মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)
৩১ জানুয়ারী, ২০২২
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও এমএসএফ কর্তৃক সংগৃহিত তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারী, ২০২২ সময়কালে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড অনেকটাই কমেছে। তবে প্রাপ্ত তথ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, ধর্ষণসহ নারী ও শিশুদের উপর সহিংসতার ঘটনা কিছুটা কমলেও উদ্বেগজনক ছিল। অপরদিকে নির্বাচনী সহিংসতার ব্যাপকতা ছিল ভয়াবহ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে মতামত প্রকাশের সংবিধান প্রদত্ত অধিকার প্রয়োগের পথ রুদ্ধ করার মত ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে হুমকি ও হামলা, পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু, কারা হেফাজতে মৃত্যু, সংখ্যালঘুদের প্রতি সহিংসতা, সীমান্তে হতাহতের মতো ঘটনাও বন্ধ হয়নি বরং বেড়েছে। অপরদিকে গণপিটুনির মতো ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবাধিকার লংঘনের এই ঘটনাগুলো ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক বন্দুকযুদ্ধ, অপহরণ ও দমনমূলক আচরণ
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও এমএসএফ কর্তৃক সংগৃহিত তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারী, ২০২২ এ ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালীতে ১৫ জানুয়ারী, ২০২২ শুক্রবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে মাদক কারবারিদের সঙ্গে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)’র ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা ঘটেছে। কোন হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও বিজিবি দুই লাখ ইয়াবা উদ্ধার করে।
অপর দিকে ১১ জানুয়ারী, ২০২২ তারিখে নওগাঁর নিয়ামতপুরে একটি মোটরসাইকেলে করে আসা র্যাবের পোশাক পরা দুই ব্যক্তি হাবিবুর রহমানকে হাতকড়া লাগিয়ে মোটরসাইকেলে উঠিয়ে নিয়ে যায়। পরে অপহৃত হাবিবুরকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণচন্দ্রপুর এলাকার একটি আমবাগান থেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। সংবাদসূত্রে জানা যায়, ভুয়া র্যাব সেজে তাকে অপহরণ করা হয়েছিল।
গণমাধ্যমসূত্রে জানা যায়, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিগত সময়ে গুমের শিকার হওয়া বেশ কয়েকটি পরিবারের স্বজনদের বাড়িতে গিয়ে অথবা পরিবারের সদস্যদের থানাতে ডেকে এনে জোর করে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি ও হয়রানি করে। এমএসএফ মনে করে, সরকারি বিভিন্ন সংস্থা গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে গিয়ে কিংবা তাদের থানায় নিয়ে সাদা কাগজে জোর করে স্বাক্ষর করানোসহ বিভিন্নভাবে হয়রানিমূলক তৎপরতা চালাচ্ছে যা অন্যায়, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকারের চরম লংঘন যার মাধ্যমে ন্যায়বিচার না পাওয়ার পরিস্থিতির ক্রমবর্মান অবক্ষয়ের চিত্রটি আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। এর ফলে নাগরিক জীবনে চরম উৎকন্ঠা সৃষ্টি হয়েছে তাতে করে ক্রমাগত আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতার জন্ম দিচ্ছে।
১৬ জানুয়ারী, ২০২২ তারিখে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনরত ছাত্রদের জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীসহ অন্যান্যরাও আহত হয়েছেন। বিনা উসকানিতে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশের এ ধরনের হামলা ও অন্যদিকে স্বল্প সময়ের মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ শিক্ষার্থীদেরকে চরম সঙ্কটের মধ্যে ফেলে। পুলিশের মারমুখী ও বলপ্রয়োগের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এ ধরনের অযাচিত পদক্ষেপ কোনো ভাবেই প্রত্যাশিত নয় পাশাপাশি এর দায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও এড়াতে পারে না।
অপরদিকে ২৪ জানুয়ারী, ২০২২ তারিখে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যায়ে শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা করার দায়ে শাবিপ্রবির সাবেক পাঁচজন শিক্ষার্থীকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে কোনো প্রকার গ্রেফতারী পরোয়ানা ছাড়াই তুলে নিয়ে সিলেটের জালালাবাদ থানায় হস্তান্তর করা হয় যা ন্যাক্কারজনক। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এহেন আচরণ আইন বর্হিভূত ও চরম উদ্বেগের বিষয় যা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চরম ব্যর্থতার পরিচয়ও বহন করে।
সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য পরিষদের ব্যানরে চাকুরিপ্রত্যাশী যুব প্রজন্ম, যারা করোনার মহামারির কারণে নির্দিষ্ট বয়সসীমার মধ্যে চাকরির জন্য আবেদন করতে পারেন নাই, তাঁরা সাক্ষাতের অনুমতি নিয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে তাঁর সরকারী বাসায় গেলে সেখান থেকে রমনা থানা পুলিশ ২০ জনকে আটক করে রমনা থানায় নিয়ে আসে এবং তিন ঘন্টা আটক রেখে প্রত্যেকের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়। অভিযোগ আছে তাদেরকে থানায় মারধর করা হয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া অনুমতি সাপেক্ষে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর সাক্ষাত প্রার্থীদের মন্ত্রী মহোদয়ের বাসার নিচ থেকে তুলে নেওয়া একটি নিন্দনীয় আচরণ যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়া এই চাকুরীপ্রত্যাশী যুব প্রজন্ম বিগত ডিসেম্বর থেকে যতবার মানববন্ধন বা সংবাদ সম্মেলনের অহিংস কর্মসূচী পালন করতে গেছে পুলিশ তাদের উপর বেপরোয়া লাঠিচার্জ করেছে এবং তাদের কর্মসূচী পালন করতে দেয় নাই। পুলিশ নারীদের উপর অকথ্য নির্যাতনও চালায়।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু
জানুয়ারী, ২০২২ মাসে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশী হেফাজতে আসামির মৃত্যুর বিষয়টি অনাকাঙ্খিত ও কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার ভেলাগুড়ি ইউনিয়নের পূর্ব কাদমা মালদাপাড়া গ্রামে স্ত্রী সাবিত্রী রানী (৩০) এর মৃত্যুর কারণে হাতীবান্ধা থানা পুলিশ স্বামী হিমাংশু রায়কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে থানায় নিয়ে যায়। ৭ জানুয়ারী, ২০২১ তারিখে পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় বিকেলে হিমাংশুর মৃত্যু হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী জিজ্ঞাসাবাদের ফাঁকে হিমাংশুকে থানার নারী-শিশু হেল্পডেস্ক কক্ষে নিয়ে কর্মকর্তারা খেতে দেন। এ সুযোগে সেখানে থাকা ওয়াই–ফাইয়ের তার গলায় পেঁচিয়ে জানালার গ্রিলে ঝুলে হিমাংশু আত্মহত্যা করেন।
গাজীপুরের টঙ্গীতে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) নির্যাতনে আসাদ শেখ (৪০) এর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। আসাদ শেখের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ১ জানুয়ারি, ২০২২ তারিখে দুপুর আনুমানিক ১টার দিকে মাদক ব্যবসার অভিযোগে র্যাবের কমপক্ষে ১০ জন সদস্য তাদের বাসায় তল্লাশি চালায়। এ সময় তারা আসাদ শেখকে মারধর করে। এতে সে অসুস্থ হয়ে পড়লে বিকেল ৫টার দিকে টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই তিনি মারা যান। তবে র্যাব এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
কারা হেফাজতে মৃত্যু
জানুয়ারী, ২০২২ মাসে কারা হেফাজতে ৫ (পাঁচ) জনের মৃত্যু ঘটেছে পাশপাশি বেশ কিছু অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে। ২২ জানুয়ারী, ২০২২ তারিখে জামালপুর জেলা কারাগারে শাকিল মাহমুদ জিসান (২৬) অসুস্থ বোধ করলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ হাজতির মৃত্যু হয়। ২৫ জানুয়ারী, ২০২২ তারিখে দিনাজপুর জেলা কারাগারে চেক জালিয়াতি মামলায় দেড় বছরের সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি সফিকুল ইসলামের (৫০) মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় টয়লেটে গিয়ে তিনি আর ফেরত আসেননি। পরে খোঁজ করতে গিয়ে দেখা যায় তিনি টয়লেটে পড়ে আছেন। পরে তাকে উদ্ধার করে দিনাজপুর এম. আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। পাবনা কারাগারের এক কয়েদি হাতেম আলী প্রামাণিক (৬০) এর মৃত্যু হয়েছে। ২৫ জানুয়ারী, ২০২২ তারিখ মঙ্গলবার সকালে তিনি অসুস্থতা বোধ করলে তাকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখানেই বিকালে তিনি মারা যান। ২৫ জানুয়ারী, ২০২২ সকাল ৭টার দিকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের হাজতি রেজাউল করিম (৫০) অসুস্থ হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ৩০ জানুয়ারী, ২০২২ তারিখ ঝিনাইদহ জেলা কারাগারের কপোতাক্ষ ওয়ার্ডের ৩নং সেলের শৌচাগার থেকে মফিজ উদ্দিন (৩৬) নামে এক কয়েদির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। কারা কর্তৃপক্ষের দাবি আত্মহত্যা।
দুদক এর একটি টিম কাশিমপুর কারাগার পরিদর্শনকালে দেখতে পান যে, কারা হাসপাতালে নিজস্ব কোনো ডাক্তার ও নার্স নেই। একজন ডাক্তার প্রেষণে কর্মরত আছেন। হাসপাতালটি উচ্চ সংক্রমণ ঝুকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও স্বাস্থ্যবিধি সঠিকভাবে পালন করা হচ্ছে না। কারা অভ্যান্তরে কারাবন্দীরা সঠিকভাবে চিকিৎসা সেবা না পাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। কারাগারসমুহের অভ্যন্তরে চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাসমূহের যথাযথ তদন্ত করা আবশ্যক বলে এমএসএফ মনে করে।
সীমান্ত পরিস্থিতি, হতাহত, নির্যাতন, আটক ও অনুপ্রবেশ
সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সীমান্ত সম্মেলনে বিএসএফ কর্তৃক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্বেও সীমান্ত হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও এমএসএফ কর্তৃক সংগৃহিত তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারী, ২০২২ মাসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক সীমান্তে হত্যার শিকার হয়েছেন ৩ জন বালাদেশী নাগরিক। নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৫ জন। ৪ জনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভারতীয় নাগরিকদের দ্বারা গুলিবিদ্ধ ও ছুরিকাঘাতে আহত হয়েছেন ২ বাংলাদেশী নাগরিক।
১ জানুয়ারী, ২০২২ তারিখ সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার কালাইরাগ সীমান্তে ভারতীয় নাগরিকদের গুলিতে লোকেশ রায় (৩৬) নামের এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হয়েছেন। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি)’র সহযোগিতায় কালাইরাগ সীমান্তের ১২৫১ নম্বর পিলারের পাশে সাদা পাথর এলাকা থেকে লাশটি উদ্ধার করে পুলিশ। গত ২১ ডিসেম্বর, ২০২১ দিবাগত রাত ২টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে আজমতপুর ফাঁড়ি এলাকায় বিএসএফের গুলিতে নিহত হন মো. ইব্রাহীম হোসেন (২৮)। ঘটনার ১৫ দিন পার হলেও মরদেহ বুঝে পাননি স্বজনেরা। তাঁরা জানান, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ মরদেহ দিতে চাইলেও বিজিবি নিচ্ছে না। ৮ জানুয়ারী, ২০২২ দিবাগত রাতে নওগাঁর সাপাহার হাপানিয়া কৃষ্ণস্বদা সীমান্তে ২৩৬ পিলারের ১এস এলাকায় ভারতীয় বিএসএফের গুলিতে সালাউদ্দীন (৩০) নামের এক বাংলাদেশি নিহত হন। বিএসএফ তার মরদেহ ফেরত দেয়নি। এছাড়া ২০২০ সালের ১৫ জুন নওগাঁর পোরশা সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হয় শ্রী সুভাষ চন্দ্র। সংবাদ মাধ্যমে জানা যায় এখন পর্যন্ত বিএসএফ তার মরদেহ ফেরত দেয় নাই। ১ জানুয়ারী, ২০২২ তারিখ কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার দুর্গম নারায়ণপুর সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিতে মোতালেব হোসেন (১৯) নামে এক যুবক আহত হয়েছেন। এ বিষয়ে বিএসএফ থেকে বিজিবিকে কিছু জানানো হয়নি। ঝিনাইদহের মহেশপুরের লেবুতলা সীমান্তের ওপারে ভারতের কাশিপুরে এক বাংলাদেশির লাশ পাওয়া গেছে। মৃত বাংলাদেশির নাম প্রদীপ কংশ বণিক (৪৮)। ২৮ জানুয়ারী, ২০২২ তারিখ সকালে ভারতের কাশিপুরের রাস্তায় প্রদীপ কংশ বণিকের মৃতদেহটি পড়ে ছিল। ভারতীয় পুলিশ ও বিএসএফ নিজেদের নাগরিক দাবি করে মরদেহ নিয়ে গেছে। ১২ জানুয়ারী, ২০২২ তারিখে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় বাঁশ কাটতে গেলে বিএসএফ ৫ জন বাংলাদেশি নাগরিককে মারধর করে আহত করেছে। পরে তাঁদের সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ড এলাকায় ফেলে যায়।
৯ জানুয়ারী, ২০২২তারিখ ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী সীমান্তে পাথরডুবি ইউনিয়নের ময়দান এলাকা থেকে শাকিল (২০) নামের এক বাংলাদেশী নাগরিককে বিএসএফ আটক করে ভারতে নিয়ে যায়। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত থেকে গত দুদিনে দুই বাংলাদেশি যুবককে আটক করেছে বিএসএফ। অপরদিকে বাংলাদেশে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারত থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অপরাধের ১১ ঘটনায় ১১জন নারী, ৮ জন ভারতীয় নাগরিক ও ৫৮ জন বাংলাদেশী নাগরিককে আটক করেছে বিজিবি।
