্ধ শেষে রাসূল (ﷺ) যখন মদিনায় ফিরছিলেন, তখন রুকাইয়া রা. নিঃসন্তান অবস্থায় ই/ন্তে*কাল করেন। তিনি দু-বার হিজরত করেছেন-প্রথমে হাবশায় এরপর মদিনায়।

৪. উম্মু কুলসুম (রা.)
তাঁর মূল নাম জানা যায়নি। তিনি ‘উম্মু কুলসুম’ (কলুসুমের মা) উপনামেই পরিচিত। রুকাইয়া রা. মারা যাওয়ার পর তৃতীয় হিজরিতে উসমান রা.-এর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।(৪০) এ জন্য উসমানের উপাধি ছিল ‘জুননুরাইন’ বা দুই নুরের অধিকারী। উম্মু কুলসুমের কোনো সন্তান হয়নি। তিনি নবম হিজরিতে ই/ন্তে*কাল করেন। তাঁর ই/ন্তে*কালের পর রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘আমার যদি আর কোনো মেয়ে থাকত, তবে তাকেও আমি উসমানের সঙ্গে বিয়ে দিতাম।'(৪১)

🟩 মহিলাদের জন্য স্মরণীয় : সিরাতের নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় রয়েছে, রুকাইয়া রা. একবার স্বামী উসমান (রা.) এর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে রাসূল (ﷺ) এর কাছে অভিযোগ করতে এলে রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘নারীরা তাদের স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে, এটা আমি পছন্দ করি না। তুমি ঘরে ফিরে যাও।’ এ হচ্ছে মেয়েদের প্রতি পিতার শিক্ষার নমুনা।(৪২)

টীকা :
(২৯) বিয়ের সময় নবিজির বয়স কত ছিল, এ সম্পর্কে কয়েকটি মত পাওয়া যায়। যেমন: ২১, ২৩, ২৯ ও ৩০ বছর। সিরাতে মুগলতাই: ১৪। তবে সিরাতে মুসতাফাসহ অন্যান্য গ্রন্থে ২৫ বছরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
(৩০) জাদুল মাআদ গ্রন্থে তাহিরের মূল নাম ‘আবদুল্লাহ’; আর ‘তাইয়িব’ ও ‘তাহির’ তাঁর উপাধি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
(৩১) হাফিজ ইবনুল কাইয়িম রাহ, তাঁর জাদুল মাআদে এ সম্পর্কে অনেক মত উল্লেখ করেছেন। তাঁদের কেউ জায়নাব রা. কে, কেউ রুকাইয়া রা. কে আবার কেউ উম্মু কুলসুম রা. কে সবার বড় বলেছেন। আবদুল্লাহ ইবনু ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, নবি কন্যাদের মধ্যে সবার বড় ছিলেন রুকাইয়া রা. আর সবার ছোট ছিলেন উম্মু কুলসুম রা.। জাদুল মাআদ: ১/২৫।
(৩২) মারিয়া কিবতিয়া রা.-কে বাদশাহ মুকাওকিস রাসূল (ﷺ) কে উপঢৌকন হিসেবে দিয়েছিলেন। মুকাওকিসের পুরো নাম জুরাইজ ইবনু মাতা; আর মুকাওকিস হচ্ছে উপাধি। তিনি মিসর ও আলেকজান্দ্রিয়ার শাসনকর্তা ছিলেন। রাসূল (ﷺ) তাঁর কাছেও একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। আল্লামা মানসুরপুরি রাহ, তাঁর রাহমতুল লিল আলামিন গ্রন্থের ১৭৮ পৃষ্ঠা তাঁর প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন। ড. হামিদুল্লাহ তাঁর রাসুলুল্লাহর রাজনৈতিক জীবন গ্রন্থে এই বাদশাহর নাম ‘বনি ইয়ামিন’ বলে উল্লেখ করেছেন। দ্র. আর রাহিকুল মাখতুম, আল্লামা সাফিউর রাহমান মুবারকপুরি রাহ।
(৩৩) সিরাতে মুগলতাই।
(৩৪) সহিহ বুখারি : ৩৬২৪।
(৩৫) তাবাকাতু ইবনি সাআদ এবং অন্যান্য গ্রন্থ।
(৩৬) সাধারণভাবে ‘জাহিজ’-এর বাংলা অনুবাদ করা হয় যৌতুক। রাসূল (ﷺ) ঐ তাঁর আদরের মেয়ে ফাতিমা রা.-এর বিয়ের সময় যে ‘জাহিজ’ দিয়েছিলেন, হাদিস ও সিরাতের গ্রন্থাদিতে এর বর্ণনা রয়েছে। এ থেকে সরল চিন্তার অনেকে বলে ফেলেন, রাসূল (ﷺ)ও তো যৌতুক দিয়েছেন। এখানে জাহিজের স্বরূপের চেয়ে শব্দের ভ্রান্তিটাই তালগোল পাকিয়েছে।
জাহিজের ক্ষেত্রে ইসলামের ইতিহাসের ঘটনাগুলো স্বতঃস্ফূর্ত উপহারের ঘটনা। তবে আমাদের উপমহাদেশীয় প্রচলন এবং এ যুগের যৌতুকের ঘটনা হচ্ছে শর্ত করে, ধার্য করে উসুল করার নির্মমতার নমুনা। শুধু শব্দের মিলের কারণে দুটি বিষয়কে এক রকম মনে করা মারাত্মক ভ্রান্তিকর। উভয় ক্ষেত্রেই শব্দ এক রকম হলেও স্বরূপ ও তাৎপর্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। দ্র. মাসিক আল কাউসার, জুন ২০১১, লেখক : মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ।

Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD