গাজী সৈয়দ শুকুর মাহমুদ
শহর নয় ,শহরতলীও নয় ,শহর থেকে দূরে হলেও নিছক পল্লি নয় ,তবুও পল্লির রাণী কৈজুরী গাঁকেই জানি। অতীত, ইতিহাস, ঐতিহ্য জড়ানো পল্লি এলাকার একটি গাঁ কৈজুরী। এটি শুধু কৈজুরী গাঁ’ই নয়, একটি ডাকঘর এলাকার নাম কৈজুরী, একটি ইউনিয়নের নাম কৈজুরী, নদী পথে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধার স্থান কৈজুরী, ডিসি রাস্তার মধ্যবর্তী মঞ্জিলের নাম কৈজুরী, দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী মসজিদ নির্মাণ কৈজুরী হাট, কৃষি পণ্য আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যিক কেন্দ্রের নাম কৈজুরী হাট, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্থান কৈজুরী।
কৈজুরী গাঁয়ে ছত্রিশ জাতের বসবাস ছিল। মুসলমান-গৃহস্থ, কায়াস্ত নমোশুদ্র, তেলি, মালি, ঢুলি, মুচি-চর্মকার, স্বর্ণকার-কর্মকার, নাপিত, ধোপা, কুম্ভকার, সুত্রধর, জেলে, তাঁতি, বেহারা, পাটনী, মালাকার, মাঠিয়াল, চোদরি-সুইপার, চইটক্যা, কুড়ি, সাহা, গোয়ালা, ব্রাম্মন-চক্রবর্তী রকমারি এসকল জাতের সমন্বয়ে’ই ছিল গাঁয়ের সামাজিক পরিবেশ। মসুলমানদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নামায ঈদ উদযাপন ধর্মীয় সভা ও হিন্দুদের পূঁজা পার্বনে একে ওপরের সম্পূরক ছিল। সামাজিক আনন্দ উৎসব, কীর্ত্তন-যাত্রাপালা মেলা এসকল বিষয়েও ছিলনা কারো বাদ-প্রতিবাদ হিংসা-বিদ্বেষ । বরং যে যার ধর্ম-কর্ম করে যেত। এলাকার মানুষের সামাজিকতা দেখে মনে হত এ যেন স¤্রাট আকবরের দ্বিন-ই-ইলাহী ধর্মের অনুসারী।
সিরাজ চৌধুরীর সিরাজগঞ্জে বিশেষ একটি অঞ্চল কৈজুরী। যমুনা অববাহিকার পাড়ে পলিযুক্ত উর্বরা কৃষি খামার শস্য-শ্যামল ফসলী মাঠ। প্রতিবছর যমুনার জলে বিধৌত এলাকা জোলা, খাল, ডোবা, নালা, ছোট-বড় স্রোতসি¦নী নদী খালে-বিলে ঝরণা ধারা নদী নালায় প্রবাহিত। ¯্রােতধারায় বর্ষায় উত্তাল তরঙ্গবাহি খরস্রোতা সর্বগ্রাসী যমুনার পশ্চিমে ক্ষীণ ও ক্ষণ প্রবাহমান করতোয়া নদী। এক সময়ের ভয়ংকর বিলুপ্ত হুড়াসাগর নদী যার বুকের আঁড়ির ফাঁকে ফাঁকে জেগে উঠা চর। তাতে বসতি গড়ে উঠা জনপদের নাম চর বেলতৈল, চর কৈজুরী, চর গুধিবাড়ি। হুড়াসাগরের পশ্চিম পারের গ্রাম উল্টাডাব, রাণীখোলাÑ নদীর পূর্বপারের গ্রাম হাট পাচিল, জয়পুরÑ ভাটির দিকে গুপিয়াখালি, গুধিবাড়ি তারই মাঝখানে ঐতিহ্যবাহি কৈজুরী গ্রাম। বৃটিশের শাসনামল থেকে গড়ে উঠা কৈজুরীর গোলা, দক্ষিণে বেড়ার গোলা, উত্তরে চৌহালি- সোহাগপুরের হাট, পশ্চিমদিকে করোতয়া নদীর ওপারে শাহজাদপুরের গোলা, চতুরদিকে এত দুরত্বের মাঝে কৈজুরীর গোলা অবস্থিত। সপ্তাহের একদিন শুক্রবার কৈজুরী হাট বার। বহু দুর-দুরান্ত থেকে ক্রেতা-বিক্রেতাগণ সওদা করতে আসত। বিশেষ করে দক্ষিণে বেড়া থেকে পাটের মহাজন আসত। বহিরাগত মহাজনগণ ধান, চাল ক্রয়-বিক্রয় করতে আসত কৈজুরীর হাটে। বেড়াতে ইছামতির আখের গুড় তৈরি করলেও কৈজুরী হাটের ইছামতি গুড়ের সুনাম দেশ জুড়ে ছিল। পাবনা থেকে বেড়া হয়ে কৈজুরী অতিক্রম করে সোহাগপুর দিয়ে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত বয়ে যাওয়া মেঠোপথ (ডিস্ট্রিক কানেক্টিং রোড) ডিসি রোড নামে পরিচিত। এ আন্তঃ জেলা সড়কটি কৈজুরীর মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। যে সময়ে এ অঞ্চলে রাস্তা ঘাট যোগাযোগের মাধ্যম একেবারেই অনুন্নত ছিল, সে সময়েও এই ডিসি রোডের সহায়তায় কৈজুরীর উন্নয়ন ছিলো অতুলনীয়।
যখন হুড়াসাগর নদী প্রবাহমান ছিল, তার পূর্ব পারে কৈজুরীতে গড়ে উঠেছিল নদীবন্দর। পরবর্তীকালে হুড়াসগর নদী মারা গেলেও বিলুপ্ত হয়নি। কৈজুরীর নদীবন্দর যমুনা নদীর ঘাট ঠুটিয়া মোনাকষায় গড়ে উঠেছিল। পূর্ব হতেই শাহজাদপুর থানার ১০নং ইউনিয়ন ও ডাকঘর কৈজুরীতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। ইউনিয়নটিতে অনেক গ্রাম থাকলেও ইউনিয়ন সৃষ্টি হতে আজ অবধি কৈজুরীর নেতৃত্বেই এলাকা পরিচালিত। কৈজুরীর আদি বাসিন্দা তদারক প্রামানিক নেতৃত্ব দিয়ে আসতেন। পরবর্তীকালে তার ছোট ছেলে কেসমত উল্লাহ প্রামানিক পাকিস্তান শাসনামলে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তীকালে কেসমত উল্লাহ প্রামানিকের ভাগ্নে কচুয়া গ্রামের বদর উদ্দিন আহমেদ এর একমাত্র ছেলে মোশাররফ হোসেন মুছা পর্যায়ক্রমে তিন বার কৈজুরী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তার জীবদ্দশায় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ইউনিয়নবাসীর নিকট হতে যথার্থ সম্মান নিয়েই তিনি ইহজগৎ ত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে অন্যান্যরা দু/একজন চেয়ারম্যান হলেও সর্বশেষ মোশাররফ হোসেনের তৃতীয় সন্তান মো: সাইফুল ইসলাম পর পর দুবার সফল চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এ যেন রাজতন্ত্রের মত বংশানুক্রমে এ নেতৃত্ব চলে আসছে।
যে সময়ে এ অঞ্চলের মুসলমানগণ শিক্ষার আলো থেকে অনেকটাই দূরে অবস্থান করত ঠিক সে সময়ে কৈজুরী গ্রামের মওলানা দবির উদ্দিন ভারতের দেওবন্ধ মাদ্রাসা থেকে দাওরা হাদিস পাশ করে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। তাঁরই ছাত্র মওলানা মহিউদ্দিনের সহযোগিতায় উন্নত নকশায় কৈজুরী হাটে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। পরবর্তীকালে মওলানা মহিউদ্দিনের প্রচেষ্টায় ও মওলানা দবির উদ্দিনের সহযোগিতায় কৈজুরী মহিউল ইসলাম ফাজিল সিনিয়র মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয় যা আজও সুনামের সাথে পরিচালিত হচ্ছে।
পূর্বকাল হতে এ এলাকার জনগণ উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও সকলেই ব্যবসা বাণিজ্যের সাথে জড়িত থাকায় আদর্শতা, ভদ্রতায় উল্লেখযোগ্য ছিলো। আর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছেÑ কৈজুরী গ্রামের জয়েন উদ্দিন তালুকদারের বড় ছেলে মো: নুরুল ইসলাম তালুকদার জাতীয় পার্টির শাসনামলে দুইবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এটিও কৈজুরীর আরেকটি অহংকার। এক সময়ে সামাজিক বিনোদনের মাধ্যম ছিলো যাত্রা পালা। বাংলা-ভারতের আলোড়ন সৃষ্টিকারী রূপবান যাত্রার বইটি রচনা করেছেন কৈজুরী ইউনিয়নের ভাটদিঘুলিয়া গ্রামের তমজের আলম তফিজ মাস্টার। এ বইটি রচনা করে তিনি নিজেই অভিনয় করে এপার বাংলা ওপার বাংলায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।