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা
দেশে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও এমএসএফ কর্তৃক সংগৃহিত তথ্য অনুযায়ী অক্টোবর, ২০২১ মাসে দেশে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা যেমন; ধর্ষণ, হত্যা ও পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা বিগত মাসগুলোর মতই অব্যাহত রয়েছে যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এমএসএফ কর্তৃক সংগৃহিত তথ্য অনুযায়ী এ মাসে ৩২৫টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে যার মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ৬৫টি, সংঘবদ্ধ বেঁধে ধর্ষণ ১২টি, ধর্ষণ ও হত্যা ৩টি, প্রতিবন্ধী শিশু ও কিশোরী ধষর্ণের শিকার হয়েছে ৬ জন।
উল্লেখ্য যে ধর্ষণের শিকার ৬৫ জনের মধ্যে ৪৫ জন শিশু ও কিশোরী রয়েছে, অপরদিকে দল বেঁধে ধর্ষণের ঘটনায় ৭ জনই শিশু ও কিশোরী। ৩ জন নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণের চেষ্টার শিকার ১৩ জন শিশু ও কিশোরী ও ৫ নারী। যৌন হয়রানির শিকার ৫ জন শিশু ও কিশোর এবং ৬ জন নারী। মোট শারীরিক নির্যাতনের ৩৯টি ঘটনায় ১২ জন শিশু-কিশোরী রয়েছে। । এসময়ে ১৭ জন কিশোরীসহ মোট ৬২ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। অ্যাসিড নিক্ষেপে আক্রান্ত হয়েছে ২ জন নারী। অপহরণের শিকার হয়েছে ১০ জন কিশোরী অপরদিকে ১ জন নারী ও ১১ শিশু, কিশোরী ও নারী নিখোঁজ রয়েছেন। এছাড়াও জানুয়ারী মাসে ১২ জনের অস্বাভাবিক মৃত্যুসহ মোট ৮৬ জন শিশু, কিশোরী ও নারী হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ১৩ জন শিশু ও কিশোরী রয়েছেন। গণমাধ্যম সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রতিশোধ, পারিবারিক বিরোধ, যৌতুক, প্রেমঘটিত বিষয়াদির কারণে এ হত্যাকান্ডগুলো সংঘটিত হয়েছে।
এ মাসে অন্ত:ত ৫টি ধর্ষণের ঘটনা সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা করা হয়েছে। নওগাঁর মান্দা উপজেলায় কাশোপাড়া ইউনিয়নের ৬ জানুয়ারি, ২০২২ তারিখে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রতিবন্ধী এক শিশু (৭)কে প্রতিবেশী আশরাফুল ইসলাম ওরফে সুটকা (৪৫) মাছ ধরার কথা বলে খালের পাড়ে নিয়ে একটি সরিষাক্ষেতে ধর্ষণ করে। ৯ জানুয়ারি, ২০২১ তারিখ রাতে প্রতিবেশী আনোয়ারা বিবির নেতৃত্বে তার বাড়িতে মাতবর কামাল হোসেন, সৈয়দ আলী সরদার, দীনু কবিরাজ, পার্শ্ববর্তী গ্রামের নাসির উদ্দিনসহ ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে একটি সালিশ বৈঠক করেন। সালিশ বৈঠকে আশরাফুল ধর্ষণের কথা স্বীকার করলে মাতবররা জুতাপেটা করেন এবং প্রতিবন্ধী শিশুটির চিকিৎসার জন্য আট হাজার টাকা জরিমানা করে বিষয়টি আপস করে দেন। মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার কালিনগর গ্রামে ১২ জানুয়ারী, ২০২২ তারিখ বুধবার বিকেলে এক দরিদ্র ভ্যানচালকের ৯ বছরের শিশু কন্যা বাড়ির পাশে খেলাধুলা করার সময় প্রতিবেশী পূর্ণচন্দ্র মণ্ডলের ছেলে সনত মণ্ডল (৪৮) প্রলোভন দেখিয়ে নিজ বাড়ির ভেতর নিয়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করে। শিশুটি বাড়ি ফিরে কাঁদতে কাঁদতে মা-বাবার কাছে বিষয়টি জানায়। ধর্ষণের বিষয়টি স্থানীয় জয়ন্ত মেম্বারসহ মাতবরেরা জানতে পেরে শিশুটির পরিবারকে থানা-পুলিশ করতে নিষেধ করে এবং সালিশ বৈঠকের আয়োজন করেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে সালিশ বৈঠকে ধর্ষক সনত মন্ডলকে কোন শাস্তি না দিয়ে দোষী সাব্যস্ত করে মুচলেকা নেওয়া হয়, এ মর্মে যে, ভবিষ্যতে সে এমন কাজ আর করবে না। এলাকাবাসী জানান, সালিশ বৈঠকে জয়ন্ত মেম্বার, মতিন মেম্বার, সরোজিত মাতবর, মনোজিত, বিষ্ণু বাড়ৌ উপস্থিত ছিলেন।
টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলা শহরের মারফত আলীর ছেলে আলহাজ উদ্দিন (৫০), ২১ জানুয়ারী, ২০২২ শুক্রবার মধ্যরাতে হতদরিদ্র এক রাজমিস্ত্রির অনুপস্থিতিতে ঘরে ঢুকে তাঁর স্বামী-সন্তানদের হত্যার ভয় দেখিয়ে গৃহবধূকে ধর্ষণচেষ্টা করে। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে গৃহবধুটি চিৎকারে বাড়ির লোকজন আলহাজকে আটক করে। সে রাতেই স্থানীয় মাতবর হাফিজুর রহমান তোঁতা, আ. মমেন কলম, মালেক মিয়া, সাইফুল ও সাবেক মেম্বার আইনাল হক ৭০ হাজার টাকায় ঘটনাটির মীমাংসা করে অভিযুক্তকে ছেড়ে দেয়। মাতবরেরা ঘটনাটি বাড়ি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রাখতে বলে। ধামরাইয়ে এক কিশোরী ধর্ষণের ঘটনা ৫ লাখ টাকায় মীমাংসা করা হয়েছে। ৪ লাখ টাকা ভুক্তভোগীর পরিবারকে দিলেও ১ লাখ টাকা স্থানীয় মাতবররা নিয়েছেন। তবে এ মীমাংসা মেনে নেয়নি ধর্ষণের শিকার ওই তরুণী। ধর্ষক তাকে বিয়ে না করলে আত্মহত্যা করবেন বলে হুমকি দিয়েছে সে। উপজেলার ৭, ৮ ও ৯নং সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী মেম্বার রেহেনা আক্তার, শাহীন মেম্বার, বিএনপি নেতা আলতাফ হোসেন আলতু ও মাতবর আজিজুল হক ঘটনাটি মীমাংসা করেন। সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে যোগাযোগের করে খবর নিয়ে জানা যায়, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে এ ধরণের কোন তথ্য বা ঘটনা পায়নি।
এ মাসে ৬ জন মৃত ও ৫ জন জীবিত নবজাত শিশুকে বিভিন্ন স্থানে পরিত্যাক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে যা অমানবিক ও নিন্দনীয়। এ শিশুদেরকে কি কারণে পরিত্যাক্ত অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে, সংশ্লিস্ট কর্তৃপক্ষ তা নিরূপনের চেষ্টা করছে না। এমএসএফ মনে করে, দেশে ধর্ষণ, শিশু ও নারীদের প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন, শ্লীলতাহানি, যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের ঘটনা ঘটে চলেছে তাতে করে সামাজিক সুরক্ষার পাশাপাশি রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব বিশেষ করে সমাজে অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রনে সরকারের নজরদারি আরো জোরদার করতে হবে। নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতারোধে দেশে যথেষ্ট কঠোর আইন থাকা সত্বেও অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভুমিকা লক্ষণীয় নয়। বিচারহীনতা, বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা এবং অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে।
নির্বাচনী সহিংসতায় হতাহত
দূর্বল গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা, পদবাণিজ্য, মনোনয়ন বানিজ্য, গোটা রাজনীতিকে দুর্বৃত্তায়িত করে তুলেছে। ফলে সারাদেশে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন যে কোনো সময়ের তুলনায় এবারের সহিংসতা সব মাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। সারাদেশে প্রানহানির ঘটনা ঘটেছে বহু সংখ্যক। ৩১ ডিসেম্বর,২০২১ পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৯২ জন অপরদিকে আহত চার হাজারেরও অধিক। নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে ক্ষমতা ও আধিপত্যের লড়াই মনোনয়ন পার্থী ও বঞ্চিতদের মধ্যে যারা সরকার দলীয় নেতাকর্মী। ফলে প্রাননাশের ঘটনা সামাল দিতে কারো কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় নাই। সরকার দলীয় রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন বা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা খুব একটা দেখা যায়নি। সংঘর্ষের ঘটনার পাশপাশি সরকারী ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থকদের হামলার ঘটনা ছিল অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্খিত এবং শিষ্টাচর বর্হিভূত। এ ধরণের ঘটনার প্রতিকারে দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ আমরা লক্ষ্য করিনি। পাঁচ দফা নির্বাচনে প্রার্থীসহ যে সমস্ত মানুষ মারা গেলেন, এর দায় কোনোভাবে নির্বাচন কমিশন এড়াতে পারে না। একইভাবে দায় এড়াতে পারেন না ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরাও।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও এমএসএফ কর্তৃক সংগৃহিত তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারী, ২০২২ মাসে ৫ম ও ৬ষ্ঠ ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১০৯টি নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনায় কমপক্ষে ২৯ জন নিহত এবং ৫০০ এর বেশি মানুষ সংঘর্ষ-সহিংসতায় আহত হয়েছেন । নিহত ২৯ জনের মধ্যে ১ জন প্রতিপক্ষের গুলিতে এবং ৪ জন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে মারা গিয়েছে। সবচেয়ে বেশি বগুড়া জেলায় নিহত হয়েছেন ৭ জন এরপর ঝিনাইদহ জেলায় ৫ জন এবং চাঁদপুর জেলায় ৩ জন এবং নরসিংদীতে ২ জন। গত বুধবার ৫ই জানুয়ারী, বগুড়ার গাবতলীর