মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ
(তরুণ আলোচক ও গবেষক, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব)
পবিত্র হিজরি বর্ষপঞ্জির অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ মাস যিলহজ্জ্ব। এই মাসের প্রথম দশ দিন ইসলামের দৃষ্টিতে সর্বশ্রেষ্ঠ দিনগুলোর অন্তর্ভুক্ত। এই সময়টিকে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় সময় বলে ঘোষণা করেছেন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি বলেন—“আল্লাহর নিকট যিলহজ্জ্বের প্রথম দশ দিনের ইবাদতের চেয়ে অধিক প্রিয় কোনো আমল নেই।”
(সহিহ বুখারি)রমাদানের ফজিলত আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু যিলহজ্জ্বের প্রথম দশ দিন সম্পর্কে আমাদের মাঝে সচেতনতা ও আগ্রহ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। অথচ এ দশ দিন এমন একটি সময়, যখন অল্প আমলে অনেক সওয়াব পাওয়া যায়। এটি এমন এক মৌসুম, যার প্রতিটি দিন ও রাত অত্যন্ত বরকতময়।
কেন এই দশ দিনের ফজিলত এত বেশি?
এই দশ দিনের মধ্যেই হজ্ব পালিত হয়।
এর মধ্যে রয়েছে আরাফার দিন, যা বছরের শ্রেষ্ঠ দিন।
এই সময়ে কুরবানির মত একটি বড় ইবাদত আদায় করা হয়।
আল্লাহর রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের অসংখ্য দরজা এই দশকে উন্মুক্ত থাকে।
আমরা কীভাবে প্রস্তুতি নেব?
১. ইলম অর্জন ও মাসআলা জানাযিলহজ্জ্ব মাসের ফজিলত, কুরবানির বিধান ও মাসায়েল সম্পর্কে আগে থেকেই জানা জরুরি। যারা কুরবানি করবেন, তাদের জন্য এই মাসের মাসআলা জানা ফরজ।
২. পরিকল্পিত ইবাদতএই দশ দিনকে কেন্দ্র করে একটি ইবাদত পরিকল্পনা তৈরি করা উচিত। প্রতিদিন কোন সময়ে কী কী আমল করা হবে তা নির্ধারণ করে নিলে ধারাবাহিকতা রক্ষা সহজ হয়।
৩. সালাতের যত্নপাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ জামাতের সঙ্গে পড়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত নফল নামাজ পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। যেমন—তাহাজ্জুদ, দুহা, সালাতুত তাসবীহ ইত্যাদি।
৪. কুরআন তিলাওয়াতপ্রতিদিন অন্তত কিছু পরিমাণে কুরআন তিলাওয়াত করা উচিত। তিলাওয়াত হৃদয়কে প্রশান্ত করে, তাকওয়া বৃদ্ধি করে এবং গোনাহ মাফের মাধ্যম হয়।
৫. রোজা রাখাসামর্থ্য অনুযায়ী প্রথম ৯ দিন রোজা রাখার চেষ্টা করা উত্তম। যদি সবগুলো না রাখা যায়, তাহলে অন্তত ৯ তারিখ, অর্থাৎ আরাফার দিন রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। এই রোজা বিগত ও আগত এক বছরের গোনাহ মাফের উপায়।
৬. যিকির, ইস্তিগফার ও দরুদ প্রতিদিন বেশি বেশি “সুবহানাল্লাহ”, “আলহামদুলিল্লাহ”, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, “আল্লাহু আকবার” পড়ুন।
সাথে “আস্তাগফিরুল্লাহ” ও দরুদ শরীফ যত বেশি পড়া যায়, তত ভালো।
আরাফার দিনে বিশেষ করে এই দোয়া পড়া উত্তম:
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।
৭. তাকবিরে তাশরিক
৯ যিলহজ্জ্ব ফজর থেকে ১৩ যিলহজ্জ্ব আসর পর্যন্ত প্রতি ফরজ নামাজের পর এই তাকবির পাঠ করা ওয়াজিব:
আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
(যারা ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা করেন, তারা নামাজের স্থানে কাগজে লিখে রাখতে পারেন)
৮. দান-সাদাকাহ
প্রতিদিন কিছু না কিছু সদকা করার চেষ্টা করুন। একটাকা হলেও রোজ কিছু দান করা একটি উত্তম অভ্যাস। এটি গোনাহ মোচন ও রিজিকের বরকতের মাধ্যম।
৯. আত্মসংযম ও সামাজিক সচেতনতা
এই দশ দিনে অপ্রয়োজনীয় কাজ থেকে বিরত থাকা জরুরি। যেমন—অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার, টিভি দেখা, অনর্থক আড্ডা, পরনিন্দা ইত্যাদি থেকে নিজেকে বিরত রাখুন।
১০. পরিবার ও সমাজকে সচেতন করা
নিজে যেমন সচেতন হবেন, তেমনি পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনকে এই দিনের গুরুত্ব বোঝান। ছোটদের এই বিষয়ে শিক্ষা দিন, তাদের নিয়ে মিলেমিশে আমলের পরিবেশ গড়ে তুলুন।
উপসংহার
যিলহজ্জ্বের প্রথম দশ দিন শুধু হিজরি ক্যালেন্ডারের একটি অংশ নয়, বরং ইহকাল ও পরকালের সফলতা অর্জনের এক সুবর্ণ সুযোগ। এই দিনগুলো যেন আমাদের জীবনে পরিবর্তনের দ্বার উন্মুক্ত করে—আত্মশুদ্ধি, আল্লাহভীতি, নেক আমলের প্রতি ভালোবাসা এবং ইসলামী মূল্যবোধে দৃঢ়তা অর্জনের সহায়ক হয়ে ওঠে।আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই দশ দিনের মর্যাদা বুঝে তা যথাযথভাবে পালন করার তাওফিক দিন
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com