আব্দুল কুদ্দুস তালুকদার
সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলাধীন আজকের পাকা রাস্তা, বিজলী বাতির ঝলকানিময়, দালান কোঠার ছড়াছড়ি বিশিষ্ট শহরের ন্যায় নিমগাছি বাজার অতীতে এমন ছিল না। তৎকালীন পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহুকুমার রায়গঞ্জ থানার সোনাখাড়া ইউনিয়নের আর দশটা অজপাড়া গাঁয়ের মতই ছিল এর দশা। যদিও ১৯৩০ সালে স্থাপিত একটা প্রাইমারী স্কুল ছিল এখানে যা আমরা ছোটবেলা থেকে দেখছি এবং সে স্কুলে ক্লাস ফাইভ অবধি পড়েছি। আমার জানা মতে, ঐতিহাসিক জয়সাগরের জন্য বিখ্যাত অত্র এলাকার বিশেষ করে নিমগাছি সন্নিহিত বেশীর ভাগ গ্রামের বর্তমান সিনিয়র সিটিজেন যাদের মোটামুটি শিক্ষিত বলা চলে তারা এই স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক শ্রীরামপুর গ্রামের অধিবাসী আলহাজ্ব আব্দুর রহমান তালুকদার জানান, ডেভেলপমেন্ট স্কীমের আওতায় ১৯৬৪ সনে বর্তমানের টিনসেড পূর্ব পশ্চিম লম্বা ঘরটি নির্মিত হয় যার চালা এখন নস্ট এবং ঘরটি পরিত্যক্ত ; যদিও ছাত্র – ছাত্রীর সংখ্যা বেশী হবার জন্য ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান চলছে ঐ জীর্ন গৃহেই রোদে পুড়ে বা বৃষ্টিতে ভিজে । তার আগে ছিল মাটির দেয়াল। তিনি ১৯৬০ সন থেকে প্রায় চল্লিশ বছর এখানে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন অবসর নেয়ার পূর্ব পর্যন্ত ; যদিও মাত্র কিছুদিন ডিউটি করেন পার্শ্ববর্তী রুপাখাড়া প্রাইমারী স্কুলে এবং সেখান থেকেই অবসর নেন। শিক্ষার দিক থেকে নিমগাছি এলাকা পিছিয়ে ছিল দেশের স্বাধীনতা পূর্বকালে আশংকাজনকভাবে। তবে ১৯৬৪ সনে নিমগাছি হাইস্কুল স্থাপিত হবার পর পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে শুরু করে।
যদিও কাগজ পত্রে স্কুলটি স্থাপিত ১৯৩৭ সনে বৃটিশ আমলে, বিশেষ করে স্কুলের নামে জমি দানের হিসাব করলে। বর্তমান প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান জিন্নাহ্ জানান, তার দাদা হাজী আহম্মদ আলী সরকার স্কুলটি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। স্কুলের গেটে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে হাজী আহম্মদ আলীর নামও লেখা মার্বেল পাথরে। অবশ্য ভূমিদাতা হিসাবে স্বর্গীয় গোকূল চন্দ্র মাহাতো এবং মওলা বক্স সরকারের নামও উৎকীর্ণ সেখানে। জানা যায়, মওলা বক্স সরকার ছিলেন হাজী আহম্মদ আলীর বড় ভাই সেরাত আলী সরকারের পূত্র। বৃটিশ আমলে হাজী আহম্মদ আলী তার বন্ধু গোকূল চন্দ্র মাহাতোকে বুঝিয়ে বিশেষ করে তার অবহেলিত মাহাতো তথা আদিবাসী সম্প্রদায়কে শিক্ষার আলোকে আলোকিত করতে স্কুলের জন্য জমিদানে রাজী করান। সোনাখাড়া ইউপির সাবেক মেম্বর ভূঁয়ট গ্রামের প্রবীণ নুর মোহাম্মদ শেখ জানান, তৎকালীন পঞ্চায়েত আব্দুল গফুর তালুকদার নিমগাছিতে হাইস্কুল স্থাপনের বিরোধী ছিলেন। তার চেষ্টা ছিল সোনাখাড়ায় হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার। পঞ্চায়েত