একটি কেন্দ্রে নৌকার চেয়ারম্যান প্রার্থীর ফলাফল ঘোষণা নিয়ে দায়িত্বশীলরা গড়িমসি করায় বিক্ষুব্ধ সমর্থকরা কেন্দ্র ভাংচুর, বিজিবি, পুলিশ ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়িতে হামলা চালিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিজিবি সদস্যরা অন্তত ২৫ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করেছেন। এ সময় এক নারীসহ চারজন নিহত ও অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। গুলিতে নিহতরা হলেন- গাবতলী উপজেলার বালিয়াদীঘি ইউনিয়নের কালাইহাটা গ্রামের কুলসুম আকতার (৩৫), একই গ্রামের আবদুর রশিদ (৬০), আলমগীর হোসেন (৩৫) ও খোরশেদ আলী (৭০)। এছাড়াও ৫ই জানুয়ারী,মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলায় ভোটকেন্দ্রে দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার দৃশ্য দেখে সুমেলা খাতুন (৫০)নামে এক নারী স্ট্রোক করে মারা গেছেন। ১২ই জানুয়ারী,লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে নবনির্বাচিত এক ইউপি সদস্যের (মেম্বার) পৈশাচিক নির্যাতনে মারা গেছেন আনোয়ারুল ইসলাম (৩০) নামে এক যুবক। তার এক হাতের সব নখ প্লাস দিয়ে তুলে ফেলা হয়েছে। কেটে ফেলা হয়েছে বৃদ্ধাঙ্গুল।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যবহার
গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও এমএসএফ কর্তৃক সংগৃহিত তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারী, ২০২২ মাসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় ২জন সাধারণ নাগরিক গ্রেফতার হয়েছেন। এ মাসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৪টি মামলা করা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নির্বিচারে অপপ্রয়োগ মুক্তচিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসীদের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগ কিছুটা হলেও এ মাসে কমেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কথিত মানহানিকর কটুক্তি করার অপরাধে এ মাসে ৩টি মামলা ও শিক্ষক কর্তৃক ফেসবুকে প্রাক্তন ছাত্রীর একটি ছবি আপলোড করায় একটি মামলা হয়েছে।
সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের অধিকার
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে জানুয়ারি মাসের চিত্র ছিল উদ্বেগজনক। সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় অন্তত ২৭ জন সাংবাদিক নানাভাবে অপমান, নিপীড়ন, হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১৪ জন সাংবাদিক নির্বাচনকালীন তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। প্রকাশিত সংবাদের জন্য আহত ও প্রাণনাশের হুমকির শিকার হয়েছেন ৩জন, পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধাপ্রাপ্ত ও আহত ৮জন, হয়রানি ও অপমানের শিকার হয়েছেন ২ জন সাংবাদিক। এছাড়া ১৯ জানুয়ারি রাত দুইটার দিকে রাজধানীর হাতিরঝিলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন সাংবাদিক হাবীবুর রহমান। তাঁর দূর্ঘটনাজনিত মৃত্যুটি সকলের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
৫ই জানুয়ারি কুমিল্লায় হোমনা উপজেলার নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রুমন দে’র বিরুদ্ধে সাংবাদিক লাঞ্ছিতের অভিযোগ উঠেছে। বুধবার দুপুরে ইউপি নির্বাচনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে দেলোয়ার হোসেন জাকির দেশ রূপান্তর পত্রিকার কুমিল্লা প্রতিনিধি ও কুমিল্লা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদককে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেন ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন তিনি। ৫ই জানুয়ারী, ২০২২ দুপুর সোয়া ২টার দিকে ককটেল ফাটিয়ে ও গুলি করে কেন্দ্র দখল নেন চেয়ারম্যান প্রার্থী দেলোয়ার হোসেনের সমর্থকেরা। এরপর বিদ্যালয় ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। পুড়িয়ে দেয়া হয় সাংবাদিকদের দুটি ও সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তার একটি মোটরসাইকেল। প্রিজাডিং কর্মকর্তার কক্ষে ডেইলি স্টারের প্রতিবেদক এমরুল হাসান বাপ্পী, যমুনা টিভির সাংবাদিক মনিরুজ্জামান, কালেরকণ্ঠের সাংবাদিক শরীফুল আলম ইমন, প্রথম আলোর প্রতিনিধি সত্যজিৎ ঘোষ ও মানবাধিকার খবরের সাংবাদিক হেমন্ত দাসকে অবরুদ্ধ করা হয়। তাদের