এছাড়া আরও একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। বৃহত্তর পাবনা জেলায় প্রথম মুসলিম ব্যারিস্টার কোরবান আলী তাঁর জন্ম কৈজুরীর চর কৈজুরী গ্রামে। তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে সরাসরি স্বাধীনতা বিরোধী কার্যক্রমে জড়িয়ে পরায় জনমনে তিক্ততা ও জনবিচ্ছিন্নতায় পরিণত হয়েছেন। বর্তমানে দেশের অন্যান্য এলাকার সাথে প্রতিযোগিতা করে কৈজুরী এলাকাবাসীও শিক্ষায় আর পিছিয়ে নেই। পূর্বে এতদাঞ্চলের মধ্যে শাহজাদপুর উচ্চ বিদ্যালয়, পোরজনা এম.এন উচ্চ বিদ্যালয়, জামিরতা উচ্চ বিদ্যালয় ছিলো। এসকল বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরপরই কৈজুরীর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ বিশেষ করে কেসমত উল্লাহ প্রামানিক ও তার ভাগ্নে মোশাররফ হোসেন মুছার নেতৃত্বে এলাকাবাসী একমত হয়ে ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে কৈজুরী উচ্চ বিদালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময়ে এ সকল গুণীজনের পাশাপাশি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন ডা: হরিপদ ঘোষ। তার দেয়া ভূমিতেই প্রতিষ্ঠিত হয় এই কৈজুরী উচ্চ বিদ্যালয়টি।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি স্থাপনের পর হতেই সুযোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে সুনামের সহিত পরিচালিত হয়ে আসছে। যার ফলে এলাকার ছেলে মেয়েরা এখন শিক্ষা প্রতিযোগিতায় যথেষ্ট এগিয়ে যাচ্ছে। পরবর্তীকালে হাজী মোশাররফ হোসেনের সুযোগ্য জ্যেষ্ঠপুত্র এ্যাডভোকেট আব্দুল খালেক কৈজুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ায় বিদ্যালয়টির এতটাই অগ্রসর করতে সক্ষম হয়েছেন যা দৃষ্টান্তের স্বাক্ষর বহন করছে। পরবর্তীকালে সর্বগ্রাসী যমুনা নদীর করালগ্রাসে বিদ্যালয়টি বিলুপ্তির পর্যায়ে গেলে বিদ্যানুরাগী হাজী মোশাররফ হোসেন মুছাই অক্লান্ত পরিশ্রম করে নিজস্ব অর্থায়নে বর্তমান স্থানে পুন:প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের পাশাপাশি এলাকায় মুসলিম শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটাতে তাঁর নিজস্ব সম্পদে ও অর্থায়নে স্থাপন করেন দারুল উলুম কচুয়া মোশাররফিয়া ক্বওমী মাদ্রাসা। তারই সন্তান মুফতি মওলানা মো: গোলাম মোস্তফা কামাল প্রতিষ্ঠান প্রধানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। পাশাপাশি মোশাররফ হোসেনের সন্তানেরা মায়ের নামে রিজিয়া মোশাররফিয়া মহিলা ক্বওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। যার ফলে এলাকার বয়স্ক মহিলা দ্বীনি এলেম শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠছেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ্যাডভোকেট আব্দুল খালেকের নিরলস প্রচেষ্টায় ও যোগ্য নেতৃত্বে বিদ্যালয়টির সাথে কলেজ শাখা যোগ করে তিনি বর্তমানে স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্বে রয়েছেন। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে কৈজুরী স্কুল এন্ড কলেজ শাহজাদপুর উপজেলা তথা সিরাজগঞ্জ জেলার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উন্নীত হয়েছে। এসকল সফলতার পিছনে অধ্যক্ষ এ্যাডভোকেট আব্দুল খালেকের ভূমিকা প্রশংসনীয়। কৈজুরী স্কুল এন্ড কলেজের ৫০বছর পুর্তি সুর্বণ জয়ন্তী উপলক্ষে স্মরণিকা প্রকাশের উদ্যোগকে অভিনন্দন জানাই। পৃথিবী যতদিন বেঁেচ থাকবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠনটি সুনামের সাথে মাথা উঁচু করে ততদিন দাড়িয়ে থাকবেÑ এটাই কামনা
লেখক: কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট,শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ। মোবা: ০১৭৮২-৪৫৭৭৮৩।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com