আলহাজ্জ এ্যাড. আব্দুল ওহাব (বীর মুক্তিযোদ্ধা)
হযরত ইব্রাহিম (আঃ) হযরত নুহ (আঃ) এর বংশধর হযরত ইব্রাহিম (আঃ) নমরুদের রাজত্বকালে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম তারেখ। কিন্তু কোরআনে আছে আযর। নমরুদ ঐ সময়ে শক্তিশালী বাদশাহ ছিল। নমরুদ সিংহাসনে বসলে আমির, ওমরা, সৈন্য, জোতিষ, জাদুকর ঘিরে থাকত। নমরুদ তুরস্ক থেকে ভারত দখল করে নূহের বংশধরদের বশিভূত করে। অতপর স্থায়ীভাবে বাবেলে বসবাস করত। এই স্থানকে কুফা বলা হয়। নিষ্ঠুর নমরুদ এক নির্দেশ জারী করেন, সর্বত্র গর্ভবতী মায়ের পুত্র সন্তান হলে হত্যা করতে হবে। মায়ের সন্তানদের হত্যা করে বলে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর মা গোপনে মাঠের মধ্যে নির্জন গর্তে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) জন্মদান করেন। সে গর্ত নূরের আলোকে আলোকিত হয়ে পড়ে। মহান আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে হযরত জীব্রাইল (আঃ) সহযোগীতা করেন। আল্লাহর কুদরতে লালিত-পালিত হতে থাকেন। একদা আযর (পিতা) বলেন, হে বৎস্য আমাদের খোদা নমরুদ। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) বলেন, না বরং আপনাদের রব তো তিনি যিনি আসমান ও জমিনের স্রষ্টা। আর আমার এ বিশ্বাসীদের স্বাক্ষ্যদাতা। তৎকালে ধর্মীয় বিশ্বাসে মানুষ মূর্তি পূজা করত। একদা ইব্রাহিম (আঃ) মূর্তি ঘরে প্রবেশ করে ভেবে দেখেন যে, এই মূর্তিগুলো মিথ্যা। এগুলোকে ধ্বংস করাই ভালো। আল্লাহর নিকট থেকে পুনরূত্থান পাওয়া যাবে। তিনি কুড়াল দিয়ে সব মূর্তির হাত,পা,মুখ ভেঙ্গে দেন। সমাজের লোকজন বললেন, হে ইব্রাহিম মূর্তিগুলো কে ভাঙলো। ইব্রাহিম (আঃ) বলেন যে কথা বলে না, শুনতে পায় না, দেখতে পারেনা, চলতে পারেনা সেগুলোকে খোদা বলে থাক। আবার উপাসনাও কর। এই জবাব শুনে ওরা বলে, সবই সত্য।
হযরত ইব্রাহিম আ. কোরআনের ভাষায় বলেন “ তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন সবের উপাসনা করছ যেগুলো তোমাদের কোন উপকার করে না বা অপকার করে না। তার সম্প্রদায়ের লোকেরা কর্নপাত করে নাই বরং ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছে। ইব্রাহিম (আঃ)এর পিতা আযর মূর্তি তৈরী করে বিক্রয় করতো। তিনি পিতাকে বলেন, “হে পিতা জেনে রাখুন, মুক্তির একমাত্র পথ হলো তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। আপনি মূর্তি পূজা ছেড়ে তাওহিদের পথ অনুসরণ করুন। দুনিয়া ও আখিরাতে সৌভাগ্য লাভ হবে। পবিত্র সুরা মরিয়ামে ৪১-৪৫ নং আয়াতে আছে, “ হে মোহাম্মদ (দঃ) আপনি ইব্রাহিমের কথা স্বরণ করুন। তিনি সত্যবাদি নবী ছিলেন।
ইব্রাহিম (আঃ) এর জীবনে বহু ঘটনা ঘটেছে। মহান আল্লাহ তাকে রহম করেছেন। নমরুদের হুকুমে ইব্রাহিমকে বিরাট অগ্নি কুন্ডে চরক গাছের মাধ্যমে নিক্ষেপ করেন। ইব্রাহিম আঃ আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন। “হে আমার রব! আমাকে সাহায্য করুন। অগনিত ফেরেস্তা মন্ডলী আল্লাহর নিকট দোয়া করেন। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন (কোরআনে আছে), হে অগ্নি তুমি ইব্রাহিমের প্রতি শান্তিদায়ক হয়ে যাও। আর যারা তার অকল্যাণ কামনা করছিল তাদেরকে খারাপ অবস্থায় নিপতিত করো। আল্লাহ পানির একটি ঝর্না প্রবাহিত করেন। জীব্রাইল আঃ বেহেস্তী পোষাক তাকে পড়িয়ে তখতের উপর বসিয়ে দেন। নমরুদ ও লোকজন দেখলো আগুনের মাঝে ফুল বাগান পালংকে খুশিতে বসে আছেন। এই ঘটনা দেখে বহু লোক সত্য ধর্ম গ্রহণ করেন। বাদশাহ নমরুদ প্রাণপনে বাধা প্রদানের চেষ্টা করেন।