সাব নানা স্থানে বলে বেড়াতেন, নিমগাছিতে হাইস্কুল হলে যে মাহাতো বা আদিবাসীরা বলা চলে পরনে বস্ত্র দিতে জানে না বা থাকে অর্ধ উলঙ্গ হয়ে তাদের সন্তানগণ শিক্ষিত হবে এবং এলাকার প্রভাবশালীদের মানবে না কিংবা মানীর মান রাখবে না, যেহেতু নিমগাছি ও তার পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে আদিবাসী লোকজনের বাস উল্লেখযোগ্য হারে। একথা জানতে পেরে গোকূল চন্দ্র মাহাতো কিছুটা আগ্রহভরে জমি দেন বিশেষ করে তার স্বজাতিদের শিক্ষিত করার মানসে। গোকুল চন্দ্র মাহাতোর বাড়ী ছিল তাড়াশ থানার দেশীগ্রাম ইউপির ভাটার পাড়া গ্রামে যা ডাকসাইটে পঞ্চায়েত আব্দুল গফুর তালুকদারের কমান্ডিং এরিয়ার বাইরে এবং নিমগাছি বাজার তথা গ্রামের পাশে।
ফলে আদিবাসী হলেও তার সমস্যা ছিল না। কারণ, ঐ সময়ে আদিবাসীগণ নিগৃহিত হতেন নানাভাবে প্রভাবশালীদের দ্বারা। গোকূল মাহাতোর স্বপ্ন বলতে গেলে স্বার্থক আজ। বর্তমানে এলাকার আদিবাসীগণ তথাকথিত এলিট শ্রেণির চেয়ে শিক্ষা – দীক্ষা সহ সামাজিক সকল সেক্টরে এগিয়ে তা চোখ বুঁজে বলা চলে। যদিও এর পেছনে তাদের জন্য সরকারী কোটা সিস্টেম সবচেয়ে বেশী অবদান রেখেছে। তবে ওরা পরিশ্রমী হিসেবে তাদের জন্য প্রাপ্য সন্মান আদায় করেছে তাও সত্যি। গোকূল মাহাতোর দানকৃত জমিতে ঘরও তোলা হয় কিন্তু প্রয়োজনীয় মঞ্জুরী না পাওয়ায় এবং যারা উদ্দ্যোক্তা তাদের সমন্বয়হীনতার কারণে স্কুলের কার্যক্রম আর এগোয় নি। গ্রামের জমিদার ভাদু বাবু যার পৈত্রিক নিবাস উল্লাপাড়া তিনি তার আত্মীয়গনকে এনে স্কুলের টিচার নিয়োগ দেন। কিন্তু বেতন ঠিকমত দিতে না পারায় টিচারগন চলে যান স্কুল ছেড়ে। ১৯৩৭ সনে সিরাজগঞ্জ মহুকুমার এসডিও ছিলেন বিশিস্ট শিক্ষানুরাগী জনাব ইসহাক সাহেব(আইসিএস)। তিনি তার স্ত্রীর নামে সিরাজগঞ্জে স্থাপন করেন সালেহা-ইসহাক গার্লস হাইস্কুল যা এখন সরকারী বালিকা বিদ্যালয় জেলার একমাত্র। এছাড়া ইসহাক সাহেবের নিজের নামে স্কুল প্রতিস্ঠা হয় তাড়াশের বস্তু, উল্লাপাড়ার গয়হাট্টা, শাজাদপুরের তালগাছি সহ মহুকুমার অন্যান্য স্থানে। এসব দেখেও হয়তো অনুপ্রাণিত হন পুল্লার হাজী আহম্মদ আলী সরকার, তার বড় ভাই এছাহাক সরকার, সেরাত আলী সরকার, ভাটারপাড়ার গোকূল চন্দ্র মাহাতো, ভূঁয়টের মছের খা;ঁ যিনি পরবর্তীতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ঐ সময়ে সরাসরি গণভোটে সোনাখাড়া ইউপির চেয়ারম্যান হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসাবে। যা পাক আমলে একমাত্র স্থানীয় সরকার নির্বাচন ছিল ফ্রি ফেয়ার।
