আশিকুর রহমান (অনিরুদ্ধ)
বহুকাল পূর্বে শ্রী কমলাকান্ত চক্রবর্তী আফিমের অশেষ মহিমা প্রচার করিয়াছিলেন। আমি ইহার সত্যতা পর্যালোচনা করিতে বিগত ৯ ফালগুন ১৪২৪ বঙ্গাব্দে কিঞ্চিৎ আফিম সেবন করিয়াছি, অতঃপর অনেক সুখকর ঘটনা প্রত্যক্ষ করিয়াছি। অবশ্য একাধিক অপ্রীতিকর ঘটনাও প্রত্যক্ষ করিয়াছি। অদ্য সেই অপ্রীতিকর ঘটনাটি আপনাদিগের সমীপে পরিবেশন করিব। প্রিয় বন্ধুগণ! নিশ্চয় আপনাদের অন্তকরণে প্রশ্নের অঙ্কুর হইতেছে যে, আমি কেন আপনাদিকে সুখের ভাগী না করিয়া, দুঃখের ভাগী করিতে উচ্ছ্বসিত? কারণ আমি চাহি না যে, আপনারা দুধের মাছি হউন; বরং দুঃখের ভাগী হইয়া প্রকৃত বন্ধুত্বের শ্রী বৃদ্ধি করিবেন ইহাই আমার অভিপ্রেত। তবে শ্রবণ করুন।
অমাবশ্যার রাত্রি। কথিত আছে, এই রাত্রে ভূত-প্রেত সংসারে স্বরূপে আবির্ভূত হইয়া সংসারের চক্রে ক্রীড়া করিয়া থাকে। আমি ঠিক বলিতে পারিব না, যদি কোন মানব সন্তান এই ক্রীড়ার দর্শক হয়, তবে ইহা তাহাকে কতটা চিত্তানন্দ প্রদান করিবে। হ্যাঁ, আন্দাজ করিতেছি অনেক তন্ত্র-মন্ত্র ব্যয় করিয়াই উহাকে অন্যমনা করিতে হইবে। বন্ধুগণ! ইশ্বরের কৃপায় আমি ক্রীড়া বৈমুখ; সুতরাং কালক্ষয় করিয়া ভূত-পেতের ক্রীড়া দেখিবার তো কোন প্রশ্নই ওঠে না – আমি সায়াহ্নেই শয্যা গ্রহণ করিলাম। আমি শয্যাশ্রয়ে নিদ্রাচ্ছন্ন; সহসা মিলিত কণ্ঠের হট্রোগোল শ্রবণ করিলাম। অনন্তর ঘুমঘুম চোখে বাতায়ন খুলিয়া চাহিয়া দেখিলাম, বাহিরে দূরে কিছু অদ্ভূত অস্তিত্বের বিরাজ। আমি চোখে-মুখে জল ছিটাইয়া, প্রকৃতিস্থ হইয়া, পুনঃ বাহিরে চাহিয়া দেখিলাম, পৃথ্বীর সমুদয় ভাষার অক্ষরগুলো কি যেন করিতেছে। আমি কৌতূহলবশে ঐ দিকেই ধাবিত হইলাম। তথায় উপস্থিত হইয়া বুঝিলাম, উহা এক বিচার বৈঠক। বাংলা ভাষার অক্ষরগুলো, ইংরেজি ভাষার অক্ষরের বিরুদ্ধে বিচারের আহ্বান করিয়াছে।
বাংলা অক্ষর : মাননীয় বিচারপতি! এই বিলাতিরা আমাদিগকে স্থানচ্যুত করিয়া, ঐ স্থানাধিকার করিতে চাহিতেছে। আমাদিগের আর্জি, আপনি ইহার যথোচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়া, আমাদিগকে তথা ধরিত্রীর সমুদয় অক্ষরকে বিলুপ্তির করাল-গ্রাস হইতে উদ্ধার করুন। নচেৎ ইহাদিগের আগ্রাসনে আমরা বিলুপ্ত হইয়া যাইব।
ইংরেজি অক্ষর : হে ধর্মাবতার! আমরা উহাদিগের স্থান লইতে চাই না, কিন্তু বাঙ্গালরা যদি আমাদিগকে ভালোবাসিয়া গ্রহণ করে, আমরা কি করিতে পারি ? অতঃপর আমাকে ইঙ্গিত করিয়া কহিল, “ঐ তে একজন বাঙ্গাল, উহাকে জিজ্ঞেস করুন, আমরা নির্দোষ কি না।” ইংরেজি অক্ষরের আকুতি শুনিয়া বিচারপতি আমার দিকে মুখ ঘুরাইয়া কহিল, “হে মান্যবর! ইহাদিগের কথা কি সত্য ?” আমি নিঃসঙ্কোচে কহিলাম, “হ্যাঁ, কথা সত্য বটে; আমরা ‘ফেসবুকে’ আমাদিগের সুবিধার্থে ইংরেজি অক্ষরে বাংলা শব্দ লিখি।”