অতপর ইব্রাহিম (আঃ) সহচর সহ বাইতুল মোকাদ্দাস (জেরুজালেম) অভিমুখে যাত্রা করেন। সেখানে পৌছে সত্যদ্বীনের দাওয়াত দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে এক বাদশার অপরা সুন্দরী গুনবতী কন্যা সারাকে বিবাহ করেন। পরে ফিলিস্তিনে ফিরে এসে বসবাস করেন। এখানে আল্লাহর ইচ্ছাক্রমে জীব্রাইল (আঃ) একটি জান্নাতী পাথর এনে দিনযাপন করেন। এটাই মুসলমানদের প্রথম কিবলা। ইব্রাহিম আঃ বাবেল দেশ ত্যাগ করে শাম, ইয়েমেন সফর করেন। ইয়েমেনের বাদশা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। পরে দামেস্কে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দেন। বিভিন্ন দেশ ঘুরে অবশেষে বায়তুল মোকাদ্দাসে পৌছেন। তার আগমনে আনন্দিত হয়ে প্রথম স্ত্রী সারা স্বর্নমুদ্রা সদকা হিসাবে বিতরণ করেন। ২য় স্ত্রীর সাথে ঘর সংসার করা কালে পুত্র ইসমাইল (আঃ) জন্ম গ্রহণ করেন। প্রথম স্ত্রী সারা হাযেরাকে অন্য স্থানে রাখার পরামর্শ দেন।
ইব্রাহিম(আঃ) চিন্তিত হয়ে ওঠেন। উটের পৃষ্ঠে করে যাত্রা করেন। এবং বর্তমান মক্কার নিকট উপনীত হন। ইব্রাহিম (আঃ) জনমানব শূন্য পাহাড়ে হাযেরা ও শিশু পুত্র ইসমাইলকে রেখে যান। সূর্য উদয় হলে উত্তাপ বেড়ে অস্থীর হয়ে যায় পানির পিপাসায়। হাযেরা সাফা মারওয়া পাহাড়ে দৌড়াতে শুরু করেন। পানি পায় নাই। দেখেন শিশু পুত্র ইসমাইলের পায়ের আঘাতে পানির স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। হাযেরা পানি ধরে রাখার জন্য যমযমের পানি জমিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। আব যমযম (পানি স্থির হও) যমযমের পানি পৃথিবী বিখ্যাত বরকতের পানি হয়েছে। সব হাজি সাহেবেরা তৃপ্তিসহ পানি পান করেন। বিভিন্ন কাফেলার লোক এসে বসতি স্থাপন করেন ও কৃষি কাজ, পশু পালন করেন। হাজেরা ও ইসমাইল বাস করতে থাকেন।
হাদিসে আছে এক রাতে হযরত ইব্রাহিম আঃ স্বপ্নে দেখলেন, কোরবানী কর। তিনি উট কুরবানী করেন।এইভাবে ৪র্থ রাতে স্পস্টভাবে দেখলেন, কে যেন বলছেন, প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে কোরবানী কর। ঘুম থেকে উঠে স্ত্রী সারাকে বলেন, পুত্র ইসমাইলকে কোরবানী করতে হবে। মক্কায় যেতে হবে । ইব্রাহিম (আঃ) উটে আরোহন করে মক্কায় অবস্থিত হাযেরার নিকট পৌছান। এসময় ইসমাইলের বয়স ছিল ৯ বছর । ইব্রাহিম (আঃ) ইসমাইল (আঃ)কে দাওয়াতে নিয়ে যাবে। পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে অনেক দূরে যাওয়ার পর ইসমাইল (আঃ) পিতাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে পিতা আমাকে কোথায় নিয়ে চলেছেন। কোরআনের ভাষায় “ হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি, তোমাকে কোরবানী করছি। তোমার মত কি? (সুরা সোয়াদ ,আয়াত-১০২)। ইসমাইল (আঃ) পিতাকে বলেন, “ হে পিতা, আপনি যা করতে চান আপনি তা করে ফেলুন। ইনশাআল্লাহ আমাকে ধৈর্য্যশীল পাবেন। শয়তান ইবলিস বিভ্রান্ত করতে আসে । পিতা-পুত্র মিলে পাথর নিক্ষেপ করেন। সোট স্মরণে হজ্জের সময় হাজিদের পাথর নিক্ষেপ করতে হয়। পিতা-পুত্র মিনা বাজার এলাকায় এলে ইব্রাহিম আঃ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হাত পা বেঁধে শোয়ায়ে ইসমাইলের গলায় ছুড়ি চালান। কিন্তু গলা কাটে নাই। ইব্রাহিম আঃ ছুড়ি জমিনে ফেলে দেন। এবার ছুড়ি বলে, “ হে আল্লার নবী, আল্লাহ আপনাকে বলেছে কাটতে আর আমাকে বলেছে কাটা হতে বিরত থাকতে। আপনার হুকুমের চেয়ে আল্লাহর হুকুমই উত্তম। আল্লাহপাক জান্নাতি দুম্বা পাঠিয়ে দিলে উহা কোরবানী হয়ে যায়। ইসমাইল (আঃ) কে মা হাজরার নিকট হস্তান্তর করেন। পরে বাইতুল মোকাদ্দাসে ফিরে যান। উম্মতি মোহাম্মাদীর নিকট কোরবানীর তাৎপর্য অতিব গুরুত্বপূর্ণ। ইব্রাহিম (আঃ) স্বপ্নে দেখেন, একমাত্র প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আঃ)কে কোরবানী করতে বাইতুল মোকাদ্দাস থেকে মক্কায় এলেন কোরবানী করার জন্য। পুত্র ইসমাইল (আঃ) কে নিয়ে মিনা বাজার গিয়েছিলেন। প্রিয় পুত্রের গলায় ছুড়ি চালিয়ে ছিলেন। এটা কত বড় ত্যাগ ও মহান আল্লাহর প্রতি আস্থা ও ঈমানী জোর। তিনি শয়তানকে পাথর মেরে বিতারিত করেছেন। তার ঐ ত্যাগ আল্লাহ কবুল করেছেন। মুসলমান নর-নারীর উপর হজ্জ ফরজ করা হয়েছে। হজ্জ করতে গিয়ে ইব্রাহিম (আঃ) এর স্মৃতি বিজড়িত মক্কা, মাকামে ইব্রাহিম (আঃ), কোরবানীর জায়গা, পাথর মারার জায়গা, হাযেরার সাফা মারোয়া পাহারে দৌড়ানো ও যমযমের পানি পান করা, পশু, উট, দুম্বা, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, কোরবানী করা ইবাদত হিসেবে গন্য করা হয়েছে। কোনবানীর পশুর রক্ত মাটিতে পড়তেই আল্লাহ কবুল করেন। সামর্থবান কোরবানী না দিলে ফেরেস্তারা সে ব্যক্তির প্রতি লানত করতে থাকেন। একদা এক সাহাবি জিজ্ঞাসা করলেন,আল্লাহর রাসুল! এই কোরবানী কি জিনিষ । তিনি বলেন, “ তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আঃ) এর সুন্নাত । প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি নেকী।
পরিশেষে বলবো নবী ইব্রাহিম (আঃ) এঁর বর্ণাঢ্য জীবন ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলামের মর্মবানী প্রচার করেছেন। বাইতুল মোকাদ্দাস থেকে মক্কায় বারবার ছুটে এসেছেন। কাবাঘর নির্মাণ করে গৌরবময় ইতিহাসে স্থান লাভ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইব্রাহিম আঃ কে উন্নত মর্যাদা দিয়েছেন। আমরা ঈদুল আযহা ও কোরবানীর মাধ্যমে ইব্রাহিম (আঃ) ও ইসমাইল (আঃ) এর গৌরবময় ঘটনা স্বরণ করি। বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান পশু কুরবানী দিয়ে ত্যাগের মহিমা প্রকাশ করেন। মহান আল্লাহর সন্তোষ্টি লাভই যার একমাত্র লক্ষ্য। সে ত্যাগের আদর্শ চির জাগ্রত থাকবে।
লেখক ঃ বিশিষ্ট কবি ও প্রাবন্ধিক, গুরুদাসপুর , নাটোর।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com