নিমগাছির জমিদার ভাদু বাবু, হরেন্দ্রনাথ পোদ্দার, রাখাল চন্দ্র পোদ্দার, শশধর রায়, ডাঃ ক্ষীতিশ চন্দ্র গুন, মেঘনা মাহাতো, আব্দুল গনি মন্ডল নিমগাছির প্রথম রাইচ মিল ছিল যার, গোপালপুরের আছের আলী তালুকদারসহ অত্র এলাকার শিক্ষানূরাগীগণ। উল্লেখ্য, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের মহান নেতা ও ফকির – সন্যাসী বিদ্রোহের মহানায়ক ফকির মজনু শাহের শিষ্য পীর ভোলা দেওয়ানের স্মৃতিধন্য নিমগাছিতে বহু পূর্ব থেকেই প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার হাট বসতো এবং উপরোল্লেখিত গন্যমান্যজনেরা ছিলেন অত্র অঞ্চলের এলিট শ্রেণির, হাটের ইজারাদার গ্রুপের লীডার। এলাকাটি আদিবাসী অধ্যুষিত, যারা তফসিলী সম্প্রদায় হিসেবেব স্বীকৃত রাষ্ট্রীয়ভাবে বৃটিশ আমল থেকেই। এরা দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অংশ। স্বাধীনতার পর সাংবিধানিকভাবে এরা সর্বক্ষেত্রেই কোটা সুবিধাপ্রাপ্ত এবং বর্তমানে ক্ষুদ্র নৃ – গোষ্ঠির মানুষ হিসেবে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর হতে সহায়তা পেয়ে থাকেন। নিমগাছি হাইস্কুল যখন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলে তখন পুর্নাংগ উচ্চ বিদ্যালয় ছিল উল্লাপাড়ায়, চান্দাইকোনায় ছিল আপগ্রেড স্কুল মাত্র। উচ্চ শিক্ষার কি হাল এলাকায় এ থেকে আন্দাজ করা যায়। প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থাও ছিল নড়বড়ে। ঐ সময়ের আগে রুপাখাড়া গ্রামে একটা প্রাচীন বিদ্যালয় ছিল যা উনবিংশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত। ঐ গাঁয়ের সন্তান এবং নিমগাছি অনার্স কলেজের টিচার ও বিশিস্ট সাংবাদিক, গবেষক আলহাজ্ব এম এ হাশিম সরকার জানান, তার জ্যাঠা এনাতুল্লা সরকারের কাছে তিনি শুনেছেন যিনি বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ছিলেন উল্লাাপাড়া মার্চেন্টস হাইস্কুলের ছাত্র যে, রুপাখাড়া গ্রামটি আগে হিন্দু সংখ্যাগুরু জনবসতি ছিল। ওদের বাড়ী বিশেষ করে সম্পন্ন গৃহস্থ তথা একটু শিক্ষিত বা লেখাপড়া জানাদের বহির্বাটির ঘরে টোল বসতো যা ছিল অনানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়।
ঐ সব টোলের টিচারগন কোনো বেতন পেতেন না ধরাবাঁধা। শিক্ষার্থীগনের অভিভাবককেরা ক্ষেতের ফসল, বাগানের সবজি ইত্যাদি দান করতেন প্রনামী হিসেবে। টিচার বা গুরুদের আগ্রহের উপরে চলতো টোল। ওরা আগ্রহ হারালে টোল উঠে যেত। আবার বসতো ঐ রকম আগ্রহী কেউ এগিয়ে এলে। এরকম টোল বসতো সাধূ রমন দাসের বাড়ী যেখানে এখন বাসভবন উজ্জল ডাঃ এর, সহদেব এর ভিটায় যেখানে বাড়ী এখন খালেক মেম্বর এর ছেলে মজনু মেম্বরের। ধীরে ধীরে বেশীর ভাগ হিন্দু চলে চলে যায় দেশ ছেড়ে। তবে ওদের দেখাদেখি গ্রামের মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরাও মক্তব সাইজের স্কুল চালু করে। কারণ তাদের সন্তাগন টোলে পড়তে গেলে কিছুটা বর্ণবৈষম্যের শিকার হতো। মক্তব চালু হয় এখন যেখানে স্কুল ওখানে। ওটা ছিল কুদ্দুস মন্ডলের বাবা ওসমান মন্ডলের ভিটা। তিনি পরে স্কুলের নামে লিখে দেন জমি। এছাড়া মোল্লা বাড়ীর মানে সাত্তার মাস্টার, জলিল মাস্টার, আজিজ মাস্টার, তার বাবা আহম্মদ মাস্টারের পূর্ব পুরুষগন শিক্ষিত ছিলেন। বহু দূর হতে চিঠিপত্র পড়াতে বা লিখিয়ে নেবার জন্য তাদের বাড়ী লোকজন আসতেন। (চলবে)
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com