আমার বক্তব্য মাত্র শেষ হইয়াছে, এমন সময় উর্দূ অক্ষরগুলো চিৎকার করিয়া কহিল, “মাননীয় বিচারপতি! যত দোষ, এই মনুষ্য জাতির। এককালে ইহারা আপন স্বার্থে বাংলা শব্দে আমাদিগকে ব্যবহারে সম্মতি দেয় নাই। অথচ আজ ইহারাই আপন সুবিধার্থে বাংলা শব্দে ইংরেজি অক্ষরের অবাধ ব্যবহার করিতেছে। ইহাদের কারণে কোন এক পক্ষ বিকশিত হইবে আর কোন এক পক্ষ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাইবে, ইহা তো হইতে পারে না। মাননীয় বিচারপতি! ইহাদের দন্ডাদেশ করা উচিৎ।” আমি ইষৎ হাস্য করিয়া কহিলাম, “আরে আমরাই তো তোমাদিগের স্রষ্টা; অতএব, আমরা আমাদিগের সুবিধার্থেই তো তোমাদিগকে ব্যবহার করিব।”
আমার এহেন বাণীর প্রতুত্ত্যরে বিচারপতি কহিল, ” শুনুন, স্রষ্টার প্রধান কর্তব্য সৃষ্টিকে উত্তমরূপে সঞ্চালন করা; সৃষ্টিকে অচল করা স্রষ্টার বৈশিষ্ট্য নহে; সৃষ্টি আপন গতিতে চলিতে চলিতে আপনা আপনি বিধ্বস্ত হইবে অথবা অমরত্ব লাভ করিবে ইহাই সৃষ্টির শর্ত। আর যদি ইহার অন্যথা হয়, অর্থাৎ স্রষ্টার যথেচ্ছাচারে সৃষ্টি বিধ্বস্ত হয় বা ধ্বংসের সন্নিকটে যায়, তবে এরূপ স্রষ্টার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং যুদ্ধ ঘোষণা করা সমুচিত।” অতঃপর সমুদয় অক্ষরের পানে মুখ করিয়া পুনরপি বলিতে লাগিল, “ভাইসব! এই মনুষ্য জাতি যদিও বা আমাদিগের স্রষ্টা, তথাপি ইহারা স্রষ্টা এবং সৃষ্টির মাঝে যোগবাহী পরম্পরার অলঙ্ঘন করিয়াছে। আজ ইহাদের যথেচ্ছাচারে নির্দোষ বাংলা অক্ষরগুলো অস্তিত্বের সংকটে পড়িয়াছে। ভবিষ্যতে এই স্বৈরাচারী স্রষ্টারা আর কোন নির্দোষকে পেশন করিবে না ইহার কি কোন নিশ্চয়তা আছে? অবশ্যই নাই। ভাইসব! তবে বিলম্ব কেন ? আক্রমণ! ইহাদের বিষাক্ত ফনা বিচূর্ণ করুন।
গোত্রপতির আদেশ অবহেলিত হইয়াছে ইহা আমি কদাচিৎ শুনি নাই, আর না আমার দৃষ্টিগোচর হইয়াছে। আজও ইহার অন্যথা হইল না। সমুদয় অক্ষর তরিৎগতিতে আমার উপর আপতিত হইল। অতঃপর আমাকে এতই প্রহার করিল যে, আমি ধরাশায়ী হইলাম। অধিকন্ত দুই অক্ষর আসিয়া আমার টুঁটি চাপিয়া ধরিল। আমার শ্বাস প্রায় রুদ্ধ; এমতাবস্থায়, অকস্মাৎ শরীরে এতই বল পাইলাম যে, দুই হস্তে দুই অক্ষরের গলা দৃঢ়ভাবে চাপিয়া ধরিলাম, আর উহারা করুণ স্বরে বলিতে লাগিল, “ভাই, ছাড়িয়া দেন, অনির্বাণ, সুদীপ্ত। যখন বুঝিল ইহাতেও কাজ হইবে না, তখন একজন কোনমতে নিজেকে ছাড়াইয়া পাত্রে কিছু জল আনিয়া, আমার চোখে মুখে ঢালিয়া দিল। আমি জল মুছিয়া চাহিয়া দেখিলাম, কোন অক্ষর নাই; আমার দুই অনুচর অনির্বাণ, সুদীপ্ত ।
আমি বিস্মাভিভূত হইয়া কহিলাম, “তোমরা এখানে! অক্ষরগুলো কোথায়? অনুচর : অক্ষর ? উহাদিগের এইরূপ প্রশ্নে বুঝিলাম, এই ঘটনার সহিত উহাদিগের কোন সংশ্লেষণ নাই; কারণ ইহা তো আমার নেশার রাজ্যে ঘটিয়াছে। অতঃপর উহাদিগের কাঁধে ভর করিয়া বাটীর উদ্দেশ্য রওয়ানা হইলাম।
আশিকুর রহমান (অনিরুদ্ধ), তরুণ লেখক ও কবি। নাগেশ^রী, কুড়িগ্রাম।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com