লক্ষ্য করে ককটেল হামলা ও গুলি ছোড়া হয়। ১৯ জানুয়ারী, ২০২২ গাজীপুরের কালীগঞ্জে বোয়ালী গ্রাম এবং উপজেলার কোনো সংবাদ প্রকাশ করতে হলে অনুমতি নিতে হবে বলে স্থানীয় এক গণমাধ্যমকর্মী আব্দুর রহমান আরমানকে (৪৬) হুমকি দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল গনি ভূঁইয়া (৫৮)। একই সঙ্গে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। ২৯ জানুয়ারী, ২০২২ ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নবগঠিত সেনুয়া ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের হামলায় চার সাংবাদিক আহত হয়েছেন। আহত চার সাংবাদিক হলেন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ইনডিপেনডেন্টের ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি তানভীর হাসান, নিউজবাংলার জেলা প্রতিনিধি সোহেল রানা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল রাইজিং বিডির জেলা প্রতিনিধি মাইনুদ্দিন তালুকদার ও ঢাকা মেইলের জেলা প্রতিনিধি জাহিদ হাসান।
সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে যেভাবে বাধা দেয়া হচ্ছে, হয়রানি ও শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে এবং নানাভাবে হুমকির সম্মুখিন হতে হচ্ছে তা শুধুমাত্র অনাকাঙ্খিতই নয় বরং বস্তুনিষ্ঠ ও সৎ সাংবাদিকতার কন্ঠরোধ করার সামিল যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য অশনিসংকেত।
সংখ্যালঘু নির্যাতন
গণমাধ্যমসূত্রে পাওয়া এমএসএফ’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ মাসে বেশ কয়েকটি সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ১৪ জানুয়ারী, ২০২২ তারিখ দুপুরে উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নাওড়া এলাকায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে দাবিকৃত চাঁদার টাকা না দেয়ায় বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোটের রূপগঞ্জ থানা সভাপতি ও ব্যবসায়ী শ্রী বিধান কৃষ্ণ রায়ের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় হামলাকারীরা তাকেসহ ৪ জনকে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে গুরুতর জখম ও তার ব্যবহৃত গাড়ি ভাঙচুর করে তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা ও মোবাইল সেট ছিনিয়ে নিয়ে যায়।বরিশালের বানারীপাড়ায় ১২ সংখ্যালঘু পরিবারের বসতবাড়ি ও জমি দখলচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে বরিশাল- ২ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য শাহে আলমের বিরুদ্ধে। বরিশাল প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এ অভিযোগ তোলেন ভুক্তভোগী রতন ঘরামীসহ অপর দুই পরিবারের সদস্যরা। টাঙ্গাইল সদর উপজেলার দাইন্যা ইউনিয়নের দর্জিপাড়া গ্রামে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের উপাসনালয় সিয়োন ইভানজেলিক্যাল হলিনেস চার্চের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতা ও তাঁর লোকজন বলে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা অভিযোগ করেছে। ‘হিন্দু ও আদিবাসী এবং যালিয়া ব্যাটাদের ভোট যদি না পাই খোদার কসম খেয়ে বলছি, ভোটের পরে সব ব্যাটার ব্যবস্থা করবই।’ মন্দির, গাছ, বাড়ির দেয়ালে এমন পোস্টার সাঁটিয়ে হুমকি দিয়েছে দিনাজপুর সদর উপজেলার ১নং চেহেলগাজী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের চারটি পাড়ায়। এরপর থেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। তারা বলছেন, এটি এক ধরনের হুমকি। ঘটনার তদন্ত ও জড়িতদের আইনের আওতায় না আনলে তারা ভোটকেন্দ্রে যাবেন না।
গণপিটুনি
জানুয়ারী, ২০২২ মাসের অন্যতম একটি উদ্বেগজনক বিষয় ছিল গণপিটুনিতে হতাহতের ঘটনা। প্রচলিত আইন অবজ্ঞা করে গণপিটুনি ঘটনাগুলোকে বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড বলে এমএসএফ মনে করে। এমএসএফ’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ মাসে অন্তত ৭টি গণপিটুনি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ৭ জন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। চুরি বা ডাকাতির সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনাগুলো সংঘটিত হয়েছে।১৩ জানুয়ারি ভোরে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে তিনজন নিহত হয়েছেন। উপজেলার ইলুমদী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- জহিরুল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও নবী হোসেন। এর মধ্যে জহিরুল লেগুনার মালিক এবং অন্য দুই লেগুনার চালক ছিলেন। ১৪ জানুয়ারী, নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের পশ্চিমবালা পাড়ার হোসেইন আলী নামের এক ব্যক্তির বাড়িতে ডাকাত সন্দেহে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। শনিবার গুমের উদ্দেশ্যে ফেলে যাওয়া মরদেহটি দিনাজপুর চিরিরবন্দরে ফকিরপাড়ার ক্যানেলের পাশ থেকে উদ্ধার করে চিরিরবন্দর থানা-পুলিশ। এ ঘটনায় চিরিরবন্দর থানা-পুলিশ তিনজনকে আটক করেছে। এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত নিহত ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া যায়নি। ৮ জানুয়ারী রাতে বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের পশ্চিম লালা নগর গ্রামের জয়নাল আবেদীনের বাড়িতে তৌহিদের নেতৃত্বে একদল ডাকাত হানা দেয়। এ সময় বাড়ির লোকজন চিৎকার করলে এলাকাবাসী ডাকাতদের ঘিরে ফেলে। এ সময় মোরশেদ (৩৫) নামে এক ডাকাতকে ধরে এলাকাবাসী গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ এসে মোরশেদকে থানায় নিয়ে যায়। ১৬ জানুয়ারী সকালে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে উপজেলার সখীপুর ডিএমখালী ইউনিয়নের হাওলাদার কান্দি গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে এক যুবককে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করেছ স্থানীয় লোকজন। ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ১৯ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার দিকে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবু সুফিয়ান (৩৫) নামে এক যুবককে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করেছে স্থানীয়রা। ঘটনায় তিন জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
আইন অবজ্ঞা করে গণপিটুনির ঘটনা ঘটিয়ে হত্যা করা অবশ্যই ফৌজদারী অপরাধ। গণপিটুনির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে গণমাধ্যমে জানা যায়নি।
সড়ক দুর্ঘটনা
সড়ক দুর্ঘটনা একটি গুরুতর জাতীয় সমস্যা। সারাদেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। আলোচনা ও আন্দোলনের পরও সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষের হতাহতের ঘটনা ঘটেই চলছে যার সঠিক তথ্য-উপাত্ত পাওয়া দুস্কর। যানবাহনের অতিমাত্রার গতি, সড়কের সাইন-মার্কিং-জেব্রা ক্রসিং চালক এবং পথচারীদের না মানার প্রবণতার কারণে পথচারীরা সড়কে মারা যাচ্ছেন। প্রধান সড়কের ওপর হাটবাজার গড়ে তোলা ইত্যাদি কারণে পথচারী নিহতের ঘটনা বাড়ছে। এরপর অদক্ষ চালক, বেপরোয়া গাড়ি চালনা, ট্রাফিক আইন মান্য না করাসহ নানা কারণে সড়কে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত দীর্ঘ হচ্ছে।গণমাধ্যমসূত্রে পাওয়া এমএসএফ’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ মাসে ২১১টি সড়ক দুর্ঘটনার ঘটেছে। এর মধ্যে প্রধান সড়কগুলোতে ৪৯ টি বাসের দুর্ঘটনায় ৬৯ জন মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। অন্যান্য ক্ষেত্রে মটরসাইকেল, সিএনজি অন্যান্য গণপরিবহন দুর্ঘটনায় ২১১ জন নিহত হয়েছেন মোট ২৮০ জন নিহত হয়েছেন।
পরিবহন খাতে বিরাজমান নৈরাজ্য, অনিয়ম-দুনীতিসহ জীবনের জন্য হুমকি নিরসনে জরুরি রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি বলে এমএসএফ মনে করে।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ডেইলি ষ্টার, কালের কন্ঠ, যুগান্তর, জনকন্ঠ, আমাদের সময়, বাংলাদেশ প্রতিদিন, দৈনিক মানবজমিন, সমকাল, ইত্তেফাক, আজকের পত্রিকা, ঢাকা ট্রিবিউন ও অন্যান্য জাতীয় দৈনিকসমূহ প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে উপরোক্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। তাছাড়াও প্রায় প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রেই স্থানীয় হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডারদের মাধ্যমে তা ভেরিফাই করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে ১ জানুয়ারী, ২০২২ থেকে ৩১ জানুয়ারী, ২০২২ পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনার ভিত্তিতে এ রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে।
|